×
Logo

ভ্রমণ

শীতের ভ্রমণে জনপ্রিয় দেশের ১০ দর্শনীয় স্থান

সাব্বির হোসেন

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:২২ পিএম

শীতের ভ্রমণে জনপ্রিয় দেশের ১০ দর্শনীয় স্থান

প্রিয় মানুষ, বন্ধু কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একটু সময় কাটাতে কে না চান? আর সেই সময়টা যদি হয় কুয়াশামাখা সকাল, হিমেল বাতাস আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের মধ্যে, তাহলে আনন্দটা বেড়ে যায় আরও কয়েক গুণ।

শীত মানেই ভ্রমণের মৌসুম। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে বাড়তে থাকে ভ্রমণপিপাসু মানুষের আনাগোনা। কেউ ছুটে যান সমুদ্রের কাছে, কেউ পাহাড়ের মেঘ দেখতে, আবার কেউ বেছে নেন চা-বাগান, বন কিংবা নদীবেষ্টিত কোনো নিরিবিলি জায়গা।

বাংলাদেশে এমন অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে, যেখানে শীতের ছুটিতে কয়েক দিনের জন্য ঘুরে আসা যায়। 

১. সেন্ট মার্টিন দ্বীপ

‘দ্বারুচিনি দ্বীপ’খ্যাত সেন্ট মার্টিন দেশের ভ্রমণপিপাসু মানুষের বহুল আকাঙ্ক্ষিত একটি গন্তব্য। নীল সমুদ্রের জলরাশি, প্রবাল, সারি সারি নারিকেলগাছ আর সমুদ্রযাত্রার রোমাঞ্চ— সব মিলিয়ে দ্বীপটি পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। কক্সবাজারের টেকনাফের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত দেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ এই দ্বীপ শীতের ছুটিতে হতে পারে ভ্রমণের অন্যতম সেরা গন্তব্য।

তবে সেন্ট মার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াত সারা বছর উন্মুক্ত থাকে না। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পর্যটন মৌসুমে দ্বীপে ভ্রমণের ক্ষেত্রে রয়েছে নির্দিষ্ট সময়সীমা ও কিছু বিধিনিষেধ।

এ বছরের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য দ্বীপটি উন্মুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রতিদিন গড়ে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ পর্যটক যেতে পারবেন। জনপ্রতি ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফিও দিতে হবে।

২. কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত

শীতের ভ্রমণের কথা উঠলে সবার আগে আসে কক্সবাজারের নাম। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক অবিচ্ছিন্ন বালুকাময় সমুদ্রসৈকত হিসেবে পরিচিত এই সৈকত প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ। নীল সমুদ্রের ঢেউ, বিস্তৃত বালুকাবেলা আর সূর্যাস্তের দৃশ্য পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

কক্সবাজারে গিয়ে শুধু সৈকত নয়, ঘুরে দেখা যায় হিমছড়ি, ইনানী, দরিয়ানগর ও মেরিন ড্রাইভ। সমুদ্রের পাশে হাঁটা, ঘোড়ায় চড়া কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সৈকতে সময় কাটানো ভ্রমণকে করে তোলে আনন্দময়।

৩. সাজেক ভ্যালি

পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে মেঘের ভেলা দেখার অভিজ্ঞতা নিতে চাইলে সাজেক ভ্যালি হতে পারে দারুণ গন্তব্য। রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত এই পর্যটনকেন্দ্রটি পাহাড়, মেঘ, সবুজ বন আর আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথের জন্য পরিচিত।

শীতের সকালে পাহাড়ের ওপর মেঘের চলাচল, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য পর্যটকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। সাজেকে গিয়ে কংলাক পাহাড়, রুইলুই পাড়া ও আশপাশের পাহাড়ি পরিবেশ ঘুরে দেখা যায়।

৪. শ্রীমঙ্গল

চায়ের সবুজ বাগান, কুয়াশায় ঢাকা সকাল আর শান্ত পরিবেশের জন্য শ্রীমঙ্গলকে বলা হয় চায়ের রাজধানী। মৌলভীবাজার জেলায় অবস্থিত এই পর্যটন অঞ্চলটি প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।

শ্রীমঙ্গলে গেলে চা-বাগানের আঁকাবাঁকা পথ ধরে হাঁটা, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ঘুরে দেখা এবং স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়া যায়। পাশাপাশি বাইক্কা বিল ও মাধবপুর লেকও ঘুরে দেখার মতো জায়গা।

৫. জাফলং

পাহাড়, নদী আর পাথরের মেলবন্ধন দেখতে চাইলে সিলেটের জাফলং ঘুরে আসতে পারেন। ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই পর্যটন এলাকায় পিয়াইন নদী, স্বচ্ছ পানির প্রবাহ এবং পাথরের সৌন্দর্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে।

শীতের সময় মনোরম আবহাওয়ায় নদীর পাশে সময় কাটানো, ছবি তোলা এবং পাহাড়ের দৃশ্য উপভোগ করা যায়। জাফলংয়ের পাশাপাশি সিলেট ভ্রমণে বিছানাকান্দি, রাতারগুল ও লালাখালও ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে।

৬. সুন্দরবন

বন্য প্রকৃতি, নদী, খাল আর ম্যানগ্রোভ বনের রহস্যময় সৌন্দর্য দেখতে চাইলে সুন্দরবন হতে পারে ভিন্নধর্মী ভ্রমণ গন্তব্য। বাংলাদেশ ও ভারতের বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে থাকা সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। এটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ নানা বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল।

শীতকালে সুন্দরবনে নৌভ্রমণ, করমজল, হারবাড়িয়া, কটকা ও কচিখালীসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে। বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ, হরিণ, পাখি ও বন্যপ্রাণীর বিচিত্র জীবন কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা ভ্রমণকে স্মরণীয় করে তুলতে পারে।

৭. রাঙামাটি

পাহাড়, হ্রদ আর সবুজ প্রকৃতির সৌন্দর্য একসঙ্গে উপভোগ করতে চাইলে রাঙামাটি হতে পারে চমৎকার গন্তব্য। কাপ্তাই হ্রদের নীল জল, পাহাড়ি রাস্তা এবং ঝুলন্ত সেতু এ জেলার অন্যতম আকর্ষণ।

রাঙামাটিতে গেলে কাপ্তাই হ্রদে নৌভ্রমণ, শুভলং ঝরনা, পেদা টিং টিং এবং ঝুলন্ত সেতু ঘুরে দেখা যায়। পাহাড় ও হ্রদের মিতালি ভ্রমণকারীদের কাছে জায়গাটিকে বিশেষ করে তুলেছে।

৮. বান্দরবান

পাহাড়ের সৌন্দর্য, ঝরনা আর আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথের জন্য বান্দরবান পর্যটকদের কাছে পরিচিত একটি নাম। প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটাতে এবং পাহাড়ি পরিবেশ উপভোগ করতে চাইলে এটি হতে পারে আকর্ষণীয় গন্তব্য।

বান্দরবানে নীলাচল, নীলগিরি, চিম্বুক পাহাড় ও শৈলপ্রপাত পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। পাহাড়ের ওপর থেকে মেঘ, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য ভ্রমণকে করে তোলে আরও আকর্ষণীয়।

৯. কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত

একই সমুদ্রসৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার সুযোগের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত সাগরকন্যা খ্যাত কুয়াকাটা। পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলায় অবস্থিত এই সৈকত প্রায় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ।

শীতের সকালে সমুদ্রের ওপর সূর্যের উদয় দেখা, বিকেলে সূর্যাস্ত উপভোগ করা কিংবা বালুকাবেলায় হাঁটার অভিজ্ঞতা ভ্রমণকারীদের আকর্ষণ করে। সৈকতের পাশাপাশি ফাতরার বন, লেবুর চর, গঙ্গামতি ও রাখাইন পল্লী ঘুরে দেখা যায়।

১০. পঞ্চগড় ও তেঁতুলিয়া

শীতের ভ্রমণে দেশের উত্তর প্রান্তের জেলা পঞ্চগড় এবং এর সীমান্তবর্তী উপজেলা তেঁতুলিয়া পর্যটকদের কাছে একটি দারুণ আকর্ষণীয় গন্তব্য। তেঁতুলিয়া থেকে বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার আকর্ষণে পর্যটকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। তবে হিমালয় কন্যাকে দেখার জন্য বছরের নির্দিষ্ট একটা সময় রয়েছে, যা সাধারণত অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত হয়ে থাকে। পাশাপাশি, যারা শীতের তীব্রতার অনুভূতি নিতে পছন্দ করেন, তারা এই সময়ে সেখানে ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে পারেন।

এ ছাড়া এখানকার সমতলের চা-বাগান, বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট, মহারাজার দিঘি এবং ভিতরগড়ের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো ঘুরে দেখারও দারুণ সুযোগ রয়েছে।

শীতের ভ্রমণ আনন্দদায়ক করতে আগে থেকেই যাতায়াত, আবাসন ও প্রয়োজনীয় খরচের পরিকল্পনা করে নেওয়া ভালো। ছুটির দিনে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকের চাপ বাড়ে, তাই হোটেল ও পরিবহনের টিকিট আগাম বুকিং দেওয়া সুবিধাজনক।

পাহাড়ি এলাকায় ভ্রমণের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। সমুদ্র ও নদীতে নামার সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বনাঞ্চল ও দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে।

প্রিয় মানুষ কিংবা পরিবারের সঙ্গে কাটানো কয়েকটি দিন হয়ে উঠতে পারে বছরের সেরা স্মৃতিগুলোর একটি। তাই শীতের ছুটিতে সময় ও সামর্থ্য অনুযায়ী বেছে নিন পছন্দের গন্তব্য, বেরিয়ে পড়ুন নতুন অভিজ্ঞতার খোঁজে।

/এনএ 

Logo