সাংহাইয়ের শেয়ারবাজারে চীনা রোবট নির্মাতা ইউনিট্রির রেকর্ড, প্রথম দিনেই দাম বেড়েছে ৬০০%
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১১:২৯ এএম
বিশ্বের অন্যতম বড় হিউম্যানয়েড রোবট নির্মাতা চীনের ইউনিট্রি রোবোটিকস বুধবার (১৯ আগস্ট) সাংহাইয়ের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। বাজারে লেনদেন শুরুর পরপরই কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ৬০০ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়।
বহুল প্রত্যাশিত প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওতে ইউনিট্রির শেয়ার ১ হাজার ১০০ ইউয়ান (প্রায় ১২০ দশমিক ৬০ পাউন্ড বা ১৬৩ দশমিক ১২ ডলার) দরে লেনদেন শুরু করে। পরে কিছুটা কমে শেয়ারটির দাম প্রায় ৯০০ ইউয়ানে নেমে আসে।
চীনের প্রযুক্তিনির্ভর স্টার মার্কেটে ইউনিট্রির তালিকাভুক্তি দেশটির রোবোটিকস শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্টার মার্কেটকে অনেক সময় চীনের ‘ন্যাসডাক’ও বলা হয়।
এমন সময় ইউনিট্রির শেয়ারবাজারে অভিষেক হলো, যখন রোবট এবং এসব রোবটকে পরিচালনাকারী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির বৈশ্বিক বাজারে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে।
চীনের কোনো হিউম্যানয়েড রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইউনিট্রিই প্রথম নয়, যারা শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। তবে চীনে এই প্রথম কোনো হিউম্যানয়েড রোবট নির্মাতা কোম্পানি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হলো।
স্বয়ংক্রিয় শিল্পযন্ত্র ও স্মার্ট ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের মতো রোবট ইতোমধ্যে কারখানা, গুদাম ও বাসাবাড়িতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখন মানুষের মতো দেখতে ও দুই পায়ে হাঁটতে সক্ষম হিউম্যানয়েড রোবট নিয়ে বড় ধরনের বিনিয়োগে নেমেছে বিভিন্ন কোম্পানি। টেসলা, বিওয়াইডি ও অ্যামাজনের মতো প্রতিষ্ঠানও মানুষের করা বিভিন্ন কাজ সম্পাদনে সক্ষম এ ধরনের রোবট তৈরি করছে।
ইউশু টেকনোলজি কোম্পানি লিমিটেড নামে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচিত ইউনিট্রি ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে চীনের উন্নত প্রযুক্তি বিকাশের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে প্রতিষ্ঠানটি।
রোবোটিকস শিল্পে শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইতোমধ্যে পরিচিতি পেয়েছে ইউনিট্রি। সেন্সর ও স্বয়ংক্রিয় রোবটিক বাহু থেকে শুরু করে চার পা ও মানুষের আকৃতির রোবট—বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিপণ্য তৈরি ও বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রযুক্তিটির চাহিদা বাড়ায় গত বছর ৫ হাজার ৫শ'টিরও বেশি হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহ করেছে ইউনিট্রি। এই খাতের অল্প কয়েকটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানের একটি ইউনিট্রি। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা ছিল ২৭৮ মিলিয়ন ইউয়ান।
যুক্তরাষ্ট্রের রোবট নির্মাতাদের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা করছে ইউনিট্রি। একই ধরনের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন রোবট তুলনামূলক কম দামে তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি।
চীনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর হাংজৌতে ইউনিট্রির সদর দফতর। অঞ্চলটি রোবোটিকস প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ‘গোল্ডেন ক্লাস্টার জোন’ হিসেবে পরিচিত। সরকারি বিপুল বিনিয়োগের সুবিধা পেয়েছে এখানকার রোবোটিকস প্রতিষ্ঠানগুলো।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম চায়না ডেইলির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চীনে রোবোটিকস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে।
বাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ফেই কিনের মতে, চীনের ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনগোষ্ঠীর কারণে ভবিষ্যতে শ্রমিক সংকট দেখা দিতে পারে। সেই সংকট মোকাবিলায় রোবট সম্ভাব্য সমাধান হয়ে উঠতে পারে।
তার মতে, উন্নত প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় রোবোটিকস খাতকে ‘কৌশলগত অগ্রাধিকার’ হিসেবে বিবেচনা করছে বেইজিং। কারখানা, হাসপাতাল এবং ভবিষ্যতে বাসাবাড়িতেও রোবট ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, 'রোবট হলো এমন একটি মাধ্যম, যেটির মাধ্যমে এআই পর্দা থেকে বেরিয়ে অর্থনীতিতে প্রবেশ করে।'
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের গবেষক হ্যারল্ড সো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি রোবটের সফটওয়্যার সাধারণত বেশি ব্যবহারবান্ধব। তবে চীনা নির্মাতাদের তুলনামূলক কম দাম উপেক্ষা করা কঠিন।
ইউনিট্রির রোবট কুকুরের দাম শুরু প্রায় ২ হাজার ৭০০ ডলার থেকে। বিপরীতে বোস্টন ডায়নামিকসের চার পায়ের ‘স্পট’ রোবটের দাম প্রায় ৭০ হাজার ডলার।
তবে ইউনিট্রির কিছু রোবট কুকুর আকারে অনেক ছোট হওয়ায় দুটির সরাসরি তুলনা করা ঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেছেন সো। তার মতে, তবু দামের পার্থক্যটি অনেক বড়।
২০২৩ সাল থেকে হিউম্যানয়েড রোবট বিক্রি করছে ইউনিট্রি। পরের বছর বাজারে আসে শিশু আকৃতির তাদের জি-১ মডেল, যার দাম ১৩ হাজার ৫০০ ডলার।
অন্যদিকে, ইলন মাস্কের টেসলাসহ যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো তাদের তৈরি প্রতিযোগী হিউম্যানয়েড রোবট বাজারে সরবরাহ শুরু করতে পারেনি।
আইপিও'র আগে ইউনিট্রির রোবটকে ঘিরে বড় ধরনের প্রচারণাও চালানো হয়েছে। চলতি সপ্তাহে, বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ২০২৬ ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেমসে অংশ নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির রোবট। সেখানে শত শত দল দৌড় ও ফুটবলের মতো প্রতিযোগিতার পাশাপাশি বাক্স খোলা ও লাইব্রেরির বই সাজানোর মতো কাজেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
এর আগে, ফেব্রুয়ারিতে, চীনের স্প্রিং ফেস্টিভ্যাল গালায় ইউনিট্রির জি-১ রোবটের মার্শাল আর্ট প্রদর্শনী ব্যাপক সাড়া ফেলে। রোবোটিকস গবেষক ডেভিড সু বলেন, রোবটগুলো এমন কিছু কৌশল দেখিয়েছে, যা আগে এভাবে দেখা যায়নি।
তার মতে, এটি রোবোটিকস শিল্পের বিকাশের একটি ইঙ্গিত। রোবোটিকসের দুনিয়ায় চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোই এখন ‘কুল কিডস’ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের জায়গা নিয়েছে।
/এআই