×
Logo

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

মহাকাশের রহস্য উন্মোচনে ন্যান্সি গ্রেস রোমান টেলিস্কোপ উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নাসার

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০২:৫০ পিএম

মহাকাশের রহস্য উন্মোচনে ন্যান্সি গ্রেস রোমান টেলিস্কোপ উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নাসার

মহাবিশ্বের অদেখা রহস্য খুঁজতে মহাকাশে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে নাসার নতুন স্পেস টেলিস্কোপ—ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ। বিজ্ঞানীরা যাকে বলছেন ‘ডিসকভারি মেশিন’ বা আবিষ্কারের যন্ত্র।

মহাকাশের খুব ক্ষীণ ও এখনো অদেখা বস্তু খুঁজে বের করার জন্য তৈরি করা হয়েছে রোমান টেলিস্কোপটি। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে স্পেসএক্সের ফ্যালকন হেভি রকেটে করে এটি মহাকাশে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।

রোববার (৩০ আগস্ট) স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ২৬ মিনিটে (যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময়) টেলিস্কোপটি উৎক্ষেপণের কথা রয়েছে।

আগামী পাঁচ বছর মহাবিশ্বের বিভিন্ন অংশ পর্যবেক্ষণ করবে রোমান। এ সময় মহাবিশ্ব নিয়ে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো ডার্ক এনার্জি। এই রহস্যময় শক্তির কারণেই মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ক্রমেই দ্রুত হচ্ছে বলে ধারণা বিজ্ঞানীদের।

আরেকটি বড় রহস্য ডার্ক ম্যাটার। মহাবিশ্বের কাঠামো গঠনে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে মনে করা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরাসরি দেখা বা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি ডার্ক ম্যাটারকে।

রোমানের মাধ্যমে আগে কখনো দেখা যায়নি এমন অনেক গ্যালাক্সি ও এক্সোপ্ল্যানেট খুঁজে পাওয়ার আশা করছেন বিজ্ঞানীরা। এক্সোপ্ল্যানেট হলো সৌরজগতের বাইরের কোনো নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করা গ্রহ। এমনকি কোনো নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ না করে মহাকাশে একা ঘুরে বেড়ানো ‘রোগ প্ল্যানেট’ বা ভাসমান গ্রহও খুঁজে পেতে পারে এই টেলিস্কোপ।

গত ২১ এপ্রিল, মেরিল্যান্ডের গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারে টেলিস্কোপটি উন্মোচনের সময় নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান বলেন, রোমান পৃথিবীকে মহাবিশ্বের একটি নতুন মানচিত্র দেবে।

রোমানের অন্যতম বড় সুবিধা হলো এর বিশাল পর্যবেক্ষণ ক্ষেত্র। এটি হাবল স্পেস টেলিস্কোপের চেয়ে এক হাজার গুণেরও বেশি দ্রুত মহাকাশ জরিপ করতে পারবে।

এর ফলে হাবল বা জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপে যেসব পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়, রোমানের মাধ্যমে সেসবের অনেকটাই করা সম্ভব হবে।

নাসার সায়েন্স মিশন ডিরেক্টরেটের সহযোগী প্রশাসক ড. নিকি ফক্স বলেন, তিনটি টেলিস্কোপের তথ্য একসঙ্গে ব্যবহার করলে মহাবিশ্বের আরও পরিষ্কার ও পূর্ণাঙ্গ ছবি পাওয়া যাবে।

উৎক্ষেপণের পর নির্ধারিত কক্ষপথে পৌঁছাতে রোমানের প্রায় তিন মাস সময় লাগবে। পৃথিবী থেকে প্রায় ১০ লাখ মাইল বা ১৬ লাখ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করবে এটি।

কক্ষপথে পৌঁছানোর পর শুরু হবে টেলিস্কোপের বিভিন্ন যন্ত্র পরীক্ষা। সবকিছু ঠিকঠাক কাজ করছে কি না, তা যাচাইয়ের পাশাপাশি পৃথিবীতে ছবি ও তথ্য পাঠানোর জন্য অ্যান্টেনাও সক্রিয় করা হবে।

গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের রোমান টেলিস্কোপ ইন্টিগ্রেশন অ্যান্ড টেস্ট বিজ্ঞানী জেরেমি পারকিনস জানান, টেলিস্কোপটি প্রতিদিন প্রায় এক টেরাবাইট তথ্য পৃথিবীতে পাঠাতে পারবে। ১০ লাখ মাইল দূর থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ গান স্ট্রিম করার মতো বিপুল পরিমাণ তথ্য হবে এটি।

রোমান তৈরিতে প্রায় এক দশক সময় লেগেছে। টেলিস্কোপটি তৈরিতে খরচ হয়েছে আনুমানিক ৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার।

তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, রোমানের মাধ্যমে এমন অনেক মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান মিলতে পারে, যেগুলোর অস্তিত্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা এখনো জানেন না।

নাসার রোমান প্রোগ্রাম বিজ্ঞানী ডমিনিক বেনফোর্ড বলেন, আগের যেকোনো প্রযুক্তির চেয়ে যখন নতুন কোনো প্রযুক্তি অনেক বেশি সক্ষম হয়, তখন সেটি এমন জিনিসও খুঁজে বের করতে পারে, যেগুলোর অস্তিত্ব সম্পর্কে আগে জানা ছিল না।

তার মতে, ‘ডিসকভারি মেশিন’ হিসেবে রোমানের একটি বড় উদ্দেশ্য হলো—মহাবিশ্বকে এমন প্রশ্ন করার সুযোগ তৈরি করা, যেসব প্রশ্ন এখনো মানুষের মাথায় আসেনি।

কেন ন্যান্সি গ্রেস রোমানের নামে?

রোমান টেলিস্কোপের নামকরণ করা হয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ড. ন্যান্সি গ্রেস রোমান-এর নামে। মহাকাশে টেলিস্কোপ পাঠিয়ে মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের ধারণা এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার।

১৯৬০-এর দশকে ন্যান্সি গ্রেস রোমান ছিলেন নাসার প্রথম প্রধান জ্যোতির্বিজ্ঞানী। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাধা এড়িয়ে মহাকাশ থেকে মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের সম্ভাবনা তিনি তুলে ধরেন। এ কারণে তাকে প্রায়ই ‘হাবল স্পেস টেলিস্কোপের মা’ বলা হয়।

নাসার অ্যাস্ট্রোফিজিকস বিভাগের পরিচালক ড. শন ডোমাগাল-গোল্ডম্যান বলেন, নতুন নতুন মহাকাশ টেলিস্কোপ তৈরির মাধ্যমে ন্যান্সি রোমানের সেই কাজই আরও এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি নতুন টেলিস্কোপ মহাবিশ্ব দেখার নতুন সুযোগ তৈরি করছে।

রোমানের প্রথম ছবি আগামী বছরের জানুয়ারিতে পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। এরপর শুরু হবে মহাবিশ্বের অন্যতম বড় জরিপ।

রোমানের জ্যেষ্ঠ প্রকল্প বিজ্ঞানী ড. জুলি ম্যাকএনারির মতে, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে গ্রহের সবচেয়ে বড় জরিপ চালাবে এই টেলিস্কোপ। এর মাধ্যমে আগে অজানা হাজার হাজার নতুন জগতের সন্ধান মিলতে পারে।

এতে শুধু নতুন গ্রহই খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমাদের সৌরজগতের মতো গ্রহব্যবস্থা মহাবিশ্বে কতটা বিস্তৃত, সে সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যাবে।

/এআই 

Logo