ছবি: লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুচ্চিত্তিনি
১৯৮৭ সালের ২৪ জুন, আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরের এক মিষ্টি সকাল। শহরের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নিলো এক শিশু। কে জানতো, গ্রোথ হরমোনজনিত জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়া এই শীর্ণকায় শিশুটিই একদিন নতুন করে লিখবে পুরো পৃথিবীর ফুটবল ব্যাকরণ। চলতি বিশ্বকাপের উত্তেজনার মধ্যেই ৩৯ বছরে পা রাখলেন ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তি লিও। বয়সকে স্রেফ একটা সংখ্যা বানিয়ে ৩৯ বছর বয়সেও যিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টার মায়ামির মাঠ থেকে শুরু করে আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সিতে ছড়িয়ে যাচ্ছেন নিখুঁত পাসিং, কৌশলগত দুর্দান্ত সব ফ্রি-কিক আর জাদুকরী ড্রিবলিংয়ের চোখ ধাঁধানো কারুকার্য।
বার্সেলোনার এক রেস্তোরাঁয় ২০০০ সালের এক ঐতিহাসিক দুপুর। লিওনেল মেসির মহাকাব্যিক পথচলার শুরু। বার্সার তৎকালীন স্পোর্টিং ডিরেক্টর কার্লেস রেক্সাচ মেসির প্রতিভা দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, চুক্তির কাগজ না পেয়ে তড়িঘড়ি করে একটি সাধারণ 'ন্যাপকিন পেপার'-এর ওপর দস্তখত করিয়ে বার্সেলোনায় ডেকে নেন এই অত্যুজ্জ্বল প্রতিভাধরকে। সেই একটা ন্যাপকিন পেপারই যেন বদলে দিয়েছিল বিশ্ব ফুটবলের মুন্সিয়ানার সংজ্ঞা।
এরপর স্পেনের লা মাসিয়া একাডেমি থেকে উঠে এসে রোনালদিনহোর স্নেহের ছায়া পেরিয়ে মেসি হয়ে উঠলেন ন্যু ক্যাম্পের অবিসংবাদিত প্রাণভোমরা। পেপ গার্দিওলার বার্সেলোনা যখন বিশ্ব ফুটবলের সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছিলেন, সেই শিল্পের অবিসংবাদিত শিল্পী ছিলেন মেসি। ৪টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, রেকর্ডসংখ্যক ব্যালন ডি’অর আর গোল্ডেন বুট—সবকিছুই যেন তার পায়ে এসে লুটিয়ে পড়েছিল নদী যেভাবে প্রবাহমাণভাবে পতিত হয় সাগর থেকে মহাসাগরে।

কিন্তু ক্লাব ফুটবলের এই মুকুটহীন সম্রাটের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের গল্পটা দীর্ঘদিন ছিল বিষাদের রঙে নীল। ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার জার্সিতে অভিষেক ম্যাচের মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মাথায় হাঙ্গেরির বিপক্ষে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তাকে। যেন নিয়তি শুরুতেই জানিয়ে দিয়েছিল, দেশের জার্সিতে পথটা মোটেও সহজ নয়, বন্ধুর। তারপর এলো একের পর এক হৃদয়ভাঙা রাতের বিভীষিকা। ২০০৭ কোপা আমেরিকার ফাইনাল হার। ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার টানা ফাইনালে টাইব্রেকারের ট্র্যাজেডি—মেসিকে নিয়ে যায় অবসরের দ্বারপ্রান্তে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতটা ছিল ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ। মারাকানার সেই অভিশপ্ত রাতে জার্মানির কাছে হেরে ট্রফি থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মেসির সেই শূন্য, অশ্রুসজল দৃষ্টি বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের বুক ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। কিন্তু অপরাজেয় মেসি সব ক্ষত, সমালোচনা আর ট্রফির আক্ষেপকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে পরম আরাধ্য সোনালি ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরেন। অবসান ঘটে আর্জেন্টিনার দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষার, পরাজিত হয় প্রত্যাশার দীর্ঘশ্বাসের।
ড্রিবলিং আর ভিশনের মহাজাগতিক এক রূপকথা
লিওর ফুটবল খেলা স্রেফ কোনো ম্যাচ নয়, তা যেন সবুজ গালিচায় ঝংকার তোলা কোনো কবিতার ছন্দ। ৩৯ বছর বয়সে এসেও যখন মাঠে মৃগেন্দ্র কেশরীরূপ লিওকে প্রতিপক্ষের কয়েকজন ডিফেন্ডার ঘেরাও করে, তখন তার সেই চেনা কাঁধের ঝাঁকুনি আর চোখের পলকে করা ড্রিবলিংয়ে খড়কুটোর মতো উড়ে যায় আধুনিক ফুটবলের প্রতিষ্ঠিত সব জমাট রক্ষণভাগ। বিশ্বের বাঘা বাঘা ডিফেন্ডাররা যেখানে শরীরের শক্তি দিয়ে বল কাড়তে আসেন, মেসি সেখানে তাদের পরাস্ত করেন স্রেফ বুদ্ধিমত্তা, গতির সূক্ষ্ম পরিবর্তন ও দুর্দান্ত পায়ের শৈল্পিকতায়।
মাঠের ভেতরে যখন সাধারণ মানুষের দৃষ্টির সীমানার সমাপ্তি ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয় মেসির দূরদর্শিতা। মাঝমাঠ থেকে তার বাড়ানো ডিফেন্স-চেরা একেকটি পাস কিংবা বক্সের কোণ প্রান্ত থেকে নেওয়া বাঁ-পায়ের সেই চিরচেনা বাঁকানো ফ্রি-কিকগুলো প্রমাণ করে—মেসির কৃতিত্ব শুধু গোলে নয়, বরং অপ্রতিরোধ্যতায় আঁকা কোণ ক্যানভাস। যেখানে বলটাই হয়ে উঠে তার একমাত্র তুলি।
যেখানে ইতিহাস নিজেই মেসির পেছনে ছোটে
ফুটবল ইতিহাসে রেকর্ড বুক শব্দটাই যেন তৈরি হয়েছে পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি উচ্চতার এই মানুষটির শ্রেষ্ঠত্বকে প্রমাণ করার জন্য। আটটি ট্রফিতে মোড়ানো ব্যালন ডি’অর কিংবা অসংখ্য ইউরোপীয় গোল্ডেন বুটের কীর্তি তো অনেক আগেই পুরোনো হয়েছে; চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে মেসি নিজেকে নিয়ে গেছেন এমন এক উচ্চতায়, যেখানে পৌঁছানো বাকিদের জন্য একপ্রকার অসম্ভবই শুধু নয়, স্বপ্নও বটে।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে মাত্র ৯০ মিনিটে একাই চারটি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন এই মহাতারকা। বিশ্বকাপের ইতিহাসে পুরুষ ও নারী ফুটবল মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১৮টি গোলের বিশ্বরেকর্ড এখন তার পায়ে, যার পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চে সবচেয়ে বেশি ২৮টি ম্যাচ খেলা এবং সর্বোচ্চ ১৮টি জয় পাওয়ার অনন্য রেকর্ডও তারই দখলে। পাওলো মালদিনির রেকর্ড ভেঙে বিশ্বকাপের মাঠে সর্বোচ্চ ২,৪৮৯ মিনিট খেলার যে অতিমানবীয় কীর্তি মেসি গড়েছেন, তা এক কথায় অবিশ্বাস্য। ফুটবল দুনিয়ায় ইতিহাস যেখানে অন্য খেলোয়াড়দের তৈরি করে, লিও মেসির ক্ষেত্রে ইতিহাস নিজেই যেন তার পায়ে এসে লুটায়।

৩৯টি বসন্ত পেরিয়ে এসে লিও এখন ক্যারিয়ারের এমন এক গোধূলিলগ্নে দাঁড়িয়ে, যেখানে তার প্রতিটা ম্যাচই যেন একেকটি বোনাস, আর তাঁর পায়ের প্রতিটা স্পর্শ এক একটি দীর্ঘশ্বাসের উপহার। ফুটবল হয়তো আরও অনেক বিশ্বজয়ী তারকা দেখবে, মাঠ কাঁপানো অনেক গোলমেশিনও দেখবে। কিন্তু ১০ নম্বর জার্সি পিঠে জড়ানো এই জাদুকরের মতো কেউ কোনোদিন কোটি ভক্তের চোখ দিয়ে ঝরাতে পারবে না আনন্দের অশ্রু।
লিও ফুটবলকে যেমন দিয়েছেন, তেমনি মন ভরিয়েছেন তার ভক্তদের। তাদের কাছে এখন আর রেকর্ড দিয়ে ফুটবলের এই অতিমানবের বিচার হয় না। তারা মাঠের বাকি দিনগুলোতে দেখতে চায় স্রেফ মেসিম্যাজিক।
/এএ/এসআর