এল ক্লাসিকোয় ইয়ামাল-এমবাপ্পে দ্বৈরথ, ১৩ বছর পর ফিরছেন মরিনহো
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৮ এএম
স্প্যানিশ ফুটবলের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ দ্বৈরথ এল ক্লাসিকোয় আবারও মুখোমুখি হচ্ছে বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদ। তারকাখচিত দুই দলের লড়াইয়ে এবার বিশেষ আকর্ষণ লামিন ইয়ামাল ও কিলিয়ান এমবাপ্পের মুখোমুখি হওয়া। একই সঙ্গে দীর্ঘ ১৩ বছর পর লা লিগার এই মহারণে ফিরছেন রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হোসে মরিনহো। বার্সেলোনার বিপক্ষে তার প্রত্যাবর্তন ঘিরে পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন উত্তেজনা।
ক্যাম্প ন্যু'তে মরিনহোর প্রথম এল ক্লাসিকোর স্মৃতি এখনো ভুলতে পারেননি সমর্থকেরা। ২০১০ সালের নভেম্বরের সেই ম্যাচে পেপ গার্দিওলার বার্সেলোনা ৫-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল মরিনহোর রিয়াল মাদ্রিদকে। বার্সার সমর্থকদের জন্য যা মধুরস্মৃতি রিয়ালের জন্য তা বেদনার। এছাড়া মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি দুই দলের খেলোয়াড় ও কোচদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় এবং সংঘাতের কারণে ম্যাচটি দীর্ঘদিন ধরে স্প্যানিশ ফুটবলের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা হয়ে আছে।
এবার সেই মরিনহোকেই আবারও স্বাগত জানাতে প্রস্তুত বার্সেলোনা— শহর ও ক্লাব, দুই অর্থেই। তবে প্রতিপক্ষের ডাগআউটে তার উপস্থিতি কাতালান সমর্থকদের কাছে পুরোনো স্মৃতি ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি বাড়িয়ে দিচ্ছে ম্যাচের উত্তাপ।
পয়েন্ট, মর্যাদা আর শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই
রোববারের ম্যাচে, ১৩ বছর পর এল ক্লাসিকোয় ফিরছেন মরিনহো। তার সামনে এবার এমন এক বার্সেলোনা, যারা লিগে শুরু থেকেই দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছে। দুই দলের লড়াইয়ে বাড়তি নজর থাকবে ইয়ামাল ও এমবাপ্পের ওপর। ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে দুজনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ম্যাচটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
ব্যালন ডি’অর ঘোষণার আগের দিন মাঠে নামবেন এই দুই তারকা। ফলে ক্লাবের পয়েন্টের লড়াইয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের আলোচনাও থাকবে ম্যাচজুড়ে।
লা লিগায়, এখন পর্যন্ত নিজেদের নয়টি ম্যাচের সবকটিতেই জিতেছে বার্সেলোনা। এসব ম্যাচে ৩৯ গোল করে পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে রয়েছে তারা। দ্বিতীয় স্থানে থাকা রিয়াল মাদ্রিদের চেয়ে ছয় পয়েন্টে এগিয়ে কাতালানরা।
এই ম্যাচে জিতলে ব্যবধান বেড়ে দাঁড়াবে নয় পয়েন্টে। অন্যদিকে, রিয়াল জিতলে ব্যবধান কমে হবে মাত্র তিন পয়েন্ট। তাতে শিরোপার লড়াইয়ে নতুন করে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে মরিনহোর শিষ্যরা।
বুধবার চ্যাম্পিয়নস লিগে আরবি লাইপজিগকে হারানোর পর ম্যাচটির গুরুত্ব স্বীকার করেছেন মরিনিও। স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যম মুভিস্টারকে তিনি বলেন, এটি লিগের আরেকটি ম্যাচ হলেও অন্য ম্যাচগুলোর মতো নয়।
বর্তমানে, লা লিগার পয়েন্ট তালিকায় অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের পেছনে তৃতীয় স্থানে রয়েছে রিয়াল। সর্বশেষ সাতটি এল ক্লাসিকোর মধ্যে ছয়টিতেই হেরেছে তারা। শিরোপার লড়াই আরও জমে ওঠার আগেই এই হতাশাজনক ধারায় ছেদ টানতে চাইবেন মরিনহো।
দুই দলেরই শক্তি আছে, দুশ্চিন্তাও কম নয়
বার্সেলোনার কোচ হান্সি ফ্লিকের অধীনে এল ক্লাসিকোতে দলটি বেশ ভালো পারফরম্যান্স করে আসছে। তবে মৌসুমের শুরুতে অপরাজিত থাকার ধারায় ছেদ পড়েছে তাদের। মঙ্গলবার প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ের (পিএসজি) কাছে ৪-২ গোলে হেরে চলতি মৌসুমে প্রথম পরাজয়ের স্বাদ পায় বার্সেলোনা।
এর আগে গেতাফে, গালাতাসারাই ও রিয়াল বেতিসের বিপক্ষে গোলের পর গোল করেছে দলটি। কিন্তু প্যারিসে রক্ষণভাগের অনুপস্থিতি এবং পিএসজিক থেকে পাওয়া ফাঁকা জায়গাগুলো কাজে লাগানোর সুযোগ নষ্ট করা ম্যাচটিকে কঠিন করে তোলে।
চোটের কারণে বার্সেলোনার রক্ষণভাগের দুই গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় এরিক গার্সিয়া ও জুলস কুন্দে ছিলেন না। ফলে পাউ কুবারসি ও জেরার্ড মার্টিনের দুই পাশে ফুলব্যাক হিসেবে খেলানোর বিকল্প নিয়ে ভাবতে হয় ফ্লিককে। শুক্রবারও অনুশীলনে ছিলেন না কুন্দে। এর সঙ্গে মিডফিল্ডার দানি ওলমোর অ্যাডাক্টর পেশির চোট কোচের বিকল্প আরও কমিয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় তুলনামূলক স্বস্তিতে রয়েছে রিয়াল। বুধবার লাইপজিগকে ৪-১ গোলে হারিয়েছে তারা। গোল করেন বের্নার্দো সিলভা, আরদা গুলের, এমবাপ্পে ও ইয়ান দিয়োমান্দে। চ্যাম্পিয়নস লিগে তিন ম্যাচের তিনটিতেই জয় পেয়েছে দলটি। তবে ঘরোয়া লিগে সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন হয়েছে।
বাম প্রান্তে ইয়ান দিয়োমান্দে বিকল্প হতে পারেন। পাশাপাশি, আরদা গুলেরের পাস দেওয়ার দক্ষতা এবং জুড বেলিংহামের গতিশীলতা এমবাপ্পেকে গোলের সুযোগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রিয়ালের সামনে প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে বার্সেলোনার প্রেসিং ভেঙে বল নিয়ে সামনে এগোনো। প্রতিপক্ষের প্রথম চাপ কাটিয়ে এমন খেলোয়াড়ের কাছে বল পৌঁছাতে হবে, যিনি সামনে তাকিয়ে পাস দিতে পারবেন। তাহলেই ফ্লিকের রক্ষণভাগের পেছনের ফাঁকা জায়গায় দৌড়ানোর সুযোগ পাবেন এমবাপ্পে।
বার্সেলোনার জন্যও প্রতিপক্ষের সেই পাসদাতার ওপর চাপ ধরে রাখা জরুরি। রক্ষণভাগ খুব বেশি পেছনে সরে গেলে দলটির খেলোয়াড়দের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যেতে পারে। এতে বল পুনরুদ্ধার করে দ্রুত আক্রমণে যাওয়ার পরিচিত কৌশল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রিয়ালের রাইটব্যাক হিসেবে ফেদেরিকো ভালভার্দের সাম্প্রতিক ব্যবহার দলটির আক্রমণে নতুন পথ খুলে দিয়েছে। তার ওভারল্যাপিং দৌড়ের সঙ্গে ভেতরে ঢুকে খেলা সতীর্থদের সমন্বয় বার্সেলোনার রক্ষণে চাপ তৈরি করতে পারে। তবে তাকে ওই জায়গায় খেলানো হবে কি না, তা নির্ধারণ করবে মাঝমাঠে সৃজনশীলতা ও রক্ষণাত্মক ভারসাম্যের সমীকরণ।
ইয়ামাল বনাম এমবাপ্পে: কে কতটা প্রভাব ফেলবেন?
ইয়ামালকে আটকাতে কতটা বাড়তি মনোযোগ দেওয়া হবে, সেটিও রিয়ালের জন্য বড় প্রশ্ন। বার্সেলোনার ডান প্রান্তে তার ড্রিবলিং প্রতিপক্ষকে দ্বিতীয় একজন রক্ষণভাগের খেলোয়াড় এগিয়ে আনতে বাধ্য করতে পারে। কিন্তু এতে অন্য জায়গায় ফাঁকা তৈরি হবে, যা কাজে লাগাতে পারেন পেদ্রি।
অন্যদিকে, রাফিনিয়ার গতিশীল অবস্থান ও বল ছাড়া দৌড় প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ব্যস্ত রাখবে। লিগে তার ১২ গোলই বলে দিচ্ছে, বার্সেলোনার আক্রমণ কেবল ইয়ামালনির্ভর নয়।
ইয়ামালকে তার মার্কারকে কাটিয়ে ওঠা থেকে আটকানোই যথেষ্ট হবে না। তাকে সহায়তা করতে গিয়ে রিয়ালের রক্ষণে অন্য কোনো খেলোয়াড়কে ফাঁকা ছেড়ে দিলে বিপদ বাড়তে পারে।
ম্যাচ ঘিরে, আলোচনার কেন্দ্রে থাকলেও ইয়ামাল ও এমবাপ্পে সরাসরি খুব বেশি মুখোমুখি হবেন না। বরং প্রতিপক্ষের জন্য তারা কী ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারেন, সেটিই হবে তাদের প্রভাবের বড় মাপকাঠি।
লা লিগায়, নয়টি ম্যাচে ইয়ামালের গোল আটটি, সঙ্গে রয়েছে ছয়টি অ্যাসিস্ট। একই সংখ্যক ম্যাচে এমবাপ্পের গোল নয়টি, অ্যাসিস্ট দুটি। ইয়ামাল প্রতিপক্ষের রক্ষণকে বলের দিকে টেনে সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করতে পারেন। অন্যদিকে, এমবাপ্পের গতি প্রতিপক্ষের রক্ষণকে পেছনে সরে যেতে বাধ্য করতে পারে।
আসন্ন ব্যালন ডি’অর মনোনীতদের তালিকায় রয়েছেন দুজনই। যদিও এবারের পুরস্কারের মূল্যায়নকাল শেষ হওয়ার পর অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই ম্যাচ, তবু ফুটবল বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কারের মঞ্চের আগে নিজেদের সামর্থ্য দেখানোর বড় সুযোগ পাচ্ছেন তারা।
এল ক্লাসিকোর ফলেই বদলাতে পারে শিরোপার সমীকরণ
ব্যালন ডি’অর ঘোষণার আগে ইয়ামালের সামনে বার্সেলোনার সুন্দর লিগ-শুরুর ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এবং রিয়ালের হতাশা আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, এমবাপ্পের জন্য এটি শুধু ব্যক্তিগত নৈপুণ্য দেখানোর ম্যাচ নয়; বরং প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে রিয়ালকে আবারও শিরোপার লড়াইয়ে ফেরানোরও সুযোগ।
মরিনহোর প্রত্যাবর্তন, দুই দলের সাম্প্রতিক ফর্ম, চোট ও নিষেধাজ্ঞার প্রভাব— সব মিলিয়ে রোববারের এল ক্লাসিকোতে উত্তেজনার কমতি নেই। পয়েন্ট তালিকার ব্যবধান আরও বাড়বে, নাকি কমে জমে উঠবে শিরোপার লড়াই— সেই উত্তর মিলবে মাঠের লড়াইয়েই।
/এনএ