×
Logo

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

রয়টার্স এক্সক্লুসিভ

এআই প্রতিযোগিতায় চীন না যুক্তরাষ্ট্র—এক পক্ষ বেছে নিতে হবে, ‘দুই নৌকায় পা রাখা যাবে না’

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩৫ পিএম

এআই প্রতিযোগিতায় চীন না যুক্তরাষ্ট্র—এক পক্ষ বেছে নিতে হবে, ‘দুই নৌকায় পা রাখা যাবে না’

চীনের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির প্রতিযোগিতায় এবার মিত্র ও অংশীদার দেশগুলোকে স্পষ্টভাবে পক্ষ বেছে নিতে কড়া বার্তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের নেতৃত্বাধীন এআই জোটে থাকা দেশগুলোকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, একই সঙ্গে চীনের নেতৃত্বাধীন প্রতিদ্বন্দ্বী উদ্যোগে যোগ দিলে তারা মার্কিন জোট থেকে বাদ পড়তে পারে।

রয়টার্সের পর্যালোচনা করা মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের একটি অভ্যন্তরীণ খসড়া চিঠি এবং এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এ তথ্য জানা গেছে।

চীনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার মধ্যে গত বছর ‘প্যাক্স সিলিকা’ নামে একটি উদ্যোগ চালু করে যুক্তরাষ্ট্র। এর লক্ষ্য এআই মডেল, সেমিকন্ডাক্টর ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহব্যবস্থা নিরাপদ করা। এখন পর্যন্ত প্রায় দুই ডজন দেশ এই উদ্যোগে যোগ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সম্ভাব্য বড় উৎস কাজাখস্তান এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া।

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের তৈরি খসড়া চিঠিটি, গত জুনে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘এআই অপচুনিটি স্টেটমেন্ট’-এ স্বাক্ষর করা ৩৫টি দেশের উদ্দেশে লেখা হয়েছে। এসব দেশের মধ্যে প্যাক্স সিলিকা কাঠামোর সদস্যদের পাশাপাশি ওয়াশিংটনের সঙ্গে এআই সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী অন্যান্য দেশও রয়েছে।

চিঠিতে দেশগুলোকে এআই নিয়ে নিজেদের অবস্থান ‘সতর্কতার সঙ্গে বেছে নেওয়ার’ আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্যাক্স সিলিকা ঘোষণায় স্বাক্ষর করা কেবল কোনো উদ্যোগের সদস্য হওয়া নয়; এর সঙ্গে একটি প্রতিশ্রুতিও জড়িত।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রযুক্তি সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার হিসেবে অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি এমন কোনো উদ্যোগে যোগ দেওয়া কঠিন, যার লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এআই ব্যবস্থা এগিয়ে নেওয়া।

যদিও খসড়া চিঠিতে সরাসরি চীনের নাম উল্লেখ করা হয়নি, মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্যে বিষয়টি স্পষ্ট। এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ওয়াশিংটনের অবস্থান হলো, একসঙ্গে দুই পক্ষের সঙ্গে থাকা যাবে না। তার ভাষ্য, একটি প্রযুক্তি ব্যবস্থায় নিজেদের বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার হিসেবে তুলে ধরার পাশাপাশি চীনের তৈরি প্রতিদ্বন্দ্বী এআই উদ্যোগে যোগ দেওয়া কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এদিকে, গত জুলাইয়ে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ‘ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন’ নামে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী উদ্যোগ চালু করেন। দ্রুত বিকশিত এআই খাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বিপরীতে চীনের উন্মুক্ত-ওজন বা ‘ওপেন-ওয়েট’ প্রযুক্তিকে এগিয়ে নেওয়াই এর অন্যতম লক্ষ্য।

এখন পর্যন্ত কাজাখস্তানই একমাত্র দেশ হিসেবে পরিচিত, যারা যুক্তরাষ্ট্রের প্যাক্স সিলিকা ও চীনের এই দুই উদ্যোগেই যোগ দিয়েছে। বিষয়টি ওয়াশিংটনের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র কবে এই চিঠি পাঠাবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। পাঠানোর আগে খসড়াটিতে পরিবর্তন আসতে পারে বলেও জানা গেছে। নথিটিতে কোনো তারিখ দেওয়া নেই।

খসড়া চিঠি নিয়ে জানতে চাইলে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর ‘ফাঁস হওয়া বলে দাবি করা অভ্যন্তরীণ নথি’ নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়।

অন্যদিকে, ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাস বাণিজ্য ও প্রযুক্তি ইস্যুকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার বিরোধিতা করেছে। দূতাবাসের এক মুখপাত্র বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী এআইয়ের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং এতে কারও স্বার্থই রক্ষা হবে না।

প্যাক্স সিলিকা উদ্যোগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র ও অংশীদারদের যৌথ প্রকল্প এবং রফতানি নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতার দিকে নিতে চাইছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, এআই মডেল ও সেমিকন্ডাক্টর চিপের ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর ওপর নির্ভরতা কমানোও এর লক্ষ্য।

বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত এআই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষকরে, চীনের ওপেন-ওয়েট এআই মডেলগুলো মার্কিন কোম্পানি ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের তৈরি মালিকানাধীন বা নিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির সঙ্গে দ্রুত ব্যবধান কমিয়ে আনছে।

এআইয়ের সক্ষমতা দ্রুত বাড়তে থাকায় প্রযুক্তিটির সম্ভাব্য সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েও বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মানুষের সরাসরি নির্দেশনা ছাড়াই সাইবার হামলার মতো জটিল কাজ সম্পাদনের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে নিরাপত্তা প্রশ্ন উঠছে।

এদিকে, চীন তার শীর্ষস্থানীয় কিছু এআই মডেলের বিদেশে ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করছে। জাতীয় নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি এআই প্রযুক্তি নিয়ে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনাও এতে স্পষ্ট হচ্ছে।

জুনে কাজাখস্তানকে মধ্য এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে প্যাক্স সিলিকায় যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বড় মজুত রয়েছে, যা উন্নত প্রযুক্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বিষয়টি সামনে এসেছে। এসব খনিজের বাজারে চীনের প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। গত বছর, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুরু করা শুল্কযুদ্ধের পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে চীন এসব খনিজকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্যাক্স সিলিকার সদস্যরা এআই-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ পান। আর ‘এআই অপচুনিটি স্টেটমেন্ট’-এ স্বাক্ষরকারী দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এআই সহযোগিতার ক্ষেত্রে অভিন্ন লক্ষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি প্রতীকী সমর্থন জানিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটেই এবার অংশীদার দেশগুলোকে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার চাপ দিচ্ছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বলেন, কোনো দেশ একই সঙ্গে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রযুক্তি জোটের অংশ হয়ে বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার হিসেবে অবস্থান করতে পারে না।

/এআই 

Logo