×
Logo

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

ফোর্বস ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন

ডিএনএ-র ওপর এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন সায়েন্টিস্টরা, সেটি উদ্ভাবন করেছে '১৬ টি নতুন ভাইরাস'

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫৮ পিএম

ডিএনএ-র ওপর এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন সায়েন্টিস্টরা, সেটি উদ্ভাবন করেছে '১৬ টি নতুন ভাইরাস'

ডিএনএ'র গঠন ও প্রকৃতিতে ভাইরাস কীভাবে বিবর্তিত হয়, সেই ধরণ বুঝতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। এরপর সেই প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়ে আগে প্রকৃতিতে দেখা যায়নি, এমন ১৬টি ভাইরাসের জিনগত নকশা তৈরি করেছে এআই। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের এক গবেষণায় উঠে এসেছে চমকপ্রদ এই তথ্য। 

গবেষণায় ওপেনএআইয়ের তৈরি জেনারেটিভ এআই মডেল ‘ইভো’ ব্যবহার করেন গবেষকরা। লাখ লাখ জিনোমের তথ্য বিশ্লেষণ করে ডিএনএ'র বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও বিবর্তনের ধরন শিখেছে মডেলটি। পরে সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে তৈরি করেছে হাজার হাজার নতুন জিনোমের নকশা। সেগুলোর মধ্যে প্রায় ৩০০টি জিনগত নকশা গবেষণাগারে তৈরি করে পরীক্ষা করেন বিজ্ঞানীরা। পরীক্ষায় দেখা যায়, এর মধ্যে ১৬টি কার্যকর ভাইরাস হিসেবে কাজ করতে সক্ষম এবং সেগুলো ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করতে পারে।

বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট) বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, শুরু থেকেই নতুন ও কার্যকর ভাইরাসের জিনোম নকশা তৈরির সক্ষমতা অর্জনের জন্য ‘ইভো’কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। মানুষের ভাষা শেখার জন্য যেমন এআই মডেলকে বিপুল পরিমাণ লেখা দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, একইভাবে ইভোকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে জীবনের বিভিন্ন শাখা থেকে পাওয়া লাখ লাখ জিনগত তথ্য দিয়ে।

গবেষকরা বলছেন, নতুন তৈরি ভাইরাসগুলোর জিনগত বৈশিষ্ট্য প্রকৃতিতে পাওয়া কোনো ভাইরাসের সঙ্গে মেলে না। অর্থাৎ, এগুলো কেবল বিদ্যমান ভাইরাসের অনুকরণ নয়; বরং এআইয়ের তৈরি সম্পূর্ণ নতুন জিনগত নকশা।

তবে গবেষণায় মানুষের শরীরে রোগ সৃষ্টি করে, এমন কোনো জীবাণুর জিনগত তথ্য প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হয়নি। ফলে তৈরি হওয়া ভাইরাসগুলো মানুষকে সংক্রমিত করতে সক্ষম নয় বলেই জানিয়েছেন গবেষকরা।

তারপরও গবেষণার ফলাফল এআইয়ের অপব্যবহার নিয়ে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষকরে, ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষের জন্য ক্ষতিকর জীবাণু বা জৈব অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব হতে পারে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

একইসঙ্গে, এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য সুফলও রয়েছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী, নতুন ভাইরাস তৈরি করার সক্ষমতা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ভয়ংকর ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে চিকিৎসায় বড় ধরনের অগ্রগতি আনতে পারে।

বর্তমানে নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করতে পারে, প্রকৃতিতে বিদ্দমান এমন ভাইরাস খুঁজে বের করার ওপর অনেকটা নির্ভর করতে হয় গবেষকদের। কিন্তু এআইয়ের সাহায্যে ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়াকে লক্ষ্য করে প্রয়োজনমতো ভাইরাস তৈরি করা গেলে নতুন ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরি হতে পারে।

তবে এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতিতে জীববিজ্ঞানের জগতে তৈরি হওয়া ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন বায়োসিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ, জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও সিনথেটিক বায়োলজিস্টরা।

‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত গবেষণাটির পাশাপাশি লেখা এক মন্তব্যে জন হপকিন্স সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটির বায়োসিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ ড. থমাস ইংলেসবি ও ড. মরিটজ হাঙ্কে সতর্ক করেছেন, স্ট্যানফোর্ডের গবেষণা দেখিয়ে দিচ্ছে যে এআই এখন বিপজ্জনক জৈব অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার দিকে এগোচ্ছে।

তাদের মতে, ভবিষ্যতে মানুষের পাশাপাশি প্রাণী ও কৃষিজ ফসলকে আক্রান্ত করতে পারে, এমন জীবাণুর ক্ষেত্রে একই ধরনের জেনারেটিভ প্রযুক্তির ব্যবহার নিষিদ্ধ করা উচিত। এ বিষয়ে কঠোর আইন ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরিরও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

হাঙ্কে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, জিনোমভিত্তিক এআইকে যদি বলা হয়, ‘এমন একটি ইনফ্লুয়েঞ্জা জিনোম তৈরি করো, যা আরও দ্রুত ছড়াবে বা আরও প্রাণঘাতী হবে’, তাহলে ভবিষ্যতে এমন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তবে সবাই এতটা আশঙ্কাবাদী নন। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের সিনথেটিক জিনোম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক টম এলিস মনে করেন, মানুষের জন্য ক্ষতিকর জৈব অস্ত্র তৈরি করা এতটা সহজ হবে না।

তার মতে, ইভো যে ভাইরাসগুলো তৈরি করেছে, সেগুলো আকার ও জিনগত কাঠামোর দিক থেকে অত্যন্ত ছোট ও তুলনামূলক সহজ। ফলে জেনেটিক তথ্যের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণে কিছু সাধারণ বিধিনিষেধও বড় ধরনের ঝুঁকি কমাতে পারে।

জীববিজ্ঞানে এআইয়ের ব্যবহার কতটা উন্মুক্ত রাখা উচিত, তা নিয়ে গত কয়েক মাস ধরেই বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক চলছে।

একদল গবেষকের মতে, এআই-নির্ভর প্রযুক্তি নতুন ওষুধ, চিকিৎসা পদ্ধতি এবং অন্যান্য জৈবপ্রযুক্তি উদ্ভাবনের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে একই প্রযুক্তির যথাযথ মনিটরিং না থাকলে বিপজ্জনক জীবাণু শনাক্ত, নকশা কিংবা আরও কার্যকর করে তুলতেও ব্যবহৃত হতে পারে।

এই ঝুঁকি মোকাবিলায় বড় কয়েকটি এআই কোম্পানি মিলে ‘ফ্রন্টিয়ার মডেল ফোরাম’ নামে একটি অলাভজনক উদ্যোগও গড়ে তুলেছে। এআই ও জীববিজ্ঞানের সংযোগ থেকে তৈরি ঝুঁকি নিয়ে গবেষণা, নিরাপত্তা মানদণ্ড তৈরি এবং অত্যাধুনিক এআই মডেলের অপব্যবহার ঠেকানোই এর অন্যতম লক্ষ্য।

বিজ্ঞানীদের আরেকটি উদ্বেগ হলো, ভবিষ্যতে এআই মডেলগুলো বিপজ্জনক জীবাণু নিয়ে জ্ঞান অর্জনের পথও সহজ করে দিতে পারে। অর্থাৎ, কোনো ক্ষতিকর উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের জন্য এমন তথ্য পাওয়া সহজ হয়ে যেতে পারে, যা আগে পেতে দীর্ঘদিনের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ও গবেষণাগারের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন হতো।

চলতি বছরের এপ্রিলে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছিলেন, এআই চ্যাটবটকে একাধিক প্রশ্ন করে তারা প্রাণঘাতী জীবাণু তৈরি এবং জনবহুল এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়ার মতো বিপজ্জনক কাজের ধাপে ধাপে নির্দেশনাও পেয়েছিলেন।

স্ট্যানফোর্ডের সর্বশেষ গবেষণা তাই একদিকে যেমন জীববিজ্ঞানে এআইয়ের অসাধারণ সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত দেখাচ্ছে, অন্যদিকে প্রযুক্তিটির অপব্যবহার ঠেকাতে নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ ও নীতিমালা তৈরির প্রয়োজনীয়তাও আরও স্পষ্ট করে তুলছে।

/এআই 

Logo