×
Logo

খেলাধুলা

রূপকথার গল্প লিখে ইতিহাস গড়লো কেপ ভার্দে, এবার সামনে আর্জেন্টিনা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬, ১২:২১ পিএম

রূপকথার গল্প লিখে ইতিহাস গড়লো কেপ ভার্দে, এবার সামনে আর্জেন্টিনা

গুয়াদালাহারায় স্পেন-উরুগুয়ের ম্যাচ তখনও শেষ হয়নি। শেষ বাঁশির অপেক্ষা। কিন্তু এরইমধ্যে সৌদি আরবের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে কেপ ভার্দের খেলোয়াড়রা একটি মোবাইল ফোন ঘিরে দাঁড়ান। সবার চোখ তখন স্পেন-উরুগুয়ে ম্যাচের দিকে। স্পেনের জয় নিশ্চিত হতেই মাঠ ও গ্যালারিজুড়ে বয়ে যায় আনন্দাশ্রুর বন্যা। রূপকথার গল্প লিখে ফুটবল ইতিহাসে নিজেদের নাম তুলে ফেলে আটলান্টিক মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপদেশটি।

মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের দেশটি জনসংখ্যার বিচারে বিশ্বকাপ ইতিহাসে খেলা তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ, অথচ প্রথমবারের মতো জায়গা করে নিয়েছে নকআউট পর্বে। সামনে শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে প্রতিপক্ষ হিসেবে পেয়েছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে। একদিকে লিওনেল মেসির শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার মিশন, অন্যদিকে তাদের নতুন ইতিহাস লেখার স্বপ্ন। শেষ হাসি হাসবে কে। মেসি ম্যাজিক, নাকি কেপ ভার্দের রূপকথা। আগামী ৪ জুলাই মায়ামিতে বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় শুরু হবে আর্জেন্টিনা–কেপ ভার্দের ম্যাচটি।

Fans Watch Cape Verde - Saudi Arabia - 27 Jun 2026Supporters watch Cape Verde's third World Cup match, this time against Saudi Arabia.
দর্শকদের উল্লাস

বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের যাত্রা শুরু হয়েছিল স্পেনের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য গোলশূন্য ড্র দিয়ে। ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহার দুর্দান্ত নৈপুণ্যে ম্যাচের নায়ক ছিলেন তিনিই। এরপর দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের বিপক্ষেও ২-২ গোলে ড্র করে আবারও আলোচনায় আসে দলটি। শেষ গ্রুপ ম্যাচে সৌদি আরবের বিপক্ষেও গোলশূন্য ড্র করে কেপ ভার্দে। এরমধ্য দিয়ে বিশ্বকাপে প্রথমবার অংশ নিয়েই গ্রুপ পর্বে অপরাজিত থাকার কৃতিত্ব দেখিয়েছে তারা।

যেভাবে সাফল্য পেলো?

বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে কেপ ভার্দে পাঁচবারের আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন ক্যামেরুনকে পিছনে ফেলে। এমনকি বিশ্বকাপে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সেও নজর কেড়েছে। এই সফলতার সবচেয়ে বড় কারণ দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের (এফসিএফ) দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

প্রবাসী খেলোয়াড়

দেশটির ফুটবল ফেডারেশন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী কেপ ভার্দিয়ান বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের দলে ভেড়ানোর কৌশল নেয়। সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি পর্তুগালের সঙ্গে কেপ ভার্দের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। গত শতকের ভয়াবহ খরার কারণে বহু মানুষ দেশ ছেড়ে পর্তুগালে চলে যান। সমুদ্রবাণিজ্যের সুবাদে নেদারল্যান্ডসের রটারডামেও গড়ে ওঠে বড় একটি কেপ ভার্দিয়ান সম্প্রদায়।

বিশ্বকাপ স্কোয়াডের ২৬ জনের মধ্যে ১৪ জনই দেশের বাইরে জন্মেছেন। তাদের মধ্যে ছয়জনের জন্ম নেদারল্যান্ডসের রটারডামে। এই ছয়জনের একজন ফরোয়ার্ড ডেইলন লিভরামেন্তো। গত মৌসুমে তিনি পর্তুগালের ক্লাব কাসা পিয়ার হয়ে খেলেছেন। গত সেপ্টেম্বরে ক্যামেরুনের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে জয়সূচক একমাত্র গোলটিও করেছিলেন তিনিই।

কেপ ভার্দের সংসদ সদস্য জোসিনা ফ্রেইতাস ফোর্তেস বিবিসি স্পোর্ট আফ্রিকাকে বলেন, আজকের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর ধারাবাহিক পরিশ্রম, দৃঢ় বিশ্বাস এবং এমন কিছু মানুষের অবদান, যারা এই প্রকল্পের জন্য নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন।

Vozinha celebrates with Livramento after Cape Verde qualify for the knockout stages, where they will face world champions Argentina.
উল্লাসে মেতেছেন খেলোয়াড়রা 

কোচের নেতৃত্ব

২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে কেপ ভার্দের দায়িত্বে থাকা কোচ বুবিস্তার অবদান তাদের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি। সাবেক এই আন্তর্জাতিক ফুটবলার দীর্ঘ সময় দায়িত্বে থাকায় একটি সংগঠিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও শক্তিশালী দল গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। তার অধীনে কেপ ভার্দে গড়ে উঠেছে দৃঢ় রক্ষণ, ভারসাম্যপূর্ণ মিডফিল্ড এবং প্রতিভাবান আক্রমণভাগ।

২০২৩ আফ্রিকান কাপ অব নেশনসে তারা ঘানাকে হারিয়েছে, মিসরের সঙ্গে ড্র করেছে এবং কোয়ার্টার ফাইনালেও জায়গা করে নিয়েছিল। অথচ মাত্র এক দশক আগেই প্রথমবারের মতো এই টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছিল দেশটি।

স্পেনের বিপক্ষে গোলরক্ষক ভোজিনহার সাতটি দুর্দান্ত সেভ যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনি পুরো দলের শৃঙ্খলাও ছিল চোখে পড়ার মতো। ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিপক্ষে পুরো ম্যাচে কেপ ভার্দে মাত্র একটি ফাউল করেছিল, যেটি ১৯৬৬ সালের পর কোনো বিশ্বকাপ ম্যাচে এটিই সবচেয়ে কম ফাউলের রেকর্ড।

উরুগুয়ের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে কেপ ভার্দে আরও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছিল। পিছিয়ে পড়ার পরও দ্বিতীয়ার্ধে সমতায় ফিরে এসে দলটি নিজেদের মানসিক দৃঢ়তারও প্রমাণ দিয়েছে।

কোচ বুবিস্তা বলেন, ফলাফলের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা দল হিসেবে আমাদের পরিচয়, শক্তি, ঐক্য এবং লড়াই করার মানসিকতা তুলে ধরতে পেরেছি।

বিশ্বকাপে দলকে তোলার কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৫ সালে আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন (ক্যাফ) তাঁকে বর্ষসেরা কোচ নির্বাচিত করে। তবে এই সাফল্যের স্বপ্ন তিনি অনেক আগেই দেখেছিলেন। ২০২১ আফ্রিকান কাপ অব নেশনসের আগে বিবিসি স্পোর্ট আফ্রিকাকে তিনি বলেছিলেন, আমাদের দেশের আকার বিবেচনায় আমরা অসাধারণ ভালো করেছি। আমি বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতে আমরা বিশ্বকাপে খেলব।

সেই ভবিষ্যদ্বাণী এখন বাস্তবে পরিণত হয়েছে। আর এখন বুবিস্তার আশা, বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের এই সাফল্য বিশ্বের অন্যান্য ছোট দেশকেও অনুপ্রাণিত করবে। তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি, ফুটবল সবার জন্য।

/এসআইএন

Logo