ইতিহাসের পাতা থেকে চলতি বিশ্বকাপ
আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড দ্বৈরথ দেখার অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৪:০৩ পিএম
ফুটবলে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার লড়াই বলতে অনেকেই বোঝে শুধু ব্রাজিল বনাম আর্জেন্টিনার লড়াই। তবে আর্জেন্টিনার সঙ্গে আরেকটি দলও এই লড়াইয়ে শামিল রয়েছে। সেটি হলো ইংল্যান্ড।
২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে বুধবার বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ১টায় (১৬ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় মুখোমুখি হচ্ছে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। এ ম্যাচে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে তীব্র ও আলোচিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাগুলোর একটি আবারও নতুন অধ্যায় লিখতে যাচ্ছে।
২০২২ বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষা শেষে শিরোপা জিতেছিল আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে, ১৯৬৬ সালের একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের পর গত ৬০ বছর ধরে দ্বিতীয় শিরোপার অপেক্ষায় রয়েছে ইংল্যান্ড। সেই স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে হলে হ্যারি কেইন-জুড বেলিংহামদের হারাতে হবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।
বিশ্বকাপে ষষ্ঠবারের মতো মুখোমুখি
বিশ্বকাপে এটি হবে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার ষষ্ঠ সাক্ষাৎ।
প্রথম দেখা ১৯৬২ সালের গ্রুপ পর্বে। সেই ম্যাচে ৩-১ গোলে জিতেছিল ইংল্যান্ড। ববি চার্লটন ও জিমি গ্রিভস গোল করেছিলেন। ওই হারের ফলে নকআউট পর্বে ওঠা হয়নি আর্জেন্টিনার।
১৯৬৬: র্যাটিন বিতর্ক, জন্ম নেয় বৈরিতা
চার বছর পর স্বাগতিক ইংল্যান্ডে আবারও মুখোমুখি হয় দুই দল। কোয়ার্টার ফাইনালের সেই ম্যাচ থেকেই মূলত দুই দেশের ফুটবল বৈরিতার সূচনা।
আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও র্যাটিনকে প্রথমার্ধে অসৌজন্যমূলক আচরণের দায়ে মাঠ থেকে বের করে দেন পশ্চিম জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রাইটলাইন। র্যাটিন সিদ্ধান্ত মানতে অস্বীকৃতি জানিয়ে দীর্ঘ সময় মাঠে অবস্থান করেন। শেষ পর্যন্ত পুলিশি সহায়তায় তাকে মাঠ ছাড়তে হয়। এতে প্রায় নয় মিনিট খেলা বন্ধ ছিল।
একজন কম নিয়ে লড়াই করেও শেষ পর্যন্ত ১-০ ব্যবধানে হারে আর্জেন্টিনা। জিওফ হার্স্টের গোলে জিতে ইংল্যান্ড সেমিফাইনালে ওঠে এবং পরে বিশ্বকাপ জিতে নেয়।
এই ঘটনার পরই ফুটবলে লাল ও হলুদ কার্ড চালুর প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালোভাবে সামনে আসে। ১৯৭০ বিশ্বকাপ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সেই নিয়ম কার্যকর হয়।
১৯৮৬: 'হ্যান্ড অব গড' ও শতাব্দীর সেরা গোল
দুই দলের সবচেয়ে স্মরণীয় ম্যাচ নিঃসন্দেহে ১৯৮৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনাল।
ফকল্যান্ড যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর হওয়া সেই ম্যাচে ডিয়েগো ম্যারাডোনা প্রথমে হাত দিয়ে গোল করেন। পরে সেই গোলকে তিনি বিখ্যাতভাবে 'হ্যান্ড অব গড' বলে অভিহিত করেন।
এর কিছুক্ষণ পর নিজের অর্ধ থেকে বল নিয়ে পাঁচজন ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে করেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল, যা পরে 'গোল অব দ্য সেঞ্চুরি' নামে পরিচিতি পায়।
ম্যারাডোনার জোড়া গোলে ২-১ ব্যবধানে জিতে আর্জেন্টিনা। পরে তারা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপও জিতে নেয়।
১৯৯৮: বেকহামের লাল কার্ড
ফ্রান্স বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে আবারও নাটকীয় লড়াই হয় দুই দলের।
ডেভিড বেকহাম ও দিয়েগো সিমেওনের সংঘর্ষে বেকহাম লাল কার্ড দেখেন। নির্ধারিত সময় ও অতিরিক্ত সময় শেষে ২-২ সমতায় থাকা ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে।
সেখানে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। ম্যাচ শেষে বেকহামকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। ইংল্যান্ডের সংবাদপত্র দ্য সান তাকে নিয়ে বিখ্যাত শিরোনাম করেছিল— '১০ জন বীর, একজন বোকা ছেলে'।
মুখোমুখি পরিসংখ্যান
সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে এখন পর্যন্ত দুই দল মুখোমুখি হয়েছে ১৪ বার। যার মধ্যে ইংল্যান্ড জিতেছে ৬টি এবং ৩টি জয় রয়েছে আলবিসেলেস্তেদের। বাকি ৫টি ম্যাচ হয়েছে ড্র।
আবার, বিশ্বকাপে পাঁচবারের লড়াইয়ে ইংল্যান্ড জিতেছে তিনবার। আর্জেন্টিনা জিতেছে দুইবার। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল আর ১৯৯৮ সালে রাউন্ড অব সিক্সটিনে টাইব্রেকারে জয় পায় আলবিসেলেস্তেরা।
এছাড়া সর্বশেষ দেখায়, ২০০৫ সালের নভেম্বরে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় একটি প্রীতি ম্যাচে ৩-২ গোলের জয় পায় আর্জেন্টিনা।
এবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে দুই ফুটবল পরাশক্তির সেই ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যুক্ত হতে যাচ্ছে আরেকটি নতুন অধ্যায়। ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে ইতিহাস, আবেগ ও মর্যাদার সঙ্গে এবারও জড়িয়ে থাকবে দুই দলের বহু বছরের বৈরিতা।
/এনএ