চ্যাম্পিয়ন্স লিগে গোলের নতুন রেকর্ড, এখন পর্যন্ত গোল ১৮৭টি, প্রতি ম্যাচে গড় ৪.১৬
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১৬ এএম
নতুন ফরম্যাট চালুর পর থেকেই উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে পরিবর্তন এসেছে প্রতিযোগিতার ধরনে। ২০২৪-২৫ মৌসুম থেকে কার্যকর হওয়া লিগ পর্বের নতুন কাঠামো ইউরোপের শীর্ষ ক্লাব প্রতিযোগিতাকে যেমন নতুন মাত্রা দিয়েছে, তেমনি বেড়েছে গোলের সংখ্যা।
চলতি মৌসুমে সেই প্রবণতা পৌঁছেছে নতুন উচ্চতায়। একের পর এক ম্যাচে গোলবন্যায় রেকর্ড গড়ছে ইউরোপীয় ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই আসর।
এখন পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন্স লিগে গোল হয়েছে ১৮৭টি। প্রতি ম্যাচে গোলের গড় ৪ দশমিক ১৬, যা প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। গত দুই মৌসুমেও গোলের সংখ্যা বাড়ার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। তবে চলতি মৌসুমে সেই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও ইংল্যান্ডের সাবেক উইঙ্গার অ্যাশলি ইয়ং বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভকে বলেন, ‘কত গোল হয়েছে, একবার দেখুন! এটা অসাধারণ। আক্রমণভাগের খেলোয়াড়েরা সুযোগ কাজে লাগাতে দারুণ দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন।’
লিভারপুলের সাবেক ডিফেন্ডার স্টিফেন ওয়ার্নকও গোলের এই বিপুল সংখ্যাকে ‘অবিশ্বাস্য’ বলে বর্ণনা করেছেন। তবে প্রশ্ন উঠছে, চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে গোলের এমন প্রবাহ কতটা ব্যতিক্রমী?
পরিসংখ্যান বলছে, এবারের আসরে গোলের হার কেবল বর্তমান চ্যাম্পিয়ন্স লিগের রেকর্ডই ভাঙেনি, ইউরোপিয়ান কাপের দীর্ঘ ইতিহাসেও জায়গা করে নিয়েছে শীর্ষ পর্যায়ে।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে এবার প্রতি ম্যাচে গোলের গড় সর্বোচ্চ। ইউরোপিয়ান কাপের সামগ্রিক ইতিহাসে এটি তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলের হার। এর চেয়ে বেশি গোলের গড় দেখা গিয়েছিল ১৯৫৯-৬০ মৌসুমে, প্রতি ম্যাচে ৪ দশমিক ১৯টি এবং ১৯৫৫-৫৬ মৌসুমে, প্রতি ম্যাচে ৪ দশমিক ৩৮টি।
চলতি আসরে, গোলের ধারাবাহিকতা কতটা বিস্ময়কর, তা বোঝা যায় গত সপ্তাহের ম্যাচগুলোর দিকে তাকালেই। মঙ্গলবার নয়টি ম্যাচে মোট ৪০টি গোল হয়। তবে এর আগের বুধবারের গোলসংখ্যা ছিল আরও বেশি, মোট ৪৬টি। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে এক দিনে গোলের হিসাবে এটি তৃতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ড।
এর চেয়ে বেশি গোল হয়েছিল কেবল ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ মৌসুমের লিগ পর্বের শেষ ম্যাচদিনে। ওই দুই দিনেই একসঙ্গে ১৮টি করে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
গত সপ্তাহের মঙ্গলবার ও বুধবার মিলিয়ে গোল হয় ৭৮টি। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে এটিই সর্বোচ্চ গোলের ম্যাচদিন হিসেবে রেকর্ড গড়ে। এর আগে, চলতি মৌসুমের, প্রথম ম্যাচ ডে'তে গোল হয়েছিল ৬৯টি। নতুন লিগ পর্ব চালুর পর সেটিই ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলের ম্যাচদিন।
এবার সেই রেকর্ডও পেছনে পড়েছে। চলতি সপ্তাহে, আবারও গোলের নতুন রেকর্ড গড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে সেই লক্ষ্যের অর্ধেক পথ পেরিয়ে গেছে প্রতিযোগিতাটি।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফরম্যাট পরিবর্তনের পরিকল্পনা উয়েফা ঘোষণা করেছিল ২০২১ সালে। তখন থেকেই নতুন কাঠামো প্রতিযোগিতার ম্যাচগুলোর ধরন ও মানের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ২০২৪-২৫ মৌসুমে পরিবর্তন কার্যকর হওয়ার পর সেই বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।
১৯৫৫-৫৬ মৌসুমে, ছয়টি দল নিয়ে, আমন্ত্রণমূলক প্রতিযোগিতা হিসেবে যাত্রা শুরু হয় ইউরোপিয়ান কাপের। ১৯৬৭ সালে, এটি ৩২ দলের নকআউট প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়। এরপর ১৯৯২ সালে, চ্যাম্পিয়ন্স লিগের যাত্রা শুরু হয় বর্তমান পরিচয়ে। নতুন কাঠামোয় যুক্ত হয় গ্রুপ পর্ব, যার পর শেষ ১৬ থেকে শুরু হতো নকআউট লড়াই।
একপর্যায়ে প্রতিযোগিতায় দুটি গ্রুপ পর্বও চালু করা হয়েছিল। তবে ২০০৩-০৪ মৌসুমে আবারও একক গ্রুপ পর্বের কাঠামোয় ফিরে যায় চ্যাম্পিয়ন্স লিগ।
পরবর্তী সময়ে গ্রুপ পর্বে ৩২টি দলকে আটটি গ্রুপে ভাগ করা হতো। প্রতিটি গ্রুপে থাকত চারটি দল। গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল সরাসরি শেষ ষোলোতে জায়গা পেত।
কিন্তু ২০২৪-২৫ মৌসুম থেকে সেই কাঠামো বদলে যায়। ৩২ দলের পরিবর্তে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পায় ৩৬টি দল। আটটি আলাদা ম্যাচে আট প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হওয়ার নতুন নিয়ম চালু হয়, যেখানে আগের ফরম্যাটে প্রতিটি দল তিন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে হোম ও অ্যাওয়ে মিলিয়ে ছয়টি ম্যাচ খেলত।
নতুন নিয়মে, লিগ পর্ব শেষে, পয়েন্ট তালিকার শীর্ষ আট দল সরাসরি নকআউট পর্বে ওঠে। নবম থেকে ২৪তম স্থানে থাকা দলগুলোকে দুই লেগের প্লে-অফ খেলতে হয়। আর তালিকার শেষ আট দল প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে যায়।
অর্থাৎ, লিগ পর্বে আটটি ম্যাচ খেলার পরও ৩৬ দলের মধ্যে ২৪টি দলের সামনে পরবর্তী পর্বে যাওয়ার সুযোগ থাকে। সমালোচকদের মতে, এই কাঠামোয় শুরুতেই বাদ পড়ার ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকায় দলগুলো আরও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে উৎসাহিত হয়। কারণ, একটি ম্যাচে হারলেও পরের ম্যাচগুলোতে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকে।
তবে বেশি গোল মানেই কি ফুটবলের মান বেড়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে সংশয় রয়েছে বিশ্লেষকদের একাংশের মধ্যে।
দ্য টাইমসের ফুটবল লেখক টম আর্নট বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভকে বলেন, ‘আমার মনে হয়, বিনোদনের মাত্রা বেড়েছে। তবে খেলার মান বেড়েছে কি না, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই।’
নতুন ফরম্যাটে ম্যাচগুলো দেখতে দারুণ উপভোগ্য ও রোমাঞ্চকর হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন তিনি। তবে এসব ম্যাচের ফলাফল ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রকৃত গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এই ফুটবল লেখক।
আর্নটের ভাষায়, ‘ম্যাচগুলো দেখার সময় দারুণ লাগে, রোমাঞ্চ তৈরি হয়, কারণ মাঠের ফুটবলও অসাধারণ। কিন্তু এসব ম্যাচের ফলাফলের প্রকৃত অর্থ কী?’
তিনি বলেন, নতুন ফরম্যাট দলগুলোকে তুলনামূলক নির্ভার হয়ে খেলতে সহায়তা করছে।
আর্নট বলেন, ‘বিনোদনের দিকটি অবশ্যই আছে। তবে কখনো কখনো এসব ম্যাচ দেখার পরও মনে হয়, শেষ পর্যন্ত এর প্রকৃত গুরুত্ব কী? প্রতিযোগিতার শুরুর দিকে বাদ পড়ার ঝুঁকি কম থাকায় যে নির্ভার পরিবেশ তৈরি হয়েছে, সেটিই দর্শকদের জন্য বেশি বিনোদন এনে দিচ্ছে।’
চলতি মৌসুমের গোলের পরিসংখ্যান বলছে, নতুন ফরম্যাটে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচগুলো আরও আক্রমণাত্মক ও দর্শকনন্দিত হয়ে উঠেছে। একের পর এক রেকর্ড ভাঙছে গোলের সংখ্যা। তবে গোলের এই উৎসব প্রতিযোগিতার সামগ্রিক মান বাড়িয়েছে কি না, আর ম্যাচের ফলাফলের গুরুত্ব কতটা অক্ষুণ্ণ রয়েছে, সেই বিতর্কও চলমান।
একদিকে দর্শকদের জন্য বাড়ছে রোমাঞ্চ, অন্যদিকে প্রতিযোগিতার উত্তেজনা ও ফলাফলের গুরুত্ব নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নতুন কাঠামো শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় ফুটবলে কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে, তা বোঝার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছু সময়।
/এআই