বিদায়ের রাতে মেসির কণ্ঠে আবেগ
‘আর্জেন্টিনার হয়ে খেলার চেয়ে সুন্দর পৃথিবীতে আর কিছু হতে পারে না’
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০২:২৫ পিএম
আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচ। মাঠজুড়ে তখন হাজারও মানুষের আবেগ। ম্যাচ শেষ হতেই মাইক্রোফোন হাতে নিলেন লিওনেল মেসি। চোখেমুখে স্পষ্ট আবেগ। কণ্ঠেও ভারী অনুভূতি। যেন দীর্ঘ এক অধ্যায়ের শেষ পাতাটি নিজ হাতেই লিখছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয় দিয়ে জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ করার পর সমর্থকদের উদ্দেশে আবেগঘন বক্তব্য দেন মেসি। শুরুতেই তিনি বলেন, এমন দিনে কী বলবেন, সেটাই যেন বুঝে উঠতে পারছেন না।
‘আজ কিছু বলা কঠিন। অনেক আবেগ, অনেক কিছু একসঙ্গে মনে পড়ছে। প্রথমেই আমার বাবার কথা মনে হচ্ছে। বিদায়বার্তায়ও যা বলেছি, আজও তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানানো ছাড়া আর কিছু বলার নেই।’
আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে দুই দশকেরও বেশি সময় কাটানোকে নিজের জন্য বিশাল গর্বের বলে উল্লেখ করেন মেসি। কঠিন সময়েও কখনও লড়াই থেকে সরে যাননি বলেও জানান।
মেসি বলেন, ‘২০ বছরেরও বেশি সময় এই জার্সি পরতে পারা আমার জন্য অনেক বড় গর্বের। আমরা সবচেয়ে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়েও গিয়েছি। কিন্তু আমি কখনও লড়াই থামাইনি। কখনও সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা বন্ধ করিনি।’
এরপরই আসে সবচেয়ে আবেগঘন কথাটি। জাতীয় দলের হয়ে আর মাঠে নামতে না পারার কষ্টের কথা বলতে গিয়ে মেসি বলেন, ‘আর না আসাটা অনেক বড় কষ্টের হবে। সত্যি বলছি, আমি সারাজীবন এখানে আসতে চাইতাম। কারণ আর্জেন্টিনার হয়ে খেলার চেয়ে সুন্দর পৃথিবীতে আর কিছু হতে পারে না।’
জাতীয় দলের সঙ্গে থাকতে চাইলেও এখন বিদায়ের সময় এসেছে, এটা মেনে নিয়েছেন মেসি। শেষ বিশ্বকাপের স্মৃতিও উঠে আসে তার কথায়। বিশ্বকাপের স্বপ্ন পূরণের খুব কাছাকাছি গিয়েও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি বলে জানান তিনি।
‘আমি সারাজীবন এখানে থাকতে চাই। কিন্তু আমি অনুভব করছি, এখনই সময়। শেষ বিশ্বকাপে আমাদের অনেক কিছু দেওয়ার ছিল। আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম। খুব কাছাকাছিও গিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা হয়নি।’
সতীর্থদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান মেসি। তার ভাষায়, এই দলই ছোটবেলার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা ও ফিনালিসিমা জয়ের স্বপ্ন পূর্ণ করতে সাহায্য করেছে।
‘এই দলের সবাইকে ধন্যবাদ। তারা আমার ছোটবেলার স্বপ্ন পূরণ করতে সাহায্য করেছে। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া, আমেরিকান চ্যাম্পিয়ন হওয়া, ফিনালিসিমা জেতা। মাঠে ও মাঠের বাইরে তাদের সঙ্গে সময় কাটানো ছিল বিশাল গর্বের-আনন্দের।’
সতীর্থদের ‘যোদ্ধা’ হিসেবেও উল্লেখ করেন মেসি। বলেন, পাশে এমন খেলোয়াড়রা থাকলে যেকোনো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়াই করার আত্মবিশ্বাস পাওয়া যায়।
সমর্থকদের প্রতিও ছিল বিশেষ কৃতজ্ঞতা। আর্জেন্টিনার জার্সিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে যে ভালোবাসা পেয়েছেন, সেটি কখনো ভুলবেন না বলে জানান তিনি।
‘আমি পুরো দেশজুড়ে খেলার সুযোগ পেয়েছি। সব জায়গায় অসাধারণ ভালোবাসা পেয়েছি। এর জন্য আমি কৃতজ্ঞ। বিশ্বকাপ হোক কিংবা কোপা আমেরিকা, সবসময় স্টেডিয়াম পূর্ণ ছিল। সবাই অনেক কষ্ট করে আমাদের পাশে থেকেছেন। আমরা সব জায়গাতেই নিজেদের ঘরের মাঠ মনে করেছি।’
মেসির কাছে সবচেয়ে সুখের স্মৃতিগুলোর একটি ছিল বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্টিনায় ফিরে প্রথম ম্যাচ খেলা। সেই দিনের কথা মনে করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
‘বিশ্বকাপ জয়ের পর আবার যখন খেলতে নেমেছিলাম, এই জায়গাতেই আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আনন্দের দিনগুলোর একটি কাটিয়েছি। সেই দিনটি আমি কখনও ভুলব না। আজও ভিডিও দেখলে আবেগাপ্লুত হয়ে যাই। আমার, আমার পরিবারের এবং সবার জীবনে সেই দিনটি ইতিহাস হয়ে থাকবে।’
কিন্তু সেই আনন্দের জায়গাতেই এবার তাকে বলতে হচ্ছে বিদায়ের কথা।
মেসির ভাষায়, ‘আজ আবার এখানে দাঁড়িয়ে সম্ভবত আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে দুঃখের দিনটি কাটাচ্ছি। কারণ আজই আমি জাতীয় দল এবং আপনাদের বিদায় বলছি।’
তবে এখানেই শেষ নয়। জাতীয় দলের রঙের জার্সি আর গায়ে না তুললেও দলের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
‘জাতীয় দলের রঙ ধারণ করে খেলাটা আমি ভীষণ মিস করব। তবে এখন থেকে আমি আপনাদের সঙ্গে ওই পাশেই থাকব। এই ছেলেদের এবং যারা আসবে, তাদের সমর্থন করব। আমরা সবসময় একসঙ্গে থাকব।’
মেসির শেষ বার্তাটিও ছিল ঐক্যের। তার বিশ্বাস, আর্জেন্টিনা যখন একসঙ্গে থাকে, তখন যেকোনো বাধা অতিক্রম করার শক্তি তাদের থাকে।
‘আমরা যখন একসঙ্গে থাকি, ঐক্যবদ্ধ থাকি, তখন আমরা যেকোনো দলের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠি। যেকোনো কিছু পার করে যেতে পারি। সামনে কঠিন সময় আসবে। কারণ এতটা সাফল্য পাওয়া স্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। আর সেই কঠিন সময়ে আমাদের আরও বেশি করে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’
সতীর্থদের শেষ আলোচনার কথাও স্মরণ করেন মেসি। বড় লক্ষ্য অর্জনের জন্য শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ দল প্রয়োজন বলে সতীর্থদের বলেছিলেন তিনি।
‘বড় লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ দল গড়ে তুলতে হয়। কারণ কিছু মানুষ আছে, যারা আর্জেন্টিনাকে খারাপ অবস্থায় দেখতে চায়। তাদের সেই সুযোগ দেওয়া যাবে না।’
শেষ পর্যন্ত মাইক্রোফোন ছাড়তেও যেন চাইছিলেন না মেসি। আবেগ আর ভালোবাসায় ভরা কণ্ঠে বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে জীবনে সবচেয়ে বেশি কথা বলছি! আমি এখান থেকে যেতে চাই না।’
এরপর আর্জেন্টাইনদের উদ্দেশে তার শেষ কথাগুলো ছিল ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতায় ভরা। ‘আমি আপনাদের ভালোবাসি। আর্জেন্টাইন হতে পেরে আমি কৃতজ্ঞ। আপনাদের সবার সঙ্গে এই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরে আমি গর্বিত।’
/এমএমএইচ