ফুটবল কখনও কখনও শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়। কখনও এটি একটি দেশের পরিচয়, কখনো আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মাধ্যম, আবার কখনও এমন এক জানালা- যেখান দিয়ে বিশ্ব তাকায় তুলনামূলক অচেনা কোনো দেশের দিকে। লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে বেনিনের উপস্থিতি তাই নিছক একটি প্রীতি ম্যাচের ঘটনা হিসেবে দেখলে হয়তো গল্পের বড় অংশটাই বাদ পড়ে যায়।
৬ অক্টোবর বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলেছে বেনিন। ম্যাচটি ৩-০ গোলে জিতেছে আর্জেন্টিনা। কিন্তু স্কোরলাইন যতটা একপেশে, বেনিনের জন্য ম্যাচটির তাৎপর্য তার চেয়ে অনেক বড়। কারণ প্রতিপক্ষ শুধু আর্জেন্টিনা ছিল না। প্রতিপক্ষ ছিল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ফুটবলারের বিদায়ী মঞ্চ।
মেসির শেষ ম্যাচ বলে বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের নজর ছিল মনুমেন্টালের দিকে। ৮৫ হাজারের বেশি দর্শক ছিলেন গ্যালারিতে। মেসি করেছেন একটি গোল, সঙ্গে দুটি অ্যাসিস্ট। আর্জেন্টিনার জার্সিতে ২০৮তম ম্যাচে এসে শেষ করলেন আন্তর্জাতিক অধ্যায়। ফলে ম্যাচটির প্রতিটি মুহূর্তই পরিণত হয়েছে বৈশ্বিক ফুটবল সংবাদে। আর সেই গল্পের অপর প্রান্তে ছিল বেনিনের নাম।
এখানেই বেনিনের লাভটা শুধু মাঠের অভিজ্ঞতায় সীমাবদ্ধ নয়।
ফিফার সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক র্যাঙ্কিংয়ে জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত বেনিন ছিল ৯৩তম। দেশটির জাতীয় দল এখনও বিশ্ব ফুটবলের প্রতিষ্ঠিত শক্তি নয়। তবে ফিফার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে তারা খেলেছে। আফ্রিকার বাছাইপর্বের শেষ দিকে নাইজেরিয়ার কাছে ৪-০ ব্যবধানে হেরে তারা সরাসরি বিশ্বকাপে যাওয়ার সুযোগ হারায়।
অর্থাৎ, বিশ্ব ফুটবলে বেনিনের পরিচিতি এখনও মূলধারার শক্তিশালী দলগুলোর মতো নয়। কিন্তু মেসির শেষ ম্যাচে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়ানোর কারণে এক রাতেই তাদের নাম ঢুকে গেল বিশ্বের প্রায় প্রতিটি বড় ফুটবল প্রতিবেদনে। মেসির মতো একজন খেলোয়াড়ের বিদায়ী ম্যাচে অংশ নেওয়া বেনিনের জন্য তাই এক ধরনের বৈশ্বিক এক্সপোজার।
এটাকেই বৃহত্তর অর্থে ‘ফুটবল ডিপ্লোমেসি’ বলা যেতে পারে।
এখানে কোনও আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক চুক্তি হয়নি। কিন্তু ফুটবল যে দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগের নতুন দরজা খুলতে পারে, এই ম্যাচ তার একটি দারুণ উদাহরণ। বেনিন ফুটবল ফেডারেশনও ম্যাচটিকে শুধু ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখেনি। ম্যাচ ঘোষণার সময় তারা এটিকে আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন ও দক্ষিণ আমেরিকার কনমেবল -এর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর একটি সুযোগ হিসেবে তুলে ধরেছিল।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বেনিন এমন একটি দলের বিপক্ষে খেলেছে, যার নাম বিশ্ব ফুটবলে নিজেই একটি ব্র্যান্ড। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচ মানে শুধু মেসির বিপক্ষে খেলা নয়; এটি বেনিনের খেলোয়াড়দের জন্য বিশ্বের অন্যতম বড় ফুটবল বাজার ও দর্শকের সামনে নিজেদের তুলে ধরার সুযোগ।
মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলেছেন। কিন্তু তাঁর শেষ ম্যাচের প্রতিপক্ষ হিসেবে বেনিন যে বৈশ্বিক ফুটবল-আলোয় দাঁড়ানোর সুযোগ পেল, সেটি দেশটির জন্য নিঃসন্দেহে একটি বিরল প্রচারণা। মাঠের ফলাফল ভুলে গেলেও, ইতিহাসের পাতায় ‘মেসির শেষ ম্যাচের প্রতিপক্ষ’- এই পরিচয়টি বেনিনের সঙ্গে অনেক দিন থাকবে।