এক ভীতু তরুণের গহীন পাহাড় জয়ের গল্প
সাঙ্গুর ‘বাঘের মুখ’ থেকে দুর্গম ‘সাওডং’ পাড়া
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৪ পিএম
⚫ জি এম জাহাঙ্গীর আলম
পাহাড়ে ভ্রমণের পূর্ব অভিজ্ঞতা বলতে শুধু চাঁদের গাড়িতে চড়ে সাজেকে যাওয়া আর মিরিঞ্জা ভ্যালিতে এক রাত কাটানো। তবে ২০২৬ সালের আগস্টে চারদিন দুর্গম পাহাড়ে ঘোরাঘুরির পর মনে হলো, পাহাড়ে চড়ার আমার পূর্ব অভিজ্ঞতা নেহাতই ‘দুধ-ভাত’।
আমাদের মতো অপেশাদার এবং শারীরিকভাবে খুব একটা প্রস্তুত না থাকা মানুষের জন্য এই ভ্রমণ যে কতটা চ্যালেঞ্জিং, তা পরবর্তী কয়েকটি পর্বে বোঝা যাবে। তবে দাঁতে দাঁত চেপে সেই চ্যালেঞ্জগুলো উতরে যাওয়ার পরে মনে যে রোমাঞ্চ আর আনন্দের অনুভূতি কাজ করে, তা সত্যিই চিরস্মরণীয়। সারাজীবন পরবর্তী প্রজন্মকে গল্প করার মতো রসদ যেন জোগাড় হয়ে গেল।
একটি ট্রাভেল গ্রুপের আয়োজনে আমরা গিয়েছিলাম প্রায় ২০ জনের একটি দল। এই ট্যুরের আগে অধিকাংশই কেউ কাউকে চিনতাম না। আমাদের দলটাও ছিল বেশ বৈচিত্র্যময়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ব্যাংকার, উদ্যোক্তা, সাংবাদিক, ব্যবসায়ীসহ নানা পেশার মানুষ ছিলেন এই দলে। বয়সেও ছিল ভিন্নতা।
তাই শুধু পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করেই ক্ষান্ত থাকিনি আমরা। অল্প সময়ে পরিচিত হয়েছি নানা পেশার মানুষের জীবনসংগ্রাম আর অভিজ্ঞতার সঙ্গে।

সাঙ্গুর বুক থেকে বাঘের মুখ
দুপুর নাগাদ থানচিতে পৌঁছে প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ও চেক-ইন প্রক্রিয়া শেষ করে আমরা নেমে এলাম সাঙ্গু নদীর পাড়ে। বিজিবি চেকপোস্টের ঘাটে কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর ইঞ্জিনচালিত সরু ছোট নৌকায় উঠে বসলাম, পাঁচজন করে একেকটি নৌকায়। আমাদের নৌকা চলতে শুরু করলো 'বাঘের মুখ' নামক স্থানের দিকে।
স্রোত থাকলেও সাঙ্গু নদী সেদিন খুব বেশি উত্তাল ছিল না। তবুও সামনে যেহেতু আরও দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হবে, তাই মনের মধ্যে একটা অজানা ভয় কাজ করছিল। এই ট্যুরে যাওয়ার আগে কিছুটা সংশয়ী ছিলাম। পাহাড়ের দুর্গমতা, সাঙ্গু নদীর গল্প—সব মিলিয়ে সিদ্ধান্তটা ঠিক নিয়েছি কি না, সেই প্রশ্নও ছিল। কিন্তু রাজি হয়ে যে ভুল করিনি, তা সাঙ্গুর দুই পাশের অপার সৌন্দর্য বারবার প্রমাণ দিতে লাগল।
যতই এগোচ্ছি, ততই পাহাড়ের বিশালতা অনুভব করছি। সঙ্গে বাড়ছে নদীর গর্জন। কিছুদূর পরপর আসছে নদীর ভয়ঙ্কর বাঁক আর তীব্র স্রোত। তবে মাঝির দক্ষতায় ধীরে ধীরে ভয় কেটে যাচ্ছিল। আবার মনোযোগ দিতে শুরু করলাম চারপাশের সৌন্দর্যে।
পাহাড়গুলো এত বিশাল, মনে হচ্ছিল যেন আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকে সবুজের এমন হাতছানি, চোখ ফেরানো কঠিন। নদীর দুই পাশের মাটির গঠন ও বৈশিষ্ট্যও ছিল ভিন্ন। ভূ-তত্ত্ব বিশেষজ্ঞ না হওয়ায় এর ব্যাখ্যা দেওয়ার মতো জ্ঞান নেই, তবে দৃশ্যটি যে মুগ্ধ করার মতো ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সাঙ্গুর স্রোত, তার ওপর এক ফালি ছোট্ট নৌকা—সব মিলিয়ে এক ধরনের রোমাঞ্চ কাজ করছিল।
এর মধ্যেই আমাদের নৌকার দুই নারী সহযাত্রী আবদার করলেন, নৌকার একেবারে সামনের অংশে গিয়ে ছবি তুলবেন। নৌকায় থাকা গাইড পরিস্থিতি বুঝে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তাদের সেই ইচ্ছা পূরণে সহায়তা করলেন।

পাহাড়ের প্রথম ধাক্কা
অবশেষে পৌঁছে গেলাম বাঘের মুখে।
নৌকা থেকে নেমে কিছুটা গুছিয়ে নেওয়ার পর বুঝলাম, এবার শুরু হবে আসল পরীক্ষা। সামনে আর নদী নেই, আছে শুধু পাহাড়। পাশ থেকে কে যেন বলে উঠলেন—“Now the real journey begins.” কিন্তু সামনে যে আমাদের জন্য কতটা কঠিন পথ অপেক্ষা করছে, তা তখনও বুঝতে পারিনি।
শুরুর দিকে ২০-২৫ ফুট উঁচু-নিচু পাহাড়ি ঢাল বেয়ে এগিয়ে চলছিলাম। কখনো সামনে পড়ছিল ঝিরঝির শব্দে বয়ে চলা পাহাড়ি ঝিরি। একসঙ্গে পথ চলা, একে অপরের হাত ধরে পাহাড় পার হওয়ার মধ্যে একটা আনন্দও ছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে লাগল ক্লান্তি। কাঁধের ব্যাগটা যেন ধীরে ধীরে আরও ভারী হয়ে উঠছে। অনভ্যস্ত একজন মানুষের জন্য এই অনুভূতি মোটেই সুখকর নয়। তবুও মনের জোরে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর সেই জোরও যেন ভেঙে পড়ার উপক্রম হলো।
সামনে ৯০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলের মতো খাড়া ঢাল। উঠতে হবে আলগাভাবে পড়ে থাকা একটি গাছের গুঁড়ি বেয়ে। কষ্টেসৃষ্টে সেই ধাপ পার হলাম। কিন্তু পাহাড়ি খাড়া ঢাল যেন শেষ হয় না। একসময় মনে হলো, কাঁধের ব্যাগ আমাকে পেছনের দিকে টেনে ধরছে। আর আমি যেন খাড়া পাহাড়ি ঢালে বাদুড়ের মতো ঝুলে আছি।
একটি ভুল পদক্ষেপ এনে দিতে পারে বড় বিপদ। সেই মুহূর্তে মনে প্রশ্ন জাগল— এভাবে শখ করে নিজেকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া কি সত্যিই বুদ্ধিমানের কাজ? পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ নয়, তখন মনে হচ্ছিল আগে নিরাপদে বেঁচে ফিরতে হবে।
কয়েকজন অবশ্য দারুণ সক্ষমতার পরিচয় দিলেন। তবে আমাদের মতো অনভিজ্ঞদের জন্য প্রতিটি ধাপই ছিল যুদ্ধের মতো। কেউ কেউ এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন যে, কিছুক্ষণ বিশ্রাম ছাড়া এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল।
এদিকে সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল। ঘন জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়ের নিচের অংশে অন্ধকার নেমে আসে আরও দ্রুত। তাই ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ ছিল না। ঘন ঘন বিশ্রাম নিয়ে, ক্লান্ত শরীর নিয়ে আমরা ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে লাগলাম।
সূর্যের তীব্রতা থেকে মুক্তি মিললেও এবার চোখ রাঙাতে শুরু করল ঘন মেঘ। বৃষ্টি নামলে পিচ্ছিল পাহাড়ি পথে আমাদের মতো অনভিজ্ঞ ট্রেকারদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে—এই চিন্তা মাথায় ঘুরছিল। শেষ পর্যন্ত বৃষ্টি নামল। তবে খুব বেশি জোরালো ছিল না। ঘন জঙ্গলের কারণে পাহাড়ি পথ খুব বেশি ভিজে উঠল না।
ক্লান্ত-শ্রান্ত পায়ে অবশেষে আমরা প্রবেশ করলাম দুর্গম পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত কয়েক ঘর বসতি নিয়ে গড়ে ওঠা সাওডং পাড়ায়। মারমা জনগোষ্ঠীর এই ছোট্ট পাড়ার সর্দারের বাড়িতেই আমাদের রাতের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল। সারাদিনের যাত্রায় সকালের নাস্তা আর পাহাড়ি ঝিরির পানি ছাড়া পেটে পড়েনি তেমন কিছু। তাই রাতের খাবারের অপেক্ষায় ছিলাম সবাই।
খেতে খেতেই পরবর্তী দিনের পরিকল্পনা জানানো হলো। জানানো হলো— “কালকের ট্রেকটা আপনাদের জন্য একটু কষ্টকর হবে।” জুম ঘরের মাচায় পিঠ এলিয়ে দিলাম। ক্লান্ত শরীর গভীর ঘুম চাইছে। কিন্তু মাথা থেকে একটা চিন্তা সরছে না। আচ্ছা, ‘একটু কষ্টকর’ শব্দযুগলের ‘একটু’ শব্দটি কি আসলেই একটু?