আফ্রিকার পশ্চিম প্রান্তে আটলান্টিক মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরুর আগে ফুটবলপ্রেমীদের অনেকের কাছেই দেশটির নাম ছিল অপরিচিত। অথচ প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে এসেই রচনা করেছে রূপকথা। শেষ পর্যন্ত রাউন্ড অব ৩২-এ বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার কাছে অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ গোলে হারলেও, নিজেদের অভিষেক বিশ্বকাপেই ইতিহাস গড়ে বিদায় নিল 'ব্লু শার্কস'।
বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের যাত্রা শুরু হয়েছিল আন্ডারডগ হিসেবে। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দিয়ে সবাইকে চমকে দেয় তারা। অনেকে সেটিকে কাকতালীয় ফল মনে করলেও দ্বিতীয় ম্যাচে শক্তিশালী উরুগুয়ের বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র করে প্রমাণ করে দেয়, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়। শুধু রক্ষণ নয়, আক্রমণেও যে তারা সমান কার্যকর, সেটিও দেখিয়েছিল সেই ম্যাচে।
গ্রুপের শেষ ম্যাচে সৌদি আরবের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে তিন পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ 'এইচ'-এর রানার্সআপ হয় কেপ ভার্দে। ২০১০ সালে স্লোভাকিয়ার পর প্রথম অভিষিক্ত দল হিসেবে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ওঠার কীর্তিও গড়ে তারা। স্পেন ও উরুগুয়ের মতো পরাশক্তিদের পেছনে ফেলে এই অর্জন ছিল এবারের আসরের অন্যতম বড় বিস্ময়।
নকআউটে তাদের সামনে ছিল আরও কঠিন পরীক্ষা— তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ও বর্তমান শিরোপাধারী আর্জেন্টিনা। শনিবার (৪ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে লিওনেল মেসিদের বিপক্ষেও ভয়ডরহীন ফুটবল খেলেছে আফ্রিকার ছোট্ট দেশটি। দুবার পিছিয়ে পড়েও সমতায় ফিরেছিল তারা। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে আত্মঘাতী গোলে ৩-২ ব্যবধানে হারলেও, ম্যাচের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের কাঁপিয়ে রেখেছিল কেপ ভার্দে।
এই ম্যাচেও দলের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলেন গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। একের পর এক দুর্দান্ত সেভে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগকে হতাশ করেছেন তিনি। ম্যাচে করেছেন ৮টি সেভ, সঙ্গে ছিল তিনটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রাউন্ড ট্যাকল। স্পেনের বিপক্ষে করেছিলেন আরও ৭টি সেভ। সব মিলিয়ে এবারের বিশ্বকাপে তার মোট সেভের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮। এই তালিকায় তার চেয়ে এগিয়ে আছেন কেবল প্যারাগুয়ের অরল্যান্ডো গিল ও কুরাসাওয়ের এলোয় রুম।
শুধু ভোজিনিয়াই নন, ডেরয় দুয়ার্তে, সিডনি লোপেস কাবরাল, কেভিন পিনা, পিকো লোপেসসহ পুরো দলই নিজেদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা উজাড় করে দিয়েছে। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষেও তারা দেখিয়েছে সাহস, শৃঙ্খলা ও অদম্য লড়াইয়ের মানসিকতা।
এছাড়া, এবারের বিশ্বকাপে তাদের খেলা চার ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ মিনিট সময়ে তাদের কেউ হারাতে পারে নি।
হারলেও কেপ ভার্দে প্রমাণ করে দিয়েছে, ফুটবলে ইতিহাস গড়তে শুধু বড় নাম বা উচ্চ র্যাঙ্কিং যথেষ্ট নয়। আত্মবিশ্বাস, দলীয় সংহতি এবং শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার মানসিকতাই পারে অসম্ভবকে সম্ভব করতে। প্রথম বিশ্বকাপেই বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে নিজেদের নাম স্থায়ীভাবে লিখে রাখল আফ্রিকার ছোট্ট এই দ্বীপরাষ্ট্র।
/এনএ