বিশ্বের সর্বোচ্চ সেতু এখন চীনের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪১ পিএম
চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সুউচ্চ পাহাড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বিশ্বের সর্বোচ্চ সেতুটি এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ।
গভীর গিরিখাতের ওপর নির্মিত, বিশাল এই সেতু দেখতে, প্রতিদিন ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। কেউ কাচের পর্যবেক্ষণ মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিচের অতল গিরিখাত দেখছেন, কেউ সেতুর নিচে ঝুলন্ত পথে হাঁটছেন, আবার কেউ শত শত মিটার ওপর থেকে বাঞ্জি জাম্প দিয়ে নিচে ঝাঁপ দিচ্ছেন।

সম্প্রতি এমনই এক দৃশ্য দেখা যায় সেতুটিতে। বাঞ্জি জাম্প দেওয়ার জন্য প্রস্তুত এক তরুণকে ঘিরে জড়ো হন দর্শনার্থীরা। সেতুর সড়কপথের নিচে একটি প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা পরীক্ষা করান তিনি। এরপর শূন্যে ঝাঁপ দেন। প্রায় সাত সেকেন্ড ধরে গভীর গিরিখাতের দিকে নেমে যাওয়ার পর বিশাল বাঞ্জি দড়ির টানে আবার ওপরে উঠে আসেন তিনি। মুহূর্তেই চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে দর্শকদের উচ্ছ্বাস।

যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোর গোল্ডেন গেট সেতুর তুলনায় পানির পৃষ্ঠ থেকে প্রায় নয় গুণ বেশি উচ্চতায় অবস্থিত এই সেতুটি চীনের গুইঝৌ প্রদেশে। প্রকৌশলগত বিস্ময় হিসেবে নির্মিত সেতুটি এখন রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকদের জন্যও আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে, চালু হওয়া, 'হুয়াজিয়াং গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন' সেতুটি বেইপান নদীর ওপর ৬২৫ মিটার বা ২ হাজার ৫১ ফুট উচ্চতায় দাঁড়িয়ে আছে।
গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুযায়ী, এটি বিশ্বের সর্বোচ্চ সেতু। সেতুটি নির্মাণের আগে গিরিখাত পেরিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে প্রায় দুই ঘণ্টা লাগত। নতুন সেতুর ফলে সেই সময় কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র দুই মিনিটে। একই সঙ্গে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার গ্রামীণ জনপদগুলো যুক্ত হয়েছে চীনের বিস্তৃত সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে।
স্থানীয় কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উদ্বোধনের পর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত সেতুটি দেখতে প্রায় ৩৩ লাখ পর্যটক এসেছেন।
দুর্গম ভূপ্রকৃতিকে জয় করতে কয়েক দশক ধরে চীন অসংখ্য সেতু নির্মাণ করেছে। তবে হুয়াজিয়াং সেতু নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে, যে সেতু নির্মাণ করা হয়েছিল মানুষের যাতায়াত সহজ করতে, সেটিই যখন নিজেই ভ্রমণের গন্তব্য হয়ে ওঠে, তখন তার প্রভাব কত দূর বিস্তৃত হতে পারে?
মেঘের কাছাকাছি ছুটি কাটানোর অভিজ্ঞতা
হুয়াজিয়াং গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন সেতুটি প্রায় ২ দশমিক ৯ কিলোমিটার বা ১ দশমিক ৮ মাইল দীর্ঘ। এর বিশাল দুটি নীলাভ-সবুজ টাওয়ার পাহাড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। তবে সেতুটির বিশেষত্ব শুধু এর উচ্চতা কিংবা দৈর্ঘ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যানবাহন চলাচলের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের জন্যও এখানে তৈরি করা হয়েছে নানা আয়োজন।
সেতুর কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করে কাচের পর্যবেক্ষণ মঞ্চে দাঁড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সেখান থেকে পায়ের নিচে গভীর গিরিখাতের দৃশ্য দেখা যায়। আরও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা পেতে চাইলে রয়েছে বাঞ্জি জাম্প এবং সেতুর সড়কপথের নিচে নির্মিত খোলা হাঁটার পথ।

অনেক দর্শনার্থীদের মতে, গিরিখাতের তলদেশ থেকে কয়েকশ' মিটার ওপরে দাঁড়িয়ে দূরের পাহাড় দেখার অভিজ্ঞতা ছিল ব্যতিক্রমী। সেতুটির বিশালত্ব এবং এর নির্মাণকৌশল কতটা বিস্ময়কর, তা সেখান থেকে উপলব্ধি করা যায়।
তবে গিরিখাতের নিচের গ্রামগুলোতে এই সেতুর প্রভাব শুধু পর্যটকদের রোমাঞ্চ কিংবা দর্শনীয় দৃশ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও পরিবর্তন আনছে এটি।
সেতুর কারণে বদলে যাচ্ছে গ্রামের জীবন
লিন গুওছুয়ানের কাছে এই সেতু তার পরিবারের গ্রামের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। ইউনান, ঝেজিয়াং ও গুয়াংডং প্রদেশে কয়েক বছর শেফ হিসেবে কাজ করার পর গুইঝৌতে ফিরে আসেন তিনি। এরপর নিজের দাদা-দাদির বাড়িসহ গ্রামের পুরোনো কয়েকটি বাড়িকে পর্যটকদের থাকার উপযোগী আবাসনে রূপান্তর করেন।
তার আশা ছিল, নতুন সেতুকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের আগমন বাড়বে এবং দুর্গম এই গ্রামেও ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে। একসময় যে জায়গায় বাইরের মানুষের আসার তেমন কোনো কারণ ছিল না, সেখানেই পর্যটনকে ঘিরে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠতে শুরু করেছে। লিনের সেই উদ্যোগ এখন সাফল্যের মুখ দেখছে।

সিএনএনকে তিনি বলেন, 'আমরা যখন প্রথম চালু করি, তখন মাত্র নয়টি কক্ষ ছিল। এখন তা বাড়িয়ে ৫২টি করা হয়েছে। তারপরও সব অতিথির থাকার ব্যবস্থা করতে পারছি না।'
পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ব্যবসারও প্রসার ঘটেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে, চীনা নববর্ষের নয় দিনের ছুটিতে সেতুর সার্ভিস এলাকায় তিন লাখের বেশি পর্যটক এসেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের বাফেলো শহরের জনসংখ্যার চেয়েও বেশি ছিল এই সংখ্যা।
লিন এখন স্থানীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিত মুখও। চীনে টিকটকের বিকল্প হিসেবে পরিচিত ডৌইনে তার অনুসারীর সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। সেতুর পটভূমিতে গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তুলে ধরে নিয়মিত ভিডিও ও সরাসরি সম্প্রচার করেন তিনি।
লিন বলেন, 'আমার ভিডিও দেখে অনেকেই হোমস্টেতে থাকার জন্য কক্ষ বুক করেন। তারা ভ্রমণের বিষয়ে পরামর্শও চান।'
তার মতো উদ্যোক্তাদের জন্য এখন পর্যটক আকর্ষণের ক্ষেত্রে শুধু সড়ক যোগাযোগ উন্নত হওয়াই যথেষ্ট নয়। অনলাইনে সম্ভাব্য অতিথিদের কাছে পৌঁছানোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একসময়, এই এলাকায়, মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতা ছিল সীমিত। পরে রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান চায়না মোবাইল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের সহযোগিতায় নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্থাপন করা হয় নতুন বেস স্টেশন।
হুয়াওয়ের চীনবিষয়ক কৌশল ও ব্যবসা উন্নয়ন বিভাগের সদস্য ঝৌ জিয়ানগুও বলেন, 'মানুষ এই বিশাল সেতুটি দেখতে পায়। কিন্তু ডিজিটাল জগতেও একটি সেতু সমানভাবে প্রয়োজনীয়, আর সেটি হলো আমাদের যোগাযোগ নেটওয়ার্ক।'
সেতুর পাশে বিলাসবহুল হোটেল
গিরিখাতের ওপরের দিকে পর্যটকদের জন্য রয়েছে ভিন্ন ধরনের আতিথেয়তার ব্যবস্থা। গ্রামের পুরোনো বাড়ি সংস্কার করে তৈরি হোমস্টের বিপরীতে, ৮৩ কক্ষের বিলাসবহুল ওনেমন্ট হোটেলটি নির্মাণ করা হয়েছে নতুন সেতুকে ঘিরে পর্যটনশিল্প গড়ে তোলার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে।

পাহাড়ের ঢালে নির্মিত হোটেলটিতে রয়েছে রেস্তোরাঁ ও চারপাশের দৃশ্য দেখা যায় এমন সুইমিং পুল। প্রতিটি অতিথিকক্ষ থেকেই সরাসরি সেতুটি দেখা যায়।
হোটেলটির বিপণন ও যোগাযোগ ব্যবস্থাপক ছাও লুয়াওর মতে, পরিবর্তনটি শুধু পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষ এখানে কতক্ষণ থাকছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, 'পর্যটকেরা এখন আর শুধু সেতু দেখতে আসেন না, তাঁরা এর পাশে রাতও কাটাতে পারেন। এর ফলে সেতুকেন্দ্রিক পর্যটন দ্রুত ঘুরে দেখে চলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে রাতযাপনসহ আরও নিবিড় ভ্রমণ অভিজ্ঞতায় রূপ নিচ্ছে।'
চীনের আর কত সেতু প্রয়োজন?
তবে চীনে একের পর এক সেতু নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি নতুন প্রকল্পের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নির্ধারণ আরও জটিল হয়ে উঠছে। নতুন সেতু যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি ঘটালেও সব প্রকল্পের সুফল এক রকম নয়।
বেইজিং নরমাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক লি লিন্না গুইঝৌ প্রদেশের ২৯৫টি উঁচু সেতু নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার গবেষণায় দেখা গেছে, এসব সেতুর কারণে জেলা পর্যায়ে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির গড় হার ক্রমেই কমছে।
গবেষণা অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে উঁচু সেতুগুলো জেলা পর্যায়ে যোগাযোগের সুযোগ গড়ে প্রায় ৮ শতাংশ বাড়িয়েছিল। কিন্তু ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এই হার কমে প্রায় ৫ শতাংশে দাঁড়ায়। এর অন্যতম কারণ, বিস্তৃত এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠায় নতুন সেতুর মাধ্যমে যোগাযোগ উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলনামূলকভাবে কমেছে।
লি লিন্না বলেন, 'ফলে প্রতিটি নতুন সেতু নির্মাণের মাধ্যমে যোগাযোগব্যবস্থায় যে অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়া যায়, তা ক্রমেই কমে আসছে।'
তবে এর অর্থ এই নয় যে বিশাল সেতু নির্মাণের যুগ শেষ হয়ে যাচ্ছে।
লি বলেন, 'পশ্চিম চীনের দুর্গম ও তুলনামূলকভাবে অনুন্নত পাহাড়ি জেলাগুলোতে, যেগুলো গিরিখাত ও নদীর কারণে বিচ্ছিন্ন, সেখানে আরও একটি উঁচু সেতু নির্মাণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং যোগাযোগের সুযোগ: দুই ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটাতে পারে।'
তার মতে, একটি সেতুর অর্থনৈতিক মূল্যায়নের ধারণাও বদলাচ্ছে। আগে যাতায়াতের সময় কমানো, পরিবহন ব্যয় হ্রাস এবং মানুষ ও পণ্য পরিবহনের সুবিধা বাড়ানোর বিষয়গুলোই ছিল প্রধান বিবেচ্য। এখন হুয়াজিয়াংয়ের মতো সেতু এমন একটি নতুন সুবিধা তৈরি করছে, যা আগে ছিল না, মানুষকে এমন জায়গায় ভ্রমণে আকৃষ্ট করা, যেখানে যাওয়ার কথা তারা হয়তো কখনো ভাবেনি।
লি বলেন, 'ভবিষ্যতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এসব উঁচু সেতু কোথায় নির্মাণ করা হবে এবং প্রতিটি সেতু ঠিক কোন সমস্যার সমাধান করবে।'
হুয়াজিয়াং সেতুর প্রথম বছরে আসা লাখ লাখ পর্যটক দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারবেন কি না, তা অবশ্য এখনো স্পষ্ট নয়।
যাতায়াতের পথ থেকে ভ্রমণের গন্তব্য
গুইঝৌ ট্রান্সপোর্ট ইনভেস্টমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি গ্রুপের হুয়াজিয়াং প্রকল্প কার্যালয়ের পরিচালক শিয়ে বোরানের কাছে সেতুটির প্রথম বছরটি বেশ কিছু স্মরণীয় অভিজ্ঞতায় ভরা। সেতুটি চালু হওয়ার পর সহকর্মীদের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছিল, তা এখনো তার মনে আছে।
কয়েক শতাব্দী আগে এই দুর্গম ভূপ্রকৃতির মধ্য দিয়ে চলাচল করতে ব্যবসায়ী ও বণিকদের প্রায় এক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেত। এখন পরিস্থিতি একেবারেই আলাদা। মানুষ শত শত মাইল পাড়ি দিয়ে এখানে আসছেন গিরিখাত পেরিয়ে অন্য কোথাও যাওয়ার জন্য নয়, বরং পাহাড়ের মাঝে ঝুলে থাকা সেতুটির সৌন্দর্য উপভোগ করতে।
মানুষকে অন্য গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে নির্মিত সেতুটিই এখন নিজেই হয়ে উঠেছে মানুষের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য।
/এআই