এক ভীতু তরুণের গহীন পাহাড় জয়ের গল্প (শেষ কিস্তি)
এত কষ্টের পরও কেন আবার পাহাড়ে ফিরতে চাই?
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৪৮ পিএম
⚫ জি এম জাহাঙ্গীর আলম
আগামীকাল সাওডং পাড়া ছেড়ে চলে যাব আমরা। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত। বসে আছি তুলনামূলক নিরাপদ পাহাড়ি ঢালের ওপর তৈরি একটি মাচায়। আকাশে উঠেছে পূর্ণিমার চাঁদ। পুরো ভরাট, গোলাকার চাঁদটি যেন মাথার ঠিক ওপরেই ঝুলছে। পাহাড়ের ওপরে বসে আছি বলেই কি চাঁদকে এত কাছে মনে হচ্ছে?
সারাদিনের কঠিন ট্রেকিংয়ের পর পেটে পড়েছে সামান্য কিছু নাস্তা। রাতের খাবার তখনও রান্না হচ্ছে। সেই মুহূর্তে মনে পড়ে গেল সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার সেই লাইন— "পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।" ক্লান্ত শরীর, নীরব পাহাড় আর মাথার ওপর বিশাল চাঁদ—সব মিলিয়ে মুহূর্তটি ছিল অন্যরকম।
পাহাড়ের চূড়ায় এক রাত
এই দুর্গম পাহাড়কে রাতে যতটা নির্জন মনে করেছিলাম, বাস্তবে ততটা নয়। কারণ শুধু আমরা নই, আরও কয়েকটি দল এখানে রাত কাটাচ্ছে। কেউ গান গাইছে, কেউ গল্প করছে, কেউ নিজেদের জীবন নিয়ে আলোচনা করছে। একটি দল গলা ছেড়ে গান ধরেছে। আরেকটি দল নিজেদের পেশা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আর নানা বিষয় নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত।
একসময় মনে হলো, পাহাড়ের চূড়ায় নয়, যেন নিজের পরিচিত কোনো পাড়াতেই বসে আছি। হঠাৎ চোখে পড়ল একটি বাড়ির ওপরে টাঙানো একটি এন্টেনা। পুরনো দিনের বিটিভির এন্টেনার কথা মনে পড়ে গেল। মনে হলো, এখান থেকে হয়তো ফোনে কথা বলা যাবে। সেই সঙ্গে মনে পড়ল—গত দুই দিন পরিবারের কারও সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হয়নি। ইন্টারনেট নেই, মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। মা-বাবা কিংবা পরিবারের অন্য কেউ চেষ্টা করলেও আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন না। কীভাবে যেন এই ব্যস্ততার মধ্যে বিষয়টি ভুলেই গিয়েছিলাম।
প্রথমবার ডায়াল করতেই ওপাশ থেকে ফোন ধরলেন আমার আপা। তার কণ্ঠে ছিল উদ্বেগ। তখনই বুঝলাম, এতক্ষণ আমি পাহাড়ের সৌন্দর্য আর অ্যাডভেঞ্চারে ডুবে থাকলেও, দূরে থাকা মানুষগুলো কিন্তু চিন্তায় ছিলেন। পরিবারকে নিজের নিরাপদে থাকার কথা জানাতে পেরে কিছুটা স্বস্তি পেলাম। সেই মুহূর্তে উপলব্ধি করলাম, পৃথিবীর যত দুর্গম জায়গাতেই যাওয়া হোক না কেন, আপন মানুষগুলোর চিন্তা আর ভালোবাসা সবসময় সঙ্গেই থাকে।

পাহাড়ি মানুষের সরল জীবন
সেদিন রাতে রান্নার দায়িত্ব নিয়েছিলেন আমাদের সঙ্গে থাকা গাইড। তিন বন্ধুকে নিয়ে গেলাম পাড়ার সর্দারের বাড়িতে রান্নার জায়গায়। আমাদের একজন তো নিজের বাড়ির মতো করেই রান্নার কাজে হাত লাগিয়ে দিল। খাবারের প্রতি বেলায় থাকত আলুভর্তা। রাতে থাকত মুরগি। আমরা মজা করে বলতাম— "জিম করা মুরগি"। কারণ পাহাড়ে বেড়ে ওঠা মুরগির শরীরও যেন আলাদা শক্তপোক্ত।
খাবার নিয়ে আরেকটি মজার অভিজ্ঞতা ছিল। পাহাড়িদের রান্নায় লবণের ব্যবহার কিছুটা কম। এদিকে জোঁকের ভয় থেকে অনেকে সঙ্গে করে লবণ নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রেকিংয়ের সময় কেউ সেই লবণ ব্যবহার করার সুযোগ পাননি, কিংবা ভুলে গিয়েছিলেন। খেতে খেতে তাই হাসাহাসি হতো— "এত দূর থেকে লবণ বয়ে আনলাম, অথচ পাতে দেওয়ার সময়ই পেলাম না।"
পরিকল্পনায় পরিবর্তন
তৃতীয় দিনে আমাদের পরিকল্পনায় কিছু পরিবর্তন এলো। আগের পরিকল্পনা ছিল—সকালে শৈনগং ঝর্ণা দেখে সেখানকার ঝিরি পথ ধরে নাফাখুমের দিকে যাত্রা করা। এই পথে সবাইকে নিজের ব্যাগ কাঁধে নিয়েই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হতো। কিন্তু আগের দুই দিনের অভিজ্ঞতা দেখে আমাদের শারীরিক সক্ষমতা সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল। তাই পরিকল্পনায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হলো। ব্যাগ বহনের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হলো। ফলে আমাদের কিছুটা স্বস্তি মিলল।
সকালে গেলাম ঝর্ণা দেখতে। খুব বেশি দূরে নয়, পথও তুলনামূলক সহজ। তবে ঝর্ণার পাদদেশে নামার সময় আবারও সেই পরিচিত পাহাড়ি পরীক্ষা। লম্বা খাড়া ঢাল, কিছুটা পিচ্ছিল পথ। আমাদের দলের একজন তরুণ সহযাত্রী আগের কয়েক দিনের অভিজ্ঞতার পর আর ঝুঁকি নিতে চাইলেন না। তিনি ফিরে গেলেন। আমরা এগিয়ে গেলাম।
পথেই ঘটে গেল আরেক অভিজ্ঞতা। পেছনে থাকা এক বন্ধুকে জোঁকে ধরল। সে বেশ ভয় পেয়ে গেল। আতঙ্কে হাত-পা ছোড়াছুড়ি শুরু করল। আমি জোঁক নিয়ে খুব একটা স্বস্তিতে না থাকলেও, কোনোভাবে সেটিকে সরিয়ে দিলাম। কিছুক্ষণ পর দেখি, আরেক বন্ধুর পায়ের বেশ কিছু জায়গায় রক্তের দাগ। জোঁক তার কাজ করে নিরাপদে চলে গেছে। পরে সবাই নিজেদের জোঁকের অভিজ্ঞতা শেয়ার করছিলাম। কেউ লবণ এনেছেন, কেউ লম্বা মোজা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জোঁকের সঙ্গে সাক্ষাৎ এড়ানো গেল না।
অসাধারণ দুটো রাত কাটিয়ে এবার বিদায় নেওয়ার পালা সাওডং পাড়া থেকে। এই ছোট্ট পাহাড়ি জনপদের মানুষের জীবনযাত্রা, সরলতা আর প্রকৃতির সঙ্গে তাদের মিশে থাকার অভিজ্ঞতা মনে দাগ কেটে গেল। বিদায়ের আগে পাড়ার একটি দোকানের ব্যানারে চোখ পড়ল। সেখানে পাড়ার নাম লেখা ছিল ‘সাং ওডং পাড়া’। তবে মুখে মুখে বহুল প্রচলিত নাম ‘সাওডং পাড়া’।
নাফাখুম: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী নাফাখুমের পথে হাঁটা শুরু করলাম। পুরো পথ ছিল জুমের রাস্তা ধরে। খুব কঠিন না হলেও, পথিমধ্যে পানির উৎস কম ছিল। তাই পানি ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হচ্ছিল। জুমে কী কী চাষ হয়, তা দেখার চেষ্টা করলাম। ধান, কলাগাছ, কিছু সবজি—তবে অধিকাংশই আমাদের পরিচিত নয়। ভেবেছিলাম, হয়তো নতুন কোনো প্রাণীর দেখা পাব। তেমনটা হয়নি। পরিচিত প্রাণীদের মধ্যেই দেখলাম মুরগি, ছাগল, কুকুর। তবে মহিষের মতো দেখতে গয়াল প্রথমবার দেখলাম। শুকরও প্রায় প্রতিটি পাড়াতেই গৃহপালিত হিসেবে পালন করা হয়।
পাড়াবাসীদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগের সবচেয়ে বড় বাধা ছিল ভাষা। বড়দের অনেকেই বাংলা ভাষায় খুব বেশি স্বচ্ছন্দ নন, আর ছোটদের অনেকেই বাংলা বলতে পারে না। তারপরও বিদায়ের মুহূর্তে সঙ্গে থাকা কিছু শুকনা খাবার তাদের উপহার দিয়ে একটা ছোট্ট সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করেছিলাম। ভাষা আলাদা হলেও সেই মুহূর্তে একটা আন্তরিকতা অনুভব করেছিলাম।
পড়ন্ত বিকেলে পৌঁছালাম নাফাখুম। সত্যি বলতে, প্রথম দেখায় কিছুটা হতাশ হলাম। মনে হলো, এতদিন যা দেখে এসেছি, তার তুলনায় নাফাখুম হয়তো আমার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। এর সঙ্গে সন্ধ্যার পর জেনারেটরের শব্দ আর কৃত্রিম আলো সেই বুনো পরিবেশের সঙ্গে কিছুটা বেমানান লাগছিল। কিন্তু ভোর হওয়ার পর বদলে গেল সব ধারণা।
নিস্তব্ধ প্রকৃতি। চারপাশে শুধু পাহাড় আর পানির শব্দ। ঝুলন্ত ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে জলপ্রপাতের দিকে তাকাতেই বুঝলাম, জায়গাটির সৌন্দর্য আসলে অনুভব করতে হয় নির্দিষ্ট মুহূর্তে। উপরে থেকে নেমে আসা সাদা পানির ধারা দেখে মনে হচ্ছিল, যেন কাশফুলের কোনো বাগান নেমে এসেছে পাহাড়ের বুক চিরে।

দিনের পর দিন ট্রেকিংয়ে ক্লান্ত আমাদের নারী সহযাত্রীরা সেদিন ঝর্ণার সামনে শাড়ি পরে ছবি তুললেন। দীর্ঘ দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়ার পর সেই সাজ, সেই আনন্দ—সবকিছু মিলিয়ে দৃশ্যটি ছিল অসাধারণ। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে যেন মানুষের সৌন্দর্যের এক অন্যরকম মিলন ঘটেছে। প্রতিটি ঝর্ণার সামনে তাদের সেই আনন্দ দেখেছি। কষ্টের পথ পার হওয়ার পর একটি ছবির জন্য যে প্রশান্তি, তা সত্যিই আলাদা।
পাহাড় আমাকে যা দিল
অবশেষে ফেরার পালা। আবার সাঙ্গু নদীতে ফিরলাম। আগের মতোই সরু কাঠের নৌকায় চড়ে থানচির দিকে এগোচ্ছি। দুই পাশের পাহাড়, নদী, সবুজ—সবই আগের মতো সুন্দর। কিন্তু এবার মনটা আর সেখানে আটকে নেই। মাথার মধ্যে ঘুরছে একটাই প্রশ্ন—পাহাড় আমাকে কী দিল? উত্তর পেতে খুব বেশি সময় লাগল না।
আত্মবিশ্বাস। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সাহস। কঠিন পথকে এড়িয়ে না যাওয়ার শিক্ষা। আরও কত কী। যতক্ষণে থানচিতে এসে নৌকা থেকে নামলাম, ততক্ষণে মনে মনে একটা প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছি—আবার ফিরব পাহাড়ের কোলে।
(সমাপ্ত)