এক ভীতু তরুণের গহীন পাহাড় জয়ের গল্প (দ্বিতীয় পর্ব)
রোয়েনদকের দুর্গম ট্রেইল ও নিম্বোখিয়ামের খাড়া ঢাল
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৫৯ পিএম
⚫ জি এম জাহাঙ্গীর আলম
পাহাড় শুধু চোখে দেখার বস্তু নয়। পাহাড়কে অনুভব করতে হয়। পাহাড়ের ওপর-নিচে, ঢালে কিংবা খাঁজে—প্রতিটি বাঁকে বাঁকেই সবুজের সমারোহ চোখকে বিমোহিত করে, মনকে আন্দোলিত করে। তবে পাহাড়কে সত্যিকার অর্থে অনুভব করতে হলে পাহাড়ের সঙ্গে হেঁটে চলতে হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রেকিং করে মিশে যেতে হয় পাহাড়ের সঙ্গে। কোথাও লাল মাটি, কোথাও পাথরের স্তূপ—প্রকৃতির এই বৈচিত্র বুঝতে হলে পাড়ি দিতে হয় দুর্গম পথ। সেই পথেই আমাদের দ্বিতীয় দিনের যাত্রা।
রোয়েনদকের পথে: শুরুতেই কঠিন পরীক্ষা
থানচি সার্কিটের অন্যতম কঠিন ট্রেইল অতিক্রম করার দিন আজ। আগের রাতেই গাইড জানিয়েছিলেন, প্রথম দিনের তুলনায় আজকের পথ আরও কঠিন হবে। তবে একটা স্বস্তির বিষয় ছিল—আজ কাঁধে ব্যাগ থাকবে না। ভাত, ডিম, আলুভর্তা আর ডাল খেয়ে যাত্রা শুরু করলাম।
শুরুতেই ২০-৩০ মিটার লাল মাটির হেলানো ঢাল বেয়ে পাহাড়ের নিচে নেমে এলাম। প্রথমে মনে হচ্ছিল, পথ হয়তো খুব একটা কঠিন হবে না। কিন্তু পাহাড়ে যেমন হঠাৎ করে সন্ধ্যা নামে, ঠিক তেমনি হঠাৎ করেই সামনে হাজির হলো দুর্গম আর বুনো এক ট্রেইল।
এমন আকস্মিক পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। মনে হয়েছিল, ভিডিও গেমের মতো হয়তো এখানে পথেরও ধাপ থাকবে—ইজি, মিডিয়াম, হার্ড। কিন্তু বাস্তবে বুঝলাম, পাহাড় কোনো নিয়ম মেনে নিজের কঠিনতা প্রকাশ করে না।
সামনে লম্বা খাড়া ঢাল। তবে এবার আর মাটির পথ নয়। অবিন্যস্ত, পাথরে ভরা, কোনো নির্দিষ্ট ছন্দ নেই এমন এক পথ। ঢালের মাঝখানে ছোট ছোট গর্ত, তার মধ্যে ছড়িয়ে থাকা পাথর। সেই পথ ধরেই নামতে হবে অনেক নিচে। বুঝতে পারলাম, আজকের দিনটা সহজে পার হওয়ার নয়। কথায় আছে, সকালের সূর্য দেখলেই সারাদিনের আভাস পাওয়া যায়। শুরুর পথই যখন এমন, সামনে কী অপেক্ষা করছে তা ভাবতেই একটু চিন্তা হচ্ছিল।
মাঝে মাঝে এমন জায়গা এসেছে, যেখানে দুই পাথরের মাঝখানে ছোট্ট ফাঁক দিয়ে শরীর গলিয়ে নিচে নামতে হয়েছে। আমাদের একজন নারী সহযাত্রী এমন এক জায়গায় আটকে গিয়েছিলেন। তবে সবাই মিলে সহায়তা করায় খুব বেশি সমস্যা হয়নি।
কিছু বড় বড় পাথর বৃষ্টির পানিতে এতটাই পিচ্ছিল হয়ে ছিল যে, পা রাখাই কঠিন। মাটির ঢালে পা পিছলে গেলে হয়তো মাটিতে পড়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু এখানে পাথরের ওপর পড়ে গেলে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। তাই প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হচ্ছিল ভেবেচিন্তে।
এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে হয়েছে লাফিয়ে। কিন্তু শুধু লাফ দিলেই হয় না, মাটিতে পা রাখার পর শরীরের ভারসাম্যও ধরে রাখতে হয়। একবার নয়, অসংখ্যবার এমন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। প্রতিবার নিজেকে সামলে নিয়ে মনে হয়েছে— আমার মতো একজন অপেশাদার ট্রেকারের পক্ষে কি সত্যিই এই পথ পার হওয়া সম্ভব?

ঝিরির পথে প্রকৃতির আরেক রূপ
দীর্ঘ সময় দুর্গম পথের সঙ্গে লড়াই করার পর কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল। কিন্তু সেই স্বস্তির মধ্যেই ঘটে গেল বিপত্তি। পানির নিচে লুকিয়ে থাকা পিচ্ছিল পাথরের ওপর পা পড়তেই— সড়াৎ! তবে ভাগ্য ভালো ছিল। ততক্ষণে আমরা ছোট্ট একটি ঝিরির পথে চলে এসেছিলাম। ছোটবেলায় মাঠ-ঘাট, বিল-খালে ঘুরে বেড়ানোর যে অভিজ্ঞতা ছিল, সেটাই যেন কাজে লাগল। হাতের ভর দিয়ে নিজেকে সামলে নিলাম। বড় কোনো বিপদ হলো না।
এই ট্রেইলের কিছু জায়গা ছিল সত্যিই ক্লুলেস। উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। পাহাড় থেকে নেমে এসে আমরা ঝিরির পথ ধরে এগোতে থাকলাম। যত সামনে যাচ্ছি, ততই প্রকৃতির দুর্গম রূপ আরও স্পষ্ট হচ্ছে। বিশাল বিশাল পাথর পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো কোনো পাথরের আকার আমার উচ্চতার চেয়েও বড়। সেগুলো অতিক্রম করতে হবে।
হাত দিয়ে শক্ত করে ধরার মতো সব জায়গায় কোনো সাপোর্ট নেই। ভরসা শুধু একটি বাঁশের লাঠি—শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখার জন্য। পাথরের ওপর বেশি জোরে পা দেওয়া যায় না, কারণ পিছলে যাওয়ার ভয়। কখনো কোনো বুনো লতা, কখনো গাছের ঝুলে থাকা শেকড়—এসবই হয়ে উঠছিল আমাদের ভরসা। সেগুলো ধরে ধরে শরীরের ভারসাম্য ঠিক রেখে এগিয়ে যেতে হচ্ছিল।
এই কঠিন পথ পাড়ি দিতে আমাদের গাইডরা যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন। কোথাও কোথাও পথ দেখে মনে হয়েছে এগোনো ঠিক হবে না, তখন বিকল্প পথ খুঁজে নিতে হয়েছে। আমরা হাল ছাড়িনি। মনের এক অজানা জোর আর একে অপরের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে পার হতে লাগলাম একের পর এক বাধা।
পথিমধ্যে ছোট ছোট ঝর্ণা আমাদের ক্লান্তি ভুলিয়ে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, এত কষ্টের পর রোয়েনদক নিশ্চয়ই আমাদের হতাশ করবে না। অবশেষে পৌঁছালাম রোয়েনদকে। তবে প্রত্যাশার বেলুনটা কিছুটা চুপসে গেল। পানি প্রবাহ তুলনামূলক কম ছিল। কিন্তু ঝর্ণার বিশালতা, চারপাশের পরিবেশ আর দুর্গমতার অনুভূতি মিলিয়ে জায়গাটির নিজস্ব সৌন্দর্য ছিল। কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়ে থাকলাম।
ফিরতি পথও সহজ ছিল না। একই ধরনের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আবার ফিরতে হবে সাওডং পাড়ায়। তবে ফেরার পথে ঘটে গেল একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। আমাদের একজন সহযাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অবশ্য বাকি সহযাত্রীদের আন্তরিক সহযোগিতা ও যত্নে তিনি নিরাপদে ফিরতে সক্ষম হন। অন্যদিকে, এই ট্রেইলের কঠিনতা বুঝতে পেরে একজন সহযাত্রী সকালে আর এগিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নেননি। তিনি পাড়াতেই থাকার সিদ্ধান্ত নেন। এর আগে তার এমন দুর্গম ট্রেকিংয়ের অভিজ্ঞতা ছিল না; শুধু ফেরার পথটুকু ছাড়া এই যাত্রার মতো কঠিন ট্রেইলে তিনি অংশ নেননি।
অনভ্যস্ত ট্রেকারদের জন্য এমন পরিস্থিতি অস্বাভাবিক নয়। ট্রেকিংয়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো খাবার ও বিশ্রামের সীমাবদ্ধতা। অনেক সময় দুপুরের খাবার খাওয়ার সুযোগ থাকে না। কিছু শুকনো খাবার দিয়েই চালিয়ে নিতে হয়। আর যারা অভিজ্ঞ নয়, তাদের সময়ও লাগে অনেক বেশি। রোয়েনদক ট্রেক করতে আমাদের সময় লেগেছিল প্রায় আট ঘণ্টা।
ক্লান্ত শরীরে সাওডং পাড়ায় ফিরে এসে করলাম আরেক পাগলামি। গোসল, বিশ্রাম বা ভালোভাবে কিছু খাওয়ার আগেই আবার বেরিয়ে পড়লাম কাছাকাছি আরেক ঝর্ণা—নিম্বোখিয়াম দেখতে। ভেবেছিলাম, আগের ট্রেইলের তুলনায় এটি হয়তো সহজ হবে।

কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে আবারও বুঝলাম, পাহাড় কখনোই নিজের কঠিনতা পুরোপুরি আগাম জানায় না। শেষ ঢালটি ছিল খাড়া এবং পিচ্ছিল। আমরা কয়েকজন একে অপরের সহযোগিতায় নিচে নামতে পারলেও দুই নারী সহযাত্রী সেখানে আটকে গেলেন। তবে তারাও হাল ছাড়েননি। স্থানীয় সহায়তায় ধীরে ধীরে তারাও পৌঁছে গেলেন ঝর্ণার পাদদেশে।
সেই মুহূর্তে সব ক্লান্তি যেন কোথায় মিলিয়ে গেল। রোয়েনদকের কিছুটা হতাশা নিম্বোখিয়াম এসে দূর করে দিল। পানির প্রবাহ, চারপাশের নির্জনতা আর মানুষের উপস্থিতি কম থাকায় ঝর্ণাটির মধ্যে ছিল এক ধরনের বুনো সৌন্দর্য। ছোট্ট খাদে হাত-পা ছড়িয়ে বসে মনে হচ্ছিল, যেন প্রকৃতির তৈরি এক প্রাকৃতিক সুইমিং পুলে সময় কাটাচ্ছি।
দুই দিনের টানা ধকল শরীর আর নিতে চাইছিল না। আমার চলাফেরা দেখেই সহযাত্রী বন্ধুরা বুঝে গিয়েছিলেন, শরীর কিছুটা বিশ্রাম চাইছে। সাওডং পাড়ায় ফিরে এসে বুঝলাম, আজকের দিনের ক্লান্তি শুধু শরীরে নয়, মনেও জমে আছে। সামনে আরও পথ বাকি, তাই রাতটা ভালোভাবে বিশ্রাম নেওয়াই জরুরি।
(দ্বিতীয় কিস্তি সমাপ্ত)