ক্লান্তি আর ইনজুরির বোঝা মাথায় নিয়ে শিরোপা ধরে রাখার মিশন আর্জেন্টিনার
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৪:৪৩ পিএম
লিওনেল স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা ফুটবল দল যেন এক অপরাজেয় শক্তি। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনটি বড় টুর্নামেন্ট খেলে তিনটিতেই ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছেন তিনি। যার মধ্যে রয়েছে ২০২১ ও ২০২৪ সালের ব্যাক-টু-ব্যাক কোপা আমেরিকা এবং মাঝখানে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সেই মহাকাব্যিক ট্রফি। ফুটবল ইতিহাসে প্রথম কোনো জাতীয় দলের দায়িত্ব নিয়ে এমন অতিমানবীয় রেকর্ড গড়ার নজির আর কারও নেই। তবে ফুটবল বিশ্ব ভালো করেই জানে, শিরোপা জেতার চেয়ে তা ধরে রাখা কতটা কঠিন।
১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে পেলের ব্রাজিলের পর আর কোনো দল টানা দুটি বিশ্বকাপ ঘরে তুলতে পারেনি। এমনকি একবিংশ শতাব্দীতে ফ্রান্স (২০০২), ইতালি (২০১০), স্পেন (২০১৪) এবং জার্মানি (২০১৮)-এর মতো ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা গ্রুপ পর্বেরই বৈতরণি পার হতে পারেনি। ৪৮ দলের নতুন ফরম্যাটে এবার আর্জেন্টিনার এমন বিপর্যয়ের ঝুঁকি কম থাকলেও, স্কালোনির আসল চ্যালেঞ্জ অন্য জায়গায়। আলবিসেলেস্তেদের নতুন প্রজন্মের মাঝে এক সফল রূপান্তর ঘটানোই এখন আর্জেন্টিনার প্রধান পরীক্ষা।
বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রথম ম্যাচে আগামীকাল সকালে আলজেরিয়ার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা। তবে এই ম্যাচে নামার আগে স্কালোনির কপালে চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের প্রধান তারকাদের অতিরিক্ত ম্যাচ খেলার ক্লান্তি। গত কয়েক বছর ধরে ঘরোয়া লিগ, আন্তর্জাতিক ম্যাচ এবং সবশেষ ক্লাব বিশ্বকাপের ধকল নিতে গিয়ে আলবিসেলেস্তেদের মূল ফুটবলারদের নানা জটিলতায় ভুগছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪-২৫ মৌসুমের শুরু থেকে এ পর্যন্ত মাঝমাঠের প্রাণ এনজো ফার্নান্দেজ এবং তারকা স্ট্রাইকার হুলিয়ান আলভারেজ ক্লাব ও দেশের হয়ে রেকর্ড ১২১টি করে ম্যাচ খেলে ফেলেছেন। অতিরিক্ত এই ম্যাচ খেলার ধকলেই মৌসুমের শেষ দিকে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের হয়ে অ্যাঙ্কেল ইনজুরিতে ভুগতে হয়েছে আলভারেজকে। ২৫ বছর বয়সী এনজো শারীরিকভাবে শতভাগ ফিট থাকলেও, এই দীর্ঘ পথ চলার ধকল তার ওপর যেকোনো সময় চড়াও হতে পারে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম অবশ্য আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। লিভারপুলের এই মিডফিল্ডার ক্লাব বিশ্বকাপে না খেললেও গত দুই মৌসুমে ১১৯টি ম্যাচ খেলে ফেলেছেন। যার স্পষ্ট প্রভাব দেখা গেছে প্রিমিয়ার লিগে তার সাম্প্রতিক ড্রপ ইনফর্মে। আগামীকাল আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার শুরুর একাদশে ম্যাক অ্যালিস্টারের থাকার কথা থাকলেও, স্কালোনি যে তাকে খুব বেশি সময় মাঠে রাখার ঝুঁকি নেবেন না, তা বলাই বাহুল্য। বিগত অর্ধদশক ধরে একসঙ্গে খেলার সুবাদে আর্জেন্টিনার বর্তমান স্কোয়াডটির মধ্যে এক অভেদ্য ও আত্মিক বন্ধন গড়ে উঠেছে, যা দলটিকে এনে দিয়েছে একের পর এক ঐতিহাসিক সাফল্য।
তবে মহাকাব্যের এই চূড়ান্ত মঞ্চে এসে ভয়টা এখন বয়স নিয়ে, যা টুর্নামেন্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের এই স্কোয়াডের গুরুত্বপূর্ণ ৯ জন ফুটবলারই ইতিমধ্যেই পেরিয়ে গেছেন ৩০-এর কোটা, যার মধ্যে এমিলিয়ানো মার্তিনেস, মাঝমাঠের ইঞ্জিন রদ্রিগো দে পল এবং রেকর্ড ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে নামা স্বয়ং লিওনেল মেসিও রয়েছেন—যিনি টুর্নামেন্ট চলাকালীনই পা রাখবেন ৩৯ বছর বয়সে।
অপরদিকে, অভিজ্ঞতার এই পাহাড়ের বিপরীতে তারুণ্য একেবারেই সীমিত। ফ্রাঙ্কো মাস্তান্তুওনো কিংবা আলেহান্দ্রো গারনাচোর মতো প্রতিভাবান তরুণদের স্কোয়াডে জায়গা না হওয়ায় হুলিয়ানো সিমিওনে, ভালেনতিন বার্কো এবং নিকো পাজকে নিয়ে মাত্র ৩ জন খেলোয়াড় আছেন যাদের বয়স ২৫ বছরের নিচে। পারফরম্যান্সে সামান্য ঘাটতি দেখলেই হয়তো বেঞ্চ থেকে তরুণদের মাঠে নামাতে বাধ্য হবেন আর্জেন্টাইন মাস্টারমাইন্ড।
ক্লান্তি আর ইনজুরির এই অদৃশ্য প্রতিপক্ষকে সামলে নিয়ে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা বিশ্বজয়ের এই নতুন মিশন কীভাবে শুরু করে, তা দেখতে মুখিয়ে আছে পুরো ফুটবল বিশ্ব।
/এএ