লিওনেল মেসি
আকাশি-সাদায় সবুজ গালিচার সেই জাদুকরের রঙিন প্রস্থান
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৯ পিএম
রোমান মেহেদী⚫
মনুমেন্তালে মেসির শেষ ম্যাচে যখন রেফারি অন্তিম মুহূর্তের বাঁশি বাজালেন, তখন এই গোলাকার পৃথিবী নামক গ্রহের কোথাও ঊষা আবার কোথাও গোধূলি। কোথাও উত্তপ্ত দুপুর আবার কোথাও নিস্তব্ধ মাঝরাত। সর্ব উত্তরের স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে হয়ত দিন-রাতে সূর্যের দৈর্ঘ্যও গত কয়েকদিন ধরে সেখানকার অধিবাসীদের হিসাবে নেই। তবে অন্তর্জালের এই দুনিয়ায় এতক্ষণ সবার চোখ বুয়েনস আইরেসে। লিওনেল মেসিকে শেষবার আরও অন্তত ১০০ মিনিট আকাশি-সাদা জার্সিতে দেখার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি ডাবলিন থেকে ওয়েলিংটন, কিংবা জোহানেসবার্গ-টোকিওতে থাকা ফুটবল ভক্তরা।
মেসি একবার এসেছিলেন বাংলাদেশেও। ১৫ বছর আগে মেসিকে সরাসরি দেখতে কী উচ্ছ্বাসই না ছিল এদেশের মানুষের। তার জাদুকরী পারফরম্যান্সের জন্য তাকে স্বাভাবিক মানুষ নয়, বরং আমাদের দৃশ্যমান ত্রিমাত্রিক জগতেই থাকা ভিন্ন ডায়মেনশনের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কাল্পনিক প্রাণীর সঙ্গেও অনেকে মিলিয়ে ফেলতে চান। তবে মেসি তো মানুষ, আমাদের মতোই রক্ত-মাংসের মানুষ। তবে তাকে অতিমানব বলাই শ্রেয়।
মেসির কান্না কিংবা হাসি, তার পরাজয় কিংবা বিশ্বজয়— সবই তো আমরা দেখেছি। ড্রেসিংরুমের সতীর্থদের সঙ্গে মেসি, বাহুতে আর্মব্যান্ড জড়ানো অধিনায়ক মেসি, মারাকানায় অশ্রুসিক্ত হওয়া কিংবা লুসাইলের গৌরবাজ্জ্বল কীর্তিগাঁথা; মেসির আত্মজীবনী চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গেলে তার ভূমিকায় পর্দায় আবির্ভূত হওয়া সেই ব্যক্তিকে কতটা ভার্সেটাইল হতে হবে ভেবেছেন? মেসির সবগুলো ভার্সন কি তিনি ঠিকঠাক ফুটিয়ে তুলতে পারবেন?
এইতো মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ইতি টেনেছেন লিও। দেশের মাটিতে গ্যালারি ভর্তি হাজার হাজার দর্শকের করতালিতে মুগ্ধ হয়েছেন বটে, তবে আকাশি-সাদা জার্সিকে বিদায় জানানো মেসির মনের গহীনে কোথাও যেন উঁকি দিয়েছে সতীর্থ-ড্রেসিংরুম আর দেশের প্রতিনিধিত্ব শেষ হওয়ার মন খারাপের উপলক্ষ।
বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচে জাতীয় সঙ্গীত গাইতে গিয়েও সেই মানসিক রেশের প্রতিফলন দেখেছে সারা বিশ্ব। মেসি আছেন, মেসি নেই— এই মন খারাপই যেন তাড়া করে বেড়াচ্ছে ভক্তদের পাশাপাশি খোদ মেসিকেও। ক্লাব ফুটবলে মায়ামির জার্সিতে তো এখনও বেশ ক'দিন খেলবেন তিনি।
দুই শতাধিক ম্যাচ, ১২৬ গোল, অসংখ্য অ্যাসিস্ট। দেশের হয়ে ফিফা বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা কিংবা দুই মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই ফিনালিসিমা জয়; জাতীয় দলের হয়ে মেসির এসব অর্জন তো রয়েছেই। আকাশি-সাদা জার্সিতে দেশের হয়ে বয়সভিত্তিক দলেও ফুল ফুটিয়েছেন লিও।
অলিম্পিক স্বর্ণ কিংবা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপও তো জিতেছেন। ছোট মেসি, প্রাইম মেসি কিংবা পরিণত মেসি— লিও যেন ফুটবলের এক স্বয়ংসম্পূর্ণ পুস্তকও বটে।
আজ থেকে ৪ দশক আগে দক্ষিণ আমেরিকান দেশটিকে ম্যারাডোনা মাত্রই বিশ্বসেরা করেছেন। তার পরের বছরই পৃথিবীতে আগমন লিওর। ডিয়োগোকে ছাপিয়ে গেছেন কি না, এই বিতর্ক অনেক পুরোনো। তবে আর্জেন্টিনা কিংবা বিশ্ব ফুটবলের সার্বিক ইতিহাস লেখা হলে সেই বইয়ের প্রথম দিকের অধ্যায়েই জায়গা পাবেন লিও।
তাকে একবার ফিরতে হয়েছিল। আজ থেকে ১০ বছর আগের সেই ফেরার গল্প ফুটবল ভক্তদের মনে আছে নিশ্চয়ই। বিশ্বকাপ ও টানা দুই কোপা ফাইনালের ব্যর্থতা মেসিকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছিল। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আর খেলবেন না দেশের হয়ে। কিন্তু ভূমিপুত্রকে ছাড়া সাম্রাজ্যের সম্পূরক গল্প লেখা হবে না, বিধাতা হয়ত এভাবেই সাজিয়েছিলেন চিত্রনাট্য।
যেসব ফাইনাল হেরে তিনি অশ্রুসিক্ত হয়েছিলেন, ঠিক সেসবের সবই জিতেছেন পরে। মানুষকে হয়ত তার নির্ধারিত সময়ের আগে সৃষ্টিকর্তাও কিছু জিনিস থেকে বঞ্চিত করে রাখেন। যখন দেন, তখন দু'হাত উজাড় করেই দেন। মেসি এমনই এক উদাহরণ।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এক সময় এত বড় ছিল যে, সেখানে সূর্য অস্ত যেত না। মেসির ফুটবলীয় সাম্রাজ্য তার চেয়েও বড়।
মনুমেন্তালে মেসির বিদায়ী ম্যাচে সরাসরি গ্যালারিতে উপস্থিত না থাকতে পারা প্রতিটি ফুটবল ভক্ত দূর থেকেই বলেছেন, 'ধন্যবাদ লিও; ভালো থাকবেন আকাশি-সাদাতে সবুজ গালিচা মাতানো দ্য লিওনেল আন্দ্রেস মেসি...'