ফ্রান্সের বন্ডি থেকে বিশ্বমঞ্চে, তারকা এমবাপ্পের গল্প কতটুকু জানেন?
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ০৮:১১ পিএম
মাত্র ২৭ বছর বয়সী ফ্রান্সের ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পে বিশ্বকাপের মঞ্চে ইতোমধ্যেই করেছেন ১৮টি গোল, জিতেছেন বিশ্বকাপ শিরোপা। এই অর্জন স্রেফ অবিশ্বাস্য মনে হলেও বাস্তব সত্যে পরিণত করেছেন তিনি। মাত্র তিনটি বিশ্বকাপ খেলেই এই কীর্তি গড়েন তিনি। একজন ফুটবলারের সাফল্যের চূড়ান্ত মানদণ্ড নিয়ে তর্ক-বিতর্ক থাকলেও, বিশ্বকাপে এমবাপ্পের এই অর্জন ইতোমধ্যেই তাকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা পারফর্মারদের কাতারে জায়গা করে দিয়েছে।
এরইমধ্যে তিন বিশ্বকাপ খেলা এমবাপ্পে জিতেছেন একটি বিশ্বকাপ শিরোপা, আরেকটিতে রানার্স আপ। এবারও ২০২৬ বিশ্বকাপে শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে ফ্রান্সকে শেষ ষোলোতে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এই তারকা ফরোয়ার্ড। তবে ফ্রান্সের বন্ডিতে বেড়ে ওঠা কিলিয়ান এমবাপ্পের বিশ্বতারকা হয়ে ওঠার গল্প সম্পর্কে আপনি কতটুকু জানেন? সেই অবিশ্বাস্য যাত্রার গল্পই থাকছে আজকের আয়োজনে।
যেভাবে মোনাকো থেকে নিজের জাত চেনালেন এমবাপ্পে
২০১৬-১৭ মৌসুমে এমবাপ্পে শুধু সম্ভাবনাময় এক তরুণ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেননি, বরং ইউরোপের সবচেয়ে বিস্ময়কর ও আলোচিত তরুণ ফুটবলারদের একজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে এএস মোনাকো লিগ ওয়ানের শিরোপা জেতে এবং উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালেও জায়গা করে নেয়। সেই সময় বিপুল আর্থিক সামর্থ্যের জোরে ফরাসি ফুটবলে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করছিল প্যারিস সেইন্ট-জার্মেই (পিএসজি)। এমন বাস্তবতায় মোনাকোর শিরোপা জয় ছিল ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম বড় অঘটন, আর সেই সাফল্যের অন্যতম প্রধান নায়ক ছিলেন এমবাপ্পে।

মৌসুম শেষে তিনি আর শুধু ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় তারকা ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত নিজেকে তারকা খেলোয়াড় হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলো তাকে দলে ভেড়াতে প্রতিযোগিতায় নেমেছিল, আর ফুটবল বিশ্ব নিশ্চিতভাবেই তখন বুঝে গিয়েছিল, এক নতুন সুপারস্টারের আবির্ভাব ঘটেছে।

ফ্রান্সের বন্ডিতে বেড়ে ওঠা
তবে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা হয়ে ওঠার বহু আগেই এমবাপ্পে ছিলেন ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের উত্তর-পূর্ব উপকণ্ঠের শহরতলি বন্ডিতে বেড়ে ওঠা এক সাধারণ কিশোর। সেখানে ফুটবল ছিল দৈনন্দিন জীবনেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। বন্ডি থেকে শুরু হয় তার উত্থানের গল্প।

এমবাপ্পের বাবা উইলফ্রিড এমবাপ্পের জন্মভূমি ক্যামেরুন ও মা ফায়জা লামারির আলজেরিয়া। ভাগ্য বদলের আশায় এমবাপ্পের বাবা-মা নিজেদের জন্মভূমি ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন ইউরোপে।
নিজের পরিবার থেকেই ফুটবলের প্রতি তার আগ্রহ গড়ে ওঠে। মূলত তার খেলাধুলা ছিল শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং জীবনযাপনেরই অংশ। তার বাবা ছিলেন একজন ফুটবল কোচ এবং মা পেশাদার হ্যান্ডবল খেলোয়াড়। বাবা তাকে শিখিয়েছিলেন শৃঙ্খলা, নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের মূল্য। আর মা গড়ে তুলেছেন প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা, যা পরবর্তীতে তাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করেছে।

এমনকি নিজের চেয়ে বয়সে বড় ও শারীরিকভাবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নিয়মিত খেলার অভিজ্ঞতা তার দক্ষতা ও মানসিক দৃঢ়তা দ্রুত বিকশিত করে। বিশ্ব ফুটবল তাকে চেনার অনেক আগেই এই অভিজ্ঞতাগুলো এমবাপ্পের সাফল্যের ভিত্তি গড়ে দেয়।
রাশিয়া বিশ্বকাপ বদলে দেয় এমবাপ্পের ক্যারিয়ার
২০১৮ সালের ফিফা বিশ্বকাপই কিলিয়ান এমবাপ্পেকে সম্ভাবনাময় এক তরুণ প্রতিভা থেকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকায় পরিণত করে। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জেতাতে পালন করেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বিশেষ করে শেষ ষোলোতে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স ছিল পুরো টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা মুহূর্ত। দুর্বার গতি, আত্মবিশ্বাস এবং অসাধারণ স্থিরতায় তিনি মুগ্ধ করেন ফুটবলপ্রেমীদের।

এই বিশ্বকাপেই ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লেখান এমবাপ্পে। বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করা দ্বিতীয় কিশোর ফুটবলার হিসেবে তিনি স্থান করে নেন ব্রাজিল কিংবদন্তি পেলের পাশে। মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে ফ্রান্স যখন চতুর্থবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়নের ট্রফি উঁচিয়ে ধরে, তখনই ফুটবল বিশ্ব বুঝে যায়, নতুন এক সুপারস্টারের আবির্ভাব ঘটেছে।
কাতার বিশ্বকাপে শিরোপা হারিয়েও ইতিহাস গড়া পারফরম্যান্স
চার বছর পর কাতার বিশ্বকাপে এমবাপ্পে নিজেকে নিয়ে যান আরও অনন্য এক উচ্চতায়। ফ্রান্স টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও পুরো আসরের সবচেয়ে আলোচিত ও উজ্জ্বল ফুটবলার ছিলেন তিনিই। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে রুদ্ধশ্বাস ফাইনালে তিনি হ্যাটট্রিক করে ১৯৬৬ সালের পর প্রথম ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে এই বিরল কীর্তি গড়েন। একই সঙ্গে তিনি জয় করেন গোল্ডেন বুট, টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার স্বীকৃতি অর্জন করে। তবে শিরোপা হাতছাড়া হলেও কাতার বিশ্বকাপে এমবাপ্পের ব্যক্তিগত নৈপুণ্য বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় পারফরম্যান্স হিসেবে বিবেচিত হয়।
ক্যারিয়ার শেষে এমবাপ্পে কোথায় থামবেন?
ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে এমবাপ্পে নিজেকে কোথায় নিয়ে যাবেন, এখনই সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজা শুরু হয়ে গেছে। কারণ, একই বিশ্বকাপে তিনি খেলছেন ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি এবং ৪১ বছর বয়সী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো দুই কিংবদন্তির সঙ্গে। যদিও বয়স এখনও তার পক্ষে, সামনে রয়েছে আরও একাধিক বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ। তাই শেষ পর্যন্ত এমবাপ্পে ইতিহাসে কোথায় নিজের নাম লিখবেন, সেই উত্তর সময়ই বলে দেবে।