ইএসপিএনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল রাসমুসেন মারা গেছেন
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৫২ এএম
যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় ক্রীড়া সম্প্রচারমাধ্যম ইএসপিএনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল রাসমুসেন মারা গেছেন। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ফ্লোরিডার নিজ বাড়িতে ৯৩ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। পারকিনসন রোগের জটিলতায় তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে ইএসপিএন।
২০১৪ সালে পারকিনসন রোগে আক্রান্ত হন রাসমুসেন। ২০১৯ সালে, নিজেই বিষয়টি প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে এ রোগের সঙ্গে লড়াই করছিলেন এই ক্রীড়া সম্প্রচার উদ্যোক্তা।
ইএসপিএনের চেয়ারম্যান জিমি পিতারো এক বিবৃতিতে বলেন, বিল ছিলেন একজন অসাধারণ মানুষ; দূরদর্শী ও উদ্ভাবক। কেবল খেলাধুলার জন্য একটি টেলিভিশন নেটওয়ার্ক তৈরির ধারণা তিনিই প্রথম দিয়েছিলেন।
পিতারো বলেন, 'বিলের আবেগ, কঠোর পরিশ্রম ও উদ্যোক্তা মানসিকতা না থাকলে আজ আমরা কেউ এখানে থাকতাম না। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে ইএসপিএন গড়ে তোলার সময় তিনি যে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা এখনো প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতিতে বহমান।'
যেভাবে জন্ম নেয় ইএসপিএন
১৯৭৯ সালে, ছেলে স্কট রাসমুসেনকে সঙ্গে নিয়ে সার্বক্ষণিক খেলাধুলা সম্প্রচারের একটি টেলিভিশন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন বিল। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে এমন কোনো স্পোর্টস চ্যানেল ছিল না। তাদের সেই ধারণাই পরে বদলে দেয় দেশটির মানুষের টেলিভিশনে খেলাধুলা দেখার অভ্যাস।
তবে ইএসপিএনের শুরুটা হয়েছিল আরও ছোট পরিসরে। বিল রাসমুসেনের প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল শুধু কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের ক্রীড়া আয়োজন সম্প্রচার করা। কিন্তু রাজ্যটির অনেক ক্যাবল অপারেটর এতে আগ্রহ দেখাননি। পরে জাতীয় পর্যায়ে দর্শকদের কাছে পৌঁছাতে স্যাটেলাইটের সময় কিনে সম্প্রচারের পরিধি বাড়ানোর পরামর্শ আসে।
১৯৭৯ সালের ৭ সেপ্টেম্বর, আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ইএসপিএন। ওই দিন জর্জ গ্রান্ডে উপস্থাপনা করেন প্রথম ‘স্পোর্টসসেন্টার’ অনুষ্ঠান। এরপর নেটওয়ার্কটির প্রথম সরাসরি সম্প্রচার ছিল কেন্টাকি বোরবনস ও মিলওয়াকি শ্লিটজের মধ্যকার স্লো-পিচ সফটবল ম্যাচ।
প্রথম দিকের সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে গ্রান্ডে বলেন, তারা জানতেন না ইএসপিএন চার সপ্তাহ টিকবে, নাকি চার বছর। ৪০ বছরের বেশি তো দূরের কথা। তবে তারা জানতেন, উদ্যোগটি ছিল বিশেষ কিছু।
মাত্র ৯ হাজার ডলার দিয়ে শুরু
ইএসপিএন গড়ে তুলতে রাসমুসেনরা গেটি অয়েলের কাছ থেকে অর্থায়ন এবং এনসিএএর সঙ্গে সম্প্রচার স্বত্বের চুক্তি করেন। কানেকটিকাটের ব্রিস্টলে একটি স্টুডিও নির্মাণের কাজও শুরু হয়। তবে ইএসপিএন সম্প্রচারে যাওয়ার সময়ও স্টুডিওটির নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি।
ইএসপিএনের অর্থায়ন ও এনসিএএর সঙ্গে চুক্তি—দুটিই একই দিনে সম্পন্ন হয়েছিল।
রাসমুসেন একবার বলেছিলেন, কেউ যখন বলে কোনো কাজ করা সম্ভব নয়, তখন সেটি প্রমাণ করার তাগিদ আরও বেড়ে যায়। ২৪ ঘণ্টার একটি ক্রীড়া চ্যানেল চালানোর মতো পর্যাপ্ত খেলা নেই—এমন কথা অনেকেই তাদের বলেছিলেন। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন, তারা ঠিক পথেই আছেন।
তবে ইএসপিএনের নেতৃত্বে বেশিদিন থাকতে পারেননি বাবা-ছেলে। ১৯৮০ সালে তাদের নেটওয়ার্ক থেকে বের করে দেওয়া হয়। সে সময় ইএসপিএনের ৮৫ শতাংশ মালিকানা ছিল গেটি অয়েলের হাতে। পরে গেটি অধিগ্রহণ করা টেক্সাকো ১৯৮৪ সালে ইএসপিএনে তাদের অংশীদারিত্ব এবিসির কাছে বিক্রি করে দেয়।
দুই দশক পর ইএসপিএনে ফিরে আসা
ইএসপিএনের সঙ্গে রাসমুসেনের সম্পর্কের দূরত্ব কাটে ১৯৯৯ সালে। প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তাকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানায় প্রতিষ্ঠানটি। এরপর ধীরে ধীরে তার অবদান ও দূরদর্শিতার স্বীকৃতি দিতে শুরু করে ইএসপিএন।
২০১৯ সালে ইএসপিএনের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে সফর করেন রাসমুসেন। ওয়াল্ট ডিজনি কোম্পানি ও ইএসপিএনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তব্যও দেন তিনি।
ইএসপিএনের দীর্ঘদিনের উপস্থাপক ক্রিস বারম্যান বলেন, 'বিল ছিলেন আমাদের 'জর্জ ওয়াশিংটন' এবং একজন ভালো বন্ধু। তিনি সবসময় কৃতজ্ঞতাবোধে ভরা একজন মানুষ ছিলেন। প্রতিটি ক্রীড়াপ্রেমীই বিলের প্রতি কৃতজ্ঞ।
বিজ্ঞাপন থেকে ক্রীড়া সম্প্রচারে
শিকাগোতে জন্ম নেওয়া বিল রাসমুসেন ডিপাও ইউনিভার্সিটি ও রাটগার্স ইউনিভার্সিটি থেকে ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীতেও দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬০-এর দশকে বিজ্ঞাপন, রেডিও ও টেলিভিশনে কাজ করেন তিনি। ১৯৭৪ সালে কানেকটিকাটের হার্টফোর্ডে ওয়ার্ল্ড হকি অ্যাসোসিয়েশনের নিউ ইংল্যান্ড হোয়েলার্স দলের জনসংযোগ পরিচালক হিসেবে যোগ দেন।
১৯৭৮ সালে দলটির পুরো প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে দেওয়া হলে চাকরি হারান রাসমুসেন। এরপর ছেলে স্কটকে নিয়ে কেবল টেলিভিশনে খেলাধুলা সম্প্রচারের পরিকল্পনা শুরু করেন। শুরুর পুঁজি হিসেবে ক্রেডিট কার্ড থেকে প্রায় ৯ হাজার ডলার অগ্রিম নিয়েছিলেন তারা।
ইএসপিএনের অন্যতম প্রথম দিকের উপস্থাপক বব লে বলেন, তাদের উদ্যোগে ছিল প্রচণ্ড সাহস, দূরদর্শিতা এবং সীমাহীন আত্মবিশ্বাস। অথচ একই সময়ে তাদের ক্রেডিট কার্ডের সীমাও প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল—যা ছিল ‘আমেরিকান ড্রিমের’ এক বাস্তব উদাহরণ।
/এআই