×
Logo

খেলাধুলা

বিশ্বকাপের নায়ক থেকে খলনায়ক: যেভাবে মিশরের কোচের পদ হারালেন হোসাম হাসান

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০২:০১ পিএম

বিশ্বকাপের নায়ক থেকে খলনায়ক: যেভাবে মিশরের কোচের পদ হারালেন হোসাম হাসান

বিশ্বকাপে মিশরের ঐতিহাসিক সাফল্যের নায়ক ছিলেন কোচ হোসাম হাসান। তার অধীনেই, প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে জয় এবং নকআউট পর্বে খেলার স্বাদ পায় মিশর। সেই সাফল্যের পর, ২০৩০ সাল পর্যন্ত, তার ওপর আস্থা রাখার ঘোষণা দিয়েছিল দেশটির ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। 

কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের মাত্র দুই মাস পার হতেই, শনিবার (৭ নভেম্বর) বরখাস্ত করা হলো এই কোচকে। বীরের মতো পারসোনা তৈরি করেও দাম্পত্য কলহসহ নানান কারণে অনেকটা খলনায়কের মতোই বিদায় নিতে হচ্ছে এই কোচকে

হোসাম হাসানকে বিদায়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলেও বরখাস্তের নির্দিষ্ট কোনো কারণ জানায়নি মিশরীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ইএফএ)। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত বিবৃতিতে জাতীয় দলের ‘ইতিবাচক ভাবমূর্তি ও স্থিতিশীলতা’র কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বকাপের পর থেকে হোসাম হাসানকে ঘিরে একের পর এক বিতর্ক ও নানা ঘটনার দিকেই ইঙ্গিত করছে সংস্থাটির এই বক্তব্য।

বিবৃতিতে বলা হয়, পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ও ঘটনাবলি পর্যালোচনার পর জাতীয় দলের ইতিবাচক ভাবমূর্তি এবং স্থিতিশীলতার ওপর সেগুলোর নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। 

চুক্তির শর্ত ও নিজেদের দায়িত্বের আওতায় অধিনায়ক হোসাম হাসান এবং তার কারিগরি ও প্রশাসনিক দলের সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বোর্ড।

তবে ঠিক কোন ঘটনাগুলোর কারণে এমন সিদ্ধান্ত, তা স্পষ্ট করেনি দেশটির ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। বিশ্বকাপের পর থেকেই ব্যক্তিগত জীবন, খেলোয়াড়দের সঙ্গে সম্পর্ক এবং শৃঙ্খলাজনিত বিভিন্ন ইস্যুতে বিতর্কের মুখে ছিলেন এই কোচ।

হোসাম হাসানকে ঘিরে বিতর্কের সূত্রপাত গত আগস্টের শেষ দিকে। সে সময় তার পারিবারিক বিরোধের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে মিশরের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। কয়েক মাস ধরে চলতে থাকে এ বিতর্ক।

এর মধ্যেই মাঠের বাইরের অস্বস্তির সঙ্গে যোগ হয় মাঠের ভেতরের পরিস্থিতি। ২০২৭ সালের আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের (আফকন) বাছাইপর্বে দলের পারফরম্যান্স ও খেলোয়াড়দের সঙ্গে কোচের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর, অ্যাঙ্গোলার বিপক্ষে মিশরের গোলশূন্য ড্রয়ের পর কোচ হোসাম হাসান ও তারকা ফুটবলার মোহাম্মদ সালাহর মধ্যে বিরোধের খবর সামনে আসে। ওই ম্যাচে, নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই, সালাহকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। পরের ম্যাচে দক্ষিণ সুদানের বিপক্ষেও তাকে বিশ্রাম দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে মিশরীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এক বিবৃতিতে জানায়, ২৯ সেপ্টেম্বরের ম্যাচে, সালাহকে, বিশ্রাম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল মাঠের কৃত্রিম ঘাসের কারণে।

তবে মিশরীয় সাংবাদিক আহমেদ আবদেল বাসেতের দাবি করেন, অ্যাঙ্গোলার বিপক্ষে ম্যাচের পর দলের ড্রেসিংরুমে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। এমনকি, সালাহ নীরবে জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিরোধের কথা স্বীকার করেনি মিশরীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন।

বিতর্কের মধ্যেই, গত অক্টোবরের শেষ দিকে, আরও একটি ধাক্কা খান হোসাম হাসান। বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার কাছে মিশরের বিদায়ের পর রেফারির ভুল সিদ্ধান্তকে দায়ী করে মন্তব্য করেছিলেন তিনি। এ ঘটনায় তাকে তিন ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেয় আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফা।

তবে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় নভেম্বরের শুরুতে। দীর্ঘদিন ধরে চলা পারিবারিক বিরোধের জেরে গত ৪ নভেম্বর তাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সংবাদমাধ্যমে কথা বলা থেকে নিষিদ্ধ করে মিশরের সুপ্রিম কাউন্সিল ফর মিডিয়া রেগুলেশন।

যদিও কী ধরনের নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে জানায়নি কাউন্সিল। এর আগে, হোসাম হাসানের সাবেক স্ত্রীকেও ব্যক্তিগত বিরোধ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে কথা বলা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তাদের পারিবারিক বিরোধ প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়।

সব মিলিয়ে, সালাহ'র সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বিতর্ক এবং সংবাদমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা: সবকিছু মিলিয়ে চাপে ছিলেন হোসাম হাসান। নভেম্বরের আন্তর্জাতিক বিরতির আগে, এসব পরিস্থিতির প্রভাব জাতীয় দলের ওপরও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত, দলের ভাবমূর্তি ও স্থিতিশীলতার বিষয়টি সামনে এনে তাকে বিদায় করার সিদ্ধান্ত নেয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন।

হোসাম হাসানের বিদায়ের ঘটনায় রয়েছে এক ধরনের পরিহাস। তার অধীনেই বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা সাফল্য পেয়েছিল মিশর। আন্তর্জাতিক ফুটবলে দলটির সেই অর্জন জাতীয় দলের ভাবমূর্তি ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। কিন্তু বিশ্বকাপের পর মাঠের বাইরের নানা বিতর্কে সেই অর্জনের ইতিবাচক প্রভাব অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়।

বিশ্বকাপের পর মিশরীয় ফুটবলপ্রেমীদের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। বিশেষ করে, ২০১০ সালের পর, প্রথমবারের মতো আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখছিল দেশটি। কিন্তু কোচের আকস্মিক বিদায়ে সেই পরিকল্পনা নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

হোসাম হাসানের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন আলি মাহের। মিশরের ঘরোয়া ফুটবল লিগে নিয়মিত কোচিং করালেও দেশটির দুই প্রধান ক্লাব আল আহলি ও জামালেকের কোনোটিরই দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা নেই তার।

নতুন কোচের সামনে তাই চ্যালেঞ্জও কম নয়। বিশ্বকাপে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দেওয়া একটি দলকে ধরে রাখা, মোহাম্মদ সালাহকে ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা কাটানো এবং ২০১০ সালের পর প্রথমবারের মতো আফকনের শিরোপা জয়ের স্বপ্ন পূরণ: সবকিছুই সামলাতে হবে তাকে।

বিশ্বকাপের সাফল্যকে মহাদেশীয় শিরোপা জয়ের অভিযানে রূপ দিতে পারবেন কি না আলি মাহের, সেটিই এখন দেখার বিষয়। আর হোসাম হাসানের বিদায় মিশরীয় ফুটবলে শেষ পর্যন্ত কীভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে নতুন কোচের সাফল্যের ওপর।

/এআই 

Logo