×
Logo

খেলাধুলা

চীনের সাবেক নেতা মাওকে নিয়ে রসিকতা, এমবাপ্পেকে বাদ দিচ্ছে চীনের ২ বড় প্রতিষ্ঠান

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩৫ পিএম

চীনের সাবেক নেতা মাওকে নিয়ে রসিকতা, এমবাপ্পেকে বাদ দিচ্ছে চীনের ২ বড় প্রতিষ্ঠান

ফ্রেঞ্চ ফুটবল তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ঘিরে চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা বাড়ছে। দেশটির সাবেক নেতা মাও সে তুংকে নিয়ে এমবাপ্পের কথিত মন্তব্যের জেরে ২টি চীনা ব্র্যান্ড তার সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে। বিষয়টি নিয়ে বিতর্কে যোগ দিয়েছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফরাসি টক শো ‘দ্য ব্রিজ’-এ এমবাপ্পে একটি মিমের কথা বলেন, যা তাকে সবচেয়ে বেশি হাসায়। 

তিনি বলেন, 'একটি ভিডিও আছে, যেখানে একজন লোককে দেখা যায়। আমার মনে হয়, তিনি চীনের একজন স্বৈরশাসক।'

কথা বলার সময় পর্দায় এমন একটি মিম দেখা যায়, যেখানে মাও সে তুংয়ের মতো দেখতে একটি ছবির ওপর এমবাপ্পের মুখ বসানো ছিল। 

রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ড আরও বলেন, বন্ধুদের সঙ্গে তিনি প্রায়ই মিমটি ব্যবহার করেন। তবে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া এসব ভিডিও ক্লিপের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

এমবাপ্পে সরাসরি মাও সে তুংয়ের নাম উল্লেখ করেননি। মূল ভিডিওটি এখন আর টক শোটির ইউটিউব চ্যানেলে নেই। তবে ভিডিওটির স্ক্রিনশট চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে।

এ ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, 'আমরা এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো সম্পর্কে অবগত হয়েছি। চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করে, এমন কথা বা আচরণের বিরুদ্ধে চীনা সমাজের সব মহল থেকেই স্বাভাবিকভাবে প্রতিবাদ জানানো হবে।'

এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত এমবাপ্পে কিংবা ‘দ্য ব্রিজ’ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

সাক্ষাৎকারটি ঠিক কবে প্রচারিত হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়। তবে চীনের ফুটবলবিষয়ক অনলাইন ফোরাম ‘দংছিউদি’ সোমবার রাতে বিষয়টি সামনে আনে। 

এক বিবৃতিতে এমবাপ্পের কথিত মন্তব্যকে ‘অনুপযুক্ত’ বলে উল্লেখ করে তারা জানায়, এ ধরনের মন্তব্য চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করেছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মন্তব্যগুলো চীন ও দেশটির জনগণের জন্য অবমাননাকর হওয়ায় সেগুলো অনুবাদ করা সম্ভব নয়।

এরপর দ্রুতই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়। চীনে ব্যাপক জনপ্রিয় এমবাপ্পে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে বড় অঙ্কের চুক্তির জন্যও পরিচিত। তার সমালোচকদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, তিনি চীনের বাজার থেকে বাণিজ্যিক সুবিধা নিচ্ছেন, অথচ এমন মন্তব্য করছেন, যা দেশটির জনগণকে ক্ষুব্ধ করতে পারে।

চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইবোতে একজন ব্যবহারকারী লেখেন, 'বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের পরিচিত ব্যক্তিদের আরও বেশি শ্রদ্ধাশীল ও সংবেদনশীল হওয়া উচিত। জাতীয় অনুভূতিকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।'

কে ছিলেন মাও সে তুং?

১৯৪৯ সালে চীনে কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠা করেন মাও সে তুং। এরপর কয়েক দশক ধরে দেশটি শাসন করেন তিনি। বিশেষকরে, ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে তার শাসনামলে চীন নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যায়।

দ্রুত শিল্পায়নের লক্ষ্যে মাও ‘গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ড’ নামে একটি কর্মসূচি চালু করেন। তবে এর ফলে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যাতে কয়েক কোটি মানুষের মৃত্যু হয়।

এরপর শুরু হয় ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’। কমিউনিজমের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সহিংস দমন-পীড়ন চালানো হয়। এর শিকার হন চীনা বুদ্ধিজীবী, জমির মালিক, শিল্পী এবং কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বীরাও।

১৯৭৬ সালে মাওয়ের মৃত্যুর পর চীনে নতুন যুগের সূচনা হয়। ধীরে ধীরে, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য নিজেদের দ্বার উন্মুক্ত করতে শুরু করে দেশটি। 

মাওয়ের শাসনব্যবস্থা থেকে চীন সরে এলেও দেশটির কমিউনিস্ট পার্টি তাকে জাতীয় আইকন হিসেবে সম্মান দিয়ে আসছে। তার ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা থাকলেও দলটির কাছে তাঁর উত্তরাধিকার এখনো প্রশ্নাতীত হিসেবে বিবেচিত।

চীনা ব্র্যান্ডগুলোর অবস্থান

এমবাপ্পেকে ঘিরে বিতর্কের মধ্যেই চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি লা লিগার ম্যাচ সম্প্রচার স্থগিত করছে বলে মঙ্গলবার জানিয়েছে দেশটির সংবাদমাধ্যম ‘দ্য পেপার’।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংবাদপত্র ‘গ্লোবাল টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিসিটিভির সংবাদভিত্তিক অ্যাপগুলো থেকেও ফরাসি এই ফুটবলারের সঙ্গে সম্পর্কিত কনটেন্ট সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এমবাপ্পের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের বিষয়ে চীনা ব্র্যান্ডগুলো সরাসরি বিতর্কিত ভিডিওটির কথা উল্লেখ করেনি। তবে তারা চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত লাগার বিষয়টি সামনে এনেছে।

চীনের বৃহত্তম দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মেংনিউ জানিয়েছে, চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করে, এমন যেকোনো কথা বা আচরণের তারা দৃঢ়ভাবে বিরোধিতা করে এবং এ বিষয়ে তাদের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে।

পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান দংপেংও বলেছে, জাতীয় অনুভূতিতে আঘাত করে, এমন যেকোনো আচরণের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিষ্ঠানের কঠোর অবস্থান রয়েছে।

তবে ব্র্যান্ডগুলো বিতর্কিত ভিডিওটির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ না করায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু ব্যবহারকারী প্রশ্ন তুলেছেন, এমবাপ্পে ঠিক কী বলেছেন বা করেছেন, যা এতটা আপত্তিকর বলে বিবেচিত হচ্ছে।

২০২৪ সালের আগস্টে রিয়াল মাদ্রিদে অভিষেক হয় এমবাপ্পের। ফুটবলবিশ্বে ক্লাব ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কর্মকাণ্ডে তার প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রণের কারণে তাকে কখনো কখনো ‘স্বৈরশাসক’ বলে ব্যঙ্গ করা হয়। এ উপাধিকে কেন্দ্র করে অনলাইনে তাকে নিয়ে তৈরি হয়েছে অসংখ্য মিম।

২০২৪ সালে, একটি স্যান্ডউইচের বিবরণে নিজের নাম ব্যবহারের ঘটনায় ফ্রান্সের এক ইনফ্লুয়েন্সার ও কাবাবের দোকানের মালিকের বিরুদ্ধে মামলাও করেছিলেন এমবাপ্পে। কেউ কেউ মনে করেন, ওই ঘটনাও তাঁকে ঘিরে ‘স্বৈরশাসক’ তকমার প্রচলনকে আরও জোরালো করেছে।

২০২৬ বিশ্বকাপ চলাকালে, ফ্রান্স জাতীয় দলের সতীর্থ উসমান দেম্বেলেও এই প্রবণতায় যোগ দেন। তিনি এমবাপ্পেকে ‘মোবুত’ বলে উল্লেখ করেন। নামটি এসেছে জাইরে, বর্তমান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো, দেশের তিন দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা স্বৈরশাসক মোবুতু সেসে সেকোর নাম থেকে।

গত সেপ্টেম্বরে, ‘ফ্রান্স ফুটবল’ সাময়িকীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমবাপ্পে স্বীকার করেন, এসব মিমের অনেকগুলোর পেছনেই রয়েছে নিছক হাস্যরস। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এগুলো কখনো কখনো মানুষের রাজনৈতিক ও মানবিক সচেতনতার অভাবও প্রকাশ করে।

এমবাপ্পে বলেন, 'এর একটি দিক আছে, যা আর ততটা মজার থাকে না। কারণ, ইতিহাসে এ ধরনের মানুষ কী ভয়াবহ ক্ষতি করেছেন, তা আমরা জানি।'

তিনি আরও বলেন, 'যারা অন্য মানুষকে হত্যা করেছে কিংবা কোটি কোটি মানুষকে দুর্ভোগে ফেলেছে, তাদের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে আমাকে। আমার জীবনে আমি এমন কিছু করেছি বলে মনে করি না।' 

/এআই 

Logo