রক্ত ঝরিয়েও থামেননি, দলকে জিতিয়েই মায়ের বুকে সাইবারি
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০৩:৪৯ পিএম
আল মাহফুজ ⚫
ডাচদের মুখোমুখি মরক্কো। বাঁচা-মরার ম্যাচ। অতিরিক্ত সময়ের শেষের দিকে দেখা গেল, একজন মরক্কান খেলোয়াড়ের জার্সি রঞ্জিত ছোপ ছোপ দাগে। মাথায় নিদারুণ চোট, কপাল ফেটে ঝরছে রক্ত, সেই রক্তে সিক্ত সাদা জার্সি। তবু ফুটবলারটির কোনো হেলদোল নেই। মানসিক দৃঢ়তায় চির ধরেনি। মাথায় একটাই ভাবনা– দলের জয়!
যেকোনো ফুটবলার এমন পরিস্থিতিতে মাঠ ছাড়ার সিদ্ধান্তটাই নিতেন। কিন্তু তিনি ইসমাইল সাইবারি, যিনি অন্য ধাতুতে গড়া। তিনি ইসমাইল সাইবারি, যার ধমনীতে বইছে ভূমধ্যসাগরীয় রক্ত। যার খেলা দেখতে সহস্র মাইল পাড়ি দিয়ে গ্যালারিতে হাজির গর্ভধারিণী, সেই সাইবারি থেমে গেলে চলে?
তিনি জার্সি পাল্টালেন, মাঠে ফিরলেন। টাইব্রেকারে মরক্কোর শেষ শটটি নেয়ার আগে ভুলে গেলেন চোটের কথা। কিন্তু ভুলে যাননি, দলের শেষ ভরসা তিনিই। পুরো জাতি তার দিকে তাকিয়ে। দম নিয়ে দাঁড়ালেন, ডাচদের জালে বল জড়িয়ে দেশকে এনে দিলেন অবিস্মরণীয় এক জয়। ‘রক্তাক্ত নায়ক’-এর গোলেই নিশ্চিত হয় মরক্কোর শেষ ষোলোর টিকিট।
নতুন জার্সিটি গা থেকে খুলে বুনো উদযাপনে মেতে ওঠা সাইবারিকে ভেবেই কবি লিখেছিলেন, 'উৎকৃষ্ট সময় কিন্তু আজ বয়ে যায়'? ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজতেই এই মিডফিল্ডার ছুটে যান গ্যালারিতে, সেখানে আছে মায়ের শীতল বুক। অশ্রুসিক্ত নয়নে মাকে জড়িয়ে ধরেন, সাইবারি যেন আলিঙ্গন করেন জীবনের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্তটাকেও।

চলতি বিশ্বকাপে দারুণ ছন্দে আছেন সাইবারি। গ্রুপ পর্বের প্রতিটি ম্যাচে গোল করেছেন। মেটলাইফে ব্রাজিলের হাজারও সমর্থককে স্তব্ধ করে দিয়ে মরক্কোকে এক পয়েন্ট এনে দেওয়ার নায়কও তিনি। আজ বোস্টনে আবারও অ্যাটলাস লায়নদের নায়ক বনে গেলেন।
অথচ ১৪ বছর বয়সেই ইতি ঘটতে পারতো সাইবারির ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন। এমনকি মরক্কোর হয়ে এই মিডফিল্ডারের খেলার কথাই ছিল না। স্পেন কিংবা বেলজিয়ামের হয়েও খেলার সুযোগ ছিল। কিন্তু শেষমেশ তিনি বেছে নেন উত্তর আফ্রিকার দেশটিকেই।
সাইবারির জন্ম স্পেনে। পরে তার পরিবার পাড়ি জমায় বেলজিয়ামে। সেখানেই সাইবারির বেড়ে ওঠা, ফুটবলার হবার স্বপ্নের বীজ বোনা। কৈশোরে ওজন কিছুটা বেড়ে যাওয়ায় বেলজিয়ামের ক্লাব আন্দ্রেলেখ্ত তাকে বাতিলের খাতায় ফেলে দেয়। ফলে জমে ওঠে বেলজিয়ামের প্রতি অভিমান।
স্বপ্নের মুকুল নাজুক হয়ে পড়লেও সাইবারি হাল ছাড়েননি। যোগ দেন পিএসভি আইন্দহোভেনে। সেখানে আশীর্বাদ হয়ে আসেন ডাচ কিংবদন্তি রুড ভ্যান নিস্টলরয়। তার প্রশিক্ষণ আর মেন্টরশিপে আজকের সাইবারির গড়ে ওঠা। সাইবারির উত্থানের পেছনে বড় অবদান রয়েছে মরক্কোর কোচ মোহামেদ ওয়াহবিরও। উইঙ্গার থেকে মূল স্ট্রাইকারের ভূমিকায় খেলার পর থেকেই কোচের আস্থার প্রতিদান দিয়ে যাচ্ছেন সাইবারি। চলতি বিশ্বকাপে তার শিকেয় ছিঁড়েছে ৩টি গোল।
২০২২ বিশ্বকাপের আগে রবার্তো মার্টিনেজ সাইবারিকে বেলজিয়ামের হয়ে খেলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। জন্মসূত্রে স্পেন, নাগরিকত্ব থাকায় 'ব্যাটলগ্রাউন্ড অব ইউরোপ'-এর হয়ে তার খেলার সুযোগ ছিল। কিন্তু সাইবারি সবিনয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ, তার মনের ঘুড়ি উড়ছিল অ্যাটলাস পর্বতমালায়। ফলে অন্য কোনো দেশের হয়ে খেলার কথা কখনোই ভাবেননি তিনি।
মরক্কোর প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে কখনও সংশয়ে ছিলেন না– এই কথা সাইবারি বহুবার বলেছেন। কপাল থেকে সবুজ মাঠে পড়া রক্তের প্রতিটি ফোঁটা আজ সেই সাক্ষ্যই দেয়। জয়সূচক গোল করে জার্সি খুলে বুনো উদ্যাপন অথবা গ্যালারিতে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরা আবেগঘন মুহূর্তের ছবিও সেই সাক্ষ্যই দেয়।
হুম, সাইবারি দিনে দিনে মরক্কোর আশা-ভরসার অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছেন। সাইবারির উত্থানে আকাশ সমান স্বপ্ন দেখতেই পারে অ্যাটলাস লায়নরা।