সাইবারট্রাক উৎপাদন বন্ধের ইঙ্গিত ইলন মাস্কের
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৩২ পিএম
টেসলার আলোচিত বৈদ্যুতিক পিকআপ ট্রাক ‘সাইবারট্রাক’-এর উৎপাদন বন্ধের পথে হাঁটতে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। আগামী বছর, যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে অবস্থিত কারখানায় সাইবারট্রাকের উৎপাদন কমিয়ে আনা বা বন্ধ করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন টেসলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইলন মাস্ক। তবে গাড়িটির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ করা হবে, নাকি অন্য কোনো কারখানায় সরিয়ে নেওয়া হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু জানাননি তিনি।
মাস্কের ভাষ্য, স্বচালিত গাড়ি ‘সাইবারক্যাব’-এর উৎপাদন বাড়ানোর জন্যই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
তবে সাইবারট্রাক প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলী ওয়েস মরিলের এক বক্তব্যে গাড়িটির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘সাইবারট্রাক ছিল প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের অসাধারণ একটি প্ল্যাটফর্ম। এর সেই প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রা সাইবারক্যাবের মধ্য দিয়ে অব্যাহত থাকবে।’
গাড়িটি ঘিরে টেসলার একনিষ্ঠ ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হলেও উৎপাদন শুরুর আগে নানা বিলম্বের মুখে পড়ে প্রকল্পটি। অবশেষে ২০২৩ সালে বাজারে আসে গাড়িটি। তবে বাজারে আসার পর প্রত্যাশা অনুযায়ী বিক্রি বাড়াতে পারেনি এটি।
উৎপাদন বন্ধের সম্ভাব্য খবরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হতাশা প্রকাশ করছেন টেসলার অনেক ভক্ত। এক ব্যবহারকারী সাইবারট্রাককে ‘টেসলার তৈরি করা এ পর্যন্ত সেরা গাড়ি’ উল্লেখ করে আগামী বছর এর উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরে আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
জবাবে মাস্ক শুধু ‘সত্য’ লিখে সম্মতি জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘তবে সাইবারট্রাকের বহর দীর্ঘদিন রাস্তায় থাকবে।’
সাইবারট্রাক বরাবরই মাস্কের বিশেষ আগ্রহের একটি প্রকল্প। চলতি বছরের মার্চে, গাড়িটি সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষ যতটা অসাধারণ মনে করে, এটি তার চেয়েও অনেক বেশি চমৎকার।’
এর আগে, এপ্রিলে, একে টেসলার তৈরি এখন পর্যন্ত সেরা পণ্য বলেও উল্লেখ করেছিলেন তিনি।
তবে মাস্কের এই উচ্ছ্বাসের সঙ্গে সাধারণ ক্রেতাদের আগ্রহ কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল। বিশেষকরে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও লাভজনক পিকআপ ট্রাকের বাজারে জায়গা করে নেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে সংশয় ছিল বিশ্লেষকদের। গাড়িটির নকশা ও বিপণন নিয়েও যেমন আলোচনা হয়েছে, তেমনি এর উচ্চমূল্য এবং উৎপাদনসংক্রান্ত নানা জটিলতাও ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০১৯ সালে প্রথমবার জনসমক্ষে সাইবারট্রাক উন্মোচনের সময় একটি বিব্রতকর ঘটনার মুখে পড়তে হয় মাস্ককে। গাড়িটির জানালার কাচ কতটা মজবুত, তা দেখাতে গিয়ে সরাসরি প্রদর্শনীর মঞ্চে ধাতব বল ছুড়ে মারেন টেসলার এক প্রকৌশলী। কিন্তু অক্ষত থাকার কথা থাকলেও আঘাতে কাচটি ভেঙে যায়। ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং সাইবারট্রাকের প্রচারণায় অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে।
তবে সেই ঘটনার পরও গাড়িটি নিয়ে ক্রেতাদের আগ্রহের ঘাটতি ছিল না। ২০১৯ সালে, যখন সাইবারট্রাকের উন্নয়নকাজ চলছিল, তখনই গাড়িটির জন্য ১ লাখ ৪৬ হাজার অর্ডার পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন মাস্ক।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর, ২০২৩ সালে, বাজারে আসে সাইবারট্রাক। উন্মোচনের সময় আলোচিত সেই ব্যতিক্রমী নকশা ধরে রাখে টেসলা। স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি বহিরাবরণ এবং ধারালো কোণবিশিষ্ট কাঠামোর কারণে প্রচলিত পিকআপ ট্রাকের তুলনায় একেবারেই আলাদা ছিল গাড়িটি।
এর নকশা নিয়ে টেসলার ভক্তদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়। অনেকেই এর চেহারাকে ভবিষ্যৎনির্ভর চলচ্চিত্রের গাড়ির সঙ্গে তুলনা করেন। কেউ কেউ একে জনপ্রিয় সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্র ‘ব্লেড রানার’ থেকে উঠে আসা কোনো যানবাহনের মতো বলেও মন্তব্য করেন।
তবে সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া ছিল একেবারেই ভিন্ন। তাদের অনেকেই গাড়িটির অস্বাভাবিক নকশার সমালোচনা করেন। কেউ কেউ এর চেহারাকে রীতিমতো কুৎসিত বলেও আখ্যা দেন।
নকশা নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি একের পর এক কারিগরি সমস্যাও সাইবারট্রাকের ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলেছে। বিভিন্ন সময়ে গাড়িটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছে টেসলা। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ৪৬ হাজারের বেশি সাইবারট্রাক প্রত্যাহার করা হয়। গাড়ির বাইরের একটি ট্রিম বা সাজসজ্জার অংশ খুলে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
দামও গাড়িটির বাজার সম্প্রসারণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ২০২৩ সালে ওয়াল স্ট্রিটের বিশ্লেষকদের সঙ্গে এক আলোচনায় মাস্ক স্বীকার করেছিলেন, সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে আনতে সাইবারট্রাকের উৎপাদন খরচ কমানো জরুরি। তবে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাসহ গাড়িটির দাম শেষ পর্যন্ত দাঁড়ায় ৬১ হাজার ডলারে, যা তখনকার হিসাবে প্রায় ৪৮ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড।
২০২৬ সালে এসে সাইবারট্রাকের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘সাইবারবিস্ট’ সংস্করণের দাম আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ডলারে।
/এআই