×
Logo

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

অ্যানথ্রপিকের আশঙ্কা

স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুলিপি তৈরি করে ইন্টারনেটজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে এআই মডেলগুলো

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫২ এএম

স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুলিপি তৈরি করে ইন্টারনেটজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে এআই মডেলগুলো

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-য়ের নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এআই মডেলগুলো শিগগিরই নিজে থেকেই অনুলিপি তৈরি করে ইন্টারনেটজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক। 

অ্যানথ্রপিকের আশঙ্কা, নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া কোনো এআই নিজেই একটি বটনেট তৈরি করতে পারে। এরপর দ্রুত বিভিন্ন ডিভাইসে ছড়িয়ে পড়া, সেটিকে বন্ধ করার প্রচেষ্টা প্রতিহত করা এবং নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে ডেটা সেন্টারে প্রবেশের চেষ্টাও করতে পারে এমন এআই। 

মূলত, বটনেট হলো, ইন্টারনেটে যুক্ত একাধিক ডিভাইসের এমন একটি নেটওয়ার্ক, যা দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যায়।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) কয়েকজন বিশেষজ্ঞ অ্যানথ্রপিকের উদ্বেগের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তবে অন্তত একজন বিশেষজ্ঞের মতে, প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের পণ্যের গুরুত্ব বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা থেকে এমন সতর্কবার্তা দিয়ে থাকতে পারে।

সোমবার (১২ অক্টোবর) প্রকাশিত অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদনটি, গত মাসে, প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) দারিও আমোদেইয়ের দেওয়া সতর্কবার্তাকে আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরে। 

আমোদেই তখন আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে, এমনকি তার আগেও, এআই পুরো ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। এক্ষেত্রে ইন্টারনেটজুড়ে স্থায়ীভাবে সক্রিয় একটি বটনেট ব্যবহারের সম্ভাবনার কথাও বলেছিলেন তিনি।

তবে এ ধরনের ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন কয়েকজন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ। তাদের যুক্তি, এআই মডেলগুলো, আকারে এত বড় যে সেগুলোকে দক্ষতার সঙ্গে এক ডিভাইস থেকে অন্য ডিভাইসে সরিয়ে নেওয়া কঠিন হবে। একই সঙ্গে, স্বাধীনভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং ক্ষমতাও এসব মডেলের হাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকবে না।

অ্যানথ্রপিকের নতুন প্রতিবেদনে এসব বাধা কীভাবে অতিক্রম করা সম্ভব, তার একটি প্রাথমিক ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। 

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তাদের পরীক্ষায় দেখা গেছে, ৩০ বিলিয়ন বা তার কম প্যারামিটারবিশিষ্ট মাঝারি আকারের এআই মডেলগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেদের অনুলিপি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় অনেকগুলো পৃথক কাজ ইতোমধ্যে করতে পারে। যদিও পুরো প্রক্রিয়াটি নির্ভরযোগ্যভাবে সম্পন্ন করতে এখনো তাদের সমস্যা হয়।

অ্যানথ্রপিকের দাবি, ইন্টারনেটে যুক্ত স্বল্পমূল্যের বিভিন্ন ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং সক্ষমতা একত্র করতে পারে এসব মডেল।

প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, এ ধরনের স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম এআইকে বন্ধ করা কঠিন হবে। কারণ, এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো একক কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা না থাকলে বন্ধ করে দেওয়ার মতো নির্দিষ্ট একটি জায়গাও থাকবে না।

ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠা এআই ব্যবস্থার নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, অ্যানথ্রপিকের এই প্রতিবেদন তারই অংশ। বিশেষকরে, এআই দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাইবার হামলা চালানো, মানুষের সীমিত তদারকিতে কাজ করা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার বাধা এড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

এআই মডেলের সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ কর্মকর্তা ও বিভিন্ন এআই প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কাছ থেকেও একের পর এক সতর্কবার্তা এসেছে। তাদের কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, নিয়ন্ত্রণহীন এআইয়ের বিকাশ ভয়াবহ, এমনকি মানব অস্তিত্বের জন্যও হুমকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে অ্যানথ্রপিকের সতর্কবার্তা নিয়ে সংশয়ও রয়েছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টারের সাবেক প্রধান সিয়ারান মার্টিন বলেন, ‘আমরা সস্তা টেলিভিশনে একটি ছোট মডেল চালাতে পেরেছি, এতেই নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয় না।’

তার মতে, অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদনটি প্রযুক্তিগতভাবে আকর্ষণীয় হলেও এতে নিজেদের প্রযুক্তি বা পণ্যের গুরুত্ব বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা স্পষ্ট।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো ডেনভারের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ঝেংশিয়ং লি মনে করেন, পরীক্ষাগুলো নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে চালানো হলেও বিষয়টি উদ্বেগজনক। কারণ, এআই কার্যত একটি ‘ওয়ার্মে’ পরিণত হতে পারে। ওয়ার্ম হলো এমন এক ধরনের ক্ষতিকর কম্পিউটার প্রোগ্রাম, যা নিজে থেকেই নিজের অনুলিপি তৈরি করে বিভিন্ন ডিভাইসে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

লি বলেন, এ ধরনের এআই যদি কোনো কেন্দ্রীয় সেবার ওপর নির্ভর না করে অসংখ্য ডিভাইসে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সেটিকে বন্ধ করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো একটি জায়গা নাও থাকতে পারে। বিভিন্ন ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার নতুন নতুন উপায়ও এটি তাৎক্ষণিকভাবে বের করে নিতে পারে বলে আশঙ্কা তার।

অ্যানথ্রপিকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ছোট আকারের এআই মডেলগুলোর সক্ষমতা যদি আগের গতিতেই বাড়তে থাকে, তাহলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেদের অনুলিপি তৈরি ও ছড়িয়ে পড়ার প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এআই মডেলগুলো নিজেদের বিস্তার ঘটাতে আরও শক্তিশালী কম্পিউটিং অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। এর মধ্যে ডেটা সেন্টারের প্রসেসরও থাকতে পারে। এমনটি ঘটলে আরও বড় পরিসরের কম্পিউটিং ক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ পেতে পারে এআই মডেলগুলো।

তবে একজন গবেষক মনে করেন, অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদনকে নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে না দেখে সম্ভাব্য একটি পরিস্থিতির বিশ্লেষণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড এমার্জিং টেকনোলজির জ্যেষ্ঠ গবেষণা বিশ্লেষক জেসিকা জি বলেন, গত তিন মাসে, নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া এআইয়ের কার্যকলাপ নিয়ে যেসব তথ্য সামনে এসেছে, তাতে মডেলগুলোর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া যুক্তিসংগত।

তবে এমন পরিস্থিতি বাস্তবে ঘটার সম্ভাবনা কতটা, তা এখনো জানা যায়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি। জেসিকা জির ভাষায়, ‘এই ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা একেবারে শূন্য নয়, আবার এটি যে ঘটবেই, তেমন নিশ্চয়তাও নেই।’

/এআই 

Logo