বিবিসি'র প্রতিবেদন
ব্রিটেনের খুচরা বাণিজ্যে বদলে দিচ্ছে চীনা রোবট, বাড়ছে স্বয়ংক্রিয় গুদাম ব্যবস্থার ব্যবহার
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৪:১৩ পিএম
অনলাইনে কোনো পণ্য অর্ডার করার পর কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেটি প্রক্রিয়াকরণ শুরু হয়ে যায়। এই কাজের পেছনে এখন ক্রমেই বড় ভূমিকা রাখছে চীনের তৈরি স্বয়ংক্রিয় রোবট। ব্রিটেনের শীর্ষস্থানীয় খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের গুদাম ব্যবস্থাপনায় এসব রোবট ব্যবহার বাড়াচ্ছে, যা দেশটির খুচরা বাণিজ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে।
চীনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর হেফেইয়ে অবস্থিত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গিক প্লাস-এর কারখানায় তৈরি হচ্ছে এসব রোবট। কারখানাটির ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারদের ভাষ্য, সেখানে তৈরি ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গুদামে পাঠানো হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় মোবাইল রোবটগুলো।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যের অন্যতম বড় খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান টেসকো, অ্যাসডা এবং নেক্সট-সহ একাধিক কোম্পানি তাদের গুদাম পরিচালনায় গিক প্লাসের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
যেভাবে কাজ করে রোবট
গুদামের মেঝেজুড়ে চলাচলকারী ছোট আকারের রূপালি রঙের এসব রোবট স্টোরেজ র্যাকের নিচে গিয়ে পুরো তাকটি তুলে নিয়ে নির্দিষ্ট কর্মীর কাছে পৌঁছে দেয়। ফলে কর্মীদের দীর্ঘ পথ হেঁটে পণ্য সংগ্রহ করতে হয় না। এতে অর্ডার প্রস্তুতের সময় কমে আসে এবং কাজের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
গিক প্লাসের দাবি, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে পণ্য সংগ্রহের গতি বাড়ানোর পাশাপাশি এমন জায়গাতেও পণ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব, যেখানে মানুষের পৌঁছানো কঠিন। একই সঙ্গে পণ্য বাছাইয়ের ভুলও কমে আসে।
প্রচলিত স্বয়ংক্রিয় গুদাম ব্যবস্থার মতো স্থায়ী কনভেয়র বেল্ট বা জটিল অবকাঠামোর প্রয়োজন হয় না। কেবল মেঝেতে বসানো কিউআর কোড চিহ্ন এবং নিরাপত্তা বেষ্টনীর সাহায্যেই এসব রোবট পরিচালনা করা যায়। ফলে তুলনামূলক কম খরচে এবং দ্রুত এই প্রযুক্তি চালু করা সম্ভব।
বিশ্বের বৃহত্তম স্বয়ংক্রিয় মোবাইল রোবট নির্মাতা
গত বছর হংকং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় 'গিক প্লাস'। এটি ছিল ২০২৫ সালের অন্যতম বড় রোবটিকস শেয়ার বিক্রির ঘটনা। বর্তমানে, প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বয়ংক্রিয় মোবাইল রোবট সরবরাহকারী হিসেবে পরিচিত।
কেন রোবট খাতে এত গুরুত্ব দিচ্ছে চীন
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঘোষিত 'নিউ কোয়ালিটি প্রোডাকটিভ ফোর্সেস' কৌশলের অন্যতম অগ্রাধিকার এখন রোবটিকস শিল্প।
দেশটির কর্মক্ষম জনসংখ্যা কমতে থাকায় উৎপাদনশীলতা ধরে রাখা এবং উৎপাদন খাতে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বজায় রাখতে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে বেইজিং।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক কাইল চ্যানের মতে, চীনের রোবটিকস খাতের উত্থান মূলত বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) শিল্পের সাফল্যের ধারাবাহিকতা। ইভির জন্য তৈরি ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক মোটর, ক্যামেরা, সেন্সর ও সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিই এখন রোবট তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে। ফলে দুটি শিল্পের মধ্যে শক্তিশালী একটি সরবরাহ ও উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
গাড়ি নির্মাতারাও ঝুঁকছে রোবটে
চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা এক্সপেং, গত বছর, তাদের মানবসদৃশ রোবট 'আয়রন' উন্মোচন করে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা হে শিয়াওপেং বলেন, তিনি আর এক্সপেংকে শুধু একটি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখেন না।
তার ভাষ্য, 'আমরা এক্সপেংকে একটি উচ্চপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চাই। ভবিষ্যতে প্রতিটি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানই গাড়ি ও রোবট: উভয় প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করবে।'
বিশ্লেষকদের মতে, বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে যেমন দ্রুত বৈশ্বিক অবস্থান তৈরি করেছে চীন, রোবটিকস শিল্পেও একই পথ অনুসরণ করার চেষ্টা করছে দেশটি। শক্তিশালী উৎপাদন সক্ষমতা, বিস্তৃত সরবরাহ ব্যবস্থা এবং দ্রুত নতুন পণ্য বাজারে আনার সক্ষমতা চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা
তবে বৈশ্বিক রোবট শিল্পে নেতৃত্ব দেওয়ার চীনের পরিকল্পনা সাম্প্রতিক সময়ে একটি বড় ধাক্কা খেয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন বিদেশে তৈরি উন্নত রোবট আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
এ পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস জানায়, বেইজিং বরাবরই বাণিজ্যকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার এবং ভিত্তিহীন অজুহাতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিরোধিতা করে এসেছে।
পরবর্তী লক্ষ্য পুরো গুদামকে স্বয়ংক্রিয় করা
গিক প্লাসের যোগাযোগ বিভাগের প্রধান ইয়ানইউ লিউ জানান, তাদের পরবর্তী লক্ষ্য শুধু পণ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরানো নয়; বরং সম্পূর্ণ গুদাম ব্যবস্থাকেই মানববিহীন বা স্বয়ংক্রিয় করে তোলা।
তার ভাষায়, ভবিষ্যতে পণ্য সংগ্রহ, স্থানান্তর এবং শেষ পর্যন্ত প্যাকেজিং; সব ধাপই স্বয়ংক্রিয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মানবসদৃশ রোবট নিয়ে এখনও প্রশ্ন
চীনের অ্যাজিবট এবং ইউনিট্রি-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মানবসদৃশ বা হিউম্যানয়েড রোবট তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, গুদাম ব্যবস্থাপনায় এসব রোবটের বাণিজ্যিক প্রয়োজনীয়তা এখনো পুরোপুরি প্রমাণিত হয়নি।
কারণ, চাকার ওপর চলা রোবট যদি কম খরচে দক্ষতার সঙ্গে পণ্য পরিবহন করতে পারে এবং রোবটিক বাহু দিয়ে অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করা যায়, তাহলে মানবসদৃশ রোবটের অতিরিক্ত সুবিধা কী হবে, সেই প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে।
তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভবিষ্যতে কারখানা, হাসপাতাল কিংবা অফিসের মতো মানুষের জন্য নির্মিত পরিবেশে কোনো পরিবর্তন ছাড়াই কাজ করতে পারবে মানবসদৃশ রোবট। যদিও বর্তমান প্রযুক্তি এখনো এমন অনেক সূক্ষ্ম ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।
পরীক্ষাগার হয়ে উঠছে যুক্তরাজ্যের গুদাম
বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর চাপ এবং শ্রমিক সংকটের কারণে যুক্তরাজ্যে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। আর সেই সুযোগে দেশটির গুদামগুলো চীনের পরবর্তী প্রজন্মের রোবট প্রযুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে।
এর মাধ্যমে বৈশ্বিক রোবটিকস শিল্পে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তি রফতানির বাজারও সম্প্রসারণ করতে চাইছে চীন।
/এআই