১৯৮৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। পর্তুগালের মাদেইরা দ্বীপপুঞ্জের ফুনশাল শহরের সাও পেদ্রো প্যারিশে জন্মগ্রহণ করেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো দোস সান্তোস আভেইরো। বাবা ছিলেন মালী, মা রাঁধুনি। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বেড়ে ওঠা সেই শিশুই একসময় হয়ে ওঠেন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা মহাতারকা।
মাত্র তিন বছর বয়সেই ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয় রোনালদোর। আট বছর বয়সে অপেশাদার ক্লাব আন্দোরিনহার হয়ে শুরু হয় তার ফুটবলজীবন। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত ক্লাবটির হয়ে খেলেন তিনি। অল্প বয়সেই তার প্রতিভার কথা ছড়িয়ে পড়ে মাদেইরা ছাড়িয়ে পুরো পর্তুগালে।
১৯৯৫ সালে মাদেইরার শীর্ষ দুই ক্লাব সিএস মারিতিমো ও সিডি নাশিওনাল তাকে দলে নিতে আগ্রহ দেখায়। তবে আন্দোরিনহার কর্মকর্তাদের সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠকে মারিতিমোর প্রতিনিধিরা উপস্থিত হতে না পারায় রোনালদোকে দলে ভেড়ানোর সুযোগ পায় নাশিওনাল। সেখানে দুই বছর খেলেন তিনি। এ সময় একটি মৌসুমে শিরোপাও জেতেন।
১৯৯৭ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে স্পোর্টিং সিপির হয়ে তিন দিনের একটি ট্রায়ালে অংশ নেন রোনালদো। তার প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে পর্তুগিজ ক্লাবটি ১ হাজার ৫০০ পাউন্ডের বিনিময়ে তাকে দলে নেয়। এরপর ফুটবলে নিজের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে মাদেইরা ছেড়ে লিসবনে পাড়ি জমান তিনি। শুরু হয় পেশাদার ফুটবলে এগিয়ে যাওয়ার নতুন অধ্যায়।
ক্লাব ক্যারিয়ার ও দলবদল
দীর্ঘ ক্লাব ক্যারিয়ারে পাঁচটি ক্লাবের হয়ে খেলেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। এর মধ্যে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে খেলেছেন দুই দফায়। পেশাদার ফুটবলে তার পথচলা শুরু নিজ দেশের ক্লাব স্পোর্টিং সিপিতে। এরপর ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি পান তিনি। তবে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সফল সময়গুলোর একটি কাটিয়েছেন স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদে। খেলেছেন ইতালির ক্লাব জুভেন্টাসেও। বর্তমানে সৌদি প্রো লিগের ক্লাব আল-নাসরের হয়ে খেলছেন এই পর্তুগিজ তারকা।
জাতীয় দলের ক্যারিয়ার
জাতীয় দলের হয়েও রোনালদোর অর্জন ঈর্ষণীয়। ২০১৬ সালে তার নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতে পর্তুগাল। পরে ২০১৯ সালে এবং ২০২৫ সালের উয়েফা নেশনস লিগও জয় করে দলটি।
জাতীয় দলের হয়ে ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করেছেন ৪১ বছর বয়সী এই ফুটবলার। আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা খেলোয়াড় হিসেবে নিজের নাম প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি।
ব্যক্তিগত অর্জন ও রেকর্ড
সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে বিবেচিত রোনালদো পাঁচবার ব্যালন ডি’অর এবং চারবার ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুট জিতেছেন। ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে তার ঝুলিতে রয়েছে ৩৪টির বেশি বড় শিরোপা। এর মধ্যে সাতটি লিগ শিরোপা, পাঁচটি উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ, একটি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও দুইটি নেশনস লিগ শিরোপা উল্লেখযোগ্য।
চ্যাম্পিয়নস লিগে সর্বোচ্চ ১৪০ গোল এবং ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে সর্বোচ্চ ১৪ গোলের রেকর্ডও তার দখলে। পেশাদার ফুটবলে ১ হাজার ২০০টির বেশি ম্যাচ খেলা অল্প কয়েকজন খেলোয়াড়ের একজন তিনি। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে তার গোলসংখ্যা ৯৮৫ ছাড়িয়েছে।
এ ছাড়া তার প্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসির সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ ৬টি বিশ্বকাপ আসরে অংশ নেওয়ার কৃতত্ব তার। একই সঙ্গে ৬টি বিশ্বকাপ আসরে গোলের অনন্য রেকর্ড রয়েছে তার।
সামগ্রিক ক্যারিয়ার পরিসংখ্যান
ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৩৪৩টির বেশি ম্যাচ খেলেছেন। গোল করেছেন ৯৮৫টির বেশি এবং সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন ২৯১টির বেশি গোল। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ৩৪টির বেশি বড় শিরোপা জিতেছেন তিনি। লিগ শিরোপা, ইউরোপের শীর্ষ ক্লাব প্রতিযোগিতা এবং জাতীয় দলের হয়ে অর্জিত সাফল্যে সমৃদ্ধ এই পর্তুগিজ মহাতারকার ক্যারিয়ার।
/এনএ