শরণার্থী শিবির থেকে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ দলে ইরানকুন্ডা, পেলেন গোল
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০১:২৬ পিএম
ফুটবল বিশ্বকাপ কেবল ট্রফি জয়ের লড়াই নয়, এটি কখনো কখনো জীবনযুদ্ধে হেরে না যাওয়া কিছু মানুষের বেঁচে থাকার এবং ঋণ শোধ করার এক অনন্য মঞ্চ। ২০২৬ বিশ্বকাপে আজ তুরস্কের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার ২-০ গোলের দুর্দান্ত জয়ের রাতটি ফুটবল ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে এক মহাকাব্যিক মানবিক গল্প হিসেবে। আফ্রিকার যুদ্ধবিগ্রহ ও সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়ে শরণার্থী শিবিরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বেড়ে ওঠা তিন ফুটবলার রোববার (১৪ জুন) সামলাচ্ছেন বিশ্বমঞ্চে অস্ট্রেলিয়ার আক্রমণভাগের দায়িত্ব।
মোহাম্মদ তুরে, নেস্তরি ইরানকুন্ডা এবং আওয়ার মাবিল—অস্ট্রেলিয়ার ৫ লাখ আফ্রিকান অভিবাসীর কাছে এই ত্রয়ী এখন স্রেফ ফুটবলার নন, তারা একেকজন মহাতারকা। রোববার (১৪ জুন) তুরস্কের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়েই বিশ্বকাপে অভিষেক হলো তুরে ও ইরানকুন্ডার, যেখানে ডাগআউটে ‘বড় ভাই’ হিসেবে তাদের আগলে রাখার দায়িত্বে ছিলেন কেনিয়ার শরণার্থী শিবিরে ১০টি বছর কাটানো অভিজ্ঞ আওয়ার মাবিল।
বুরুন্ডিয়ান বাবা-মায়ের সন্তান, ২০ বছর বয়সী নেস্তরি ইরানকুন্ডা পৃথিবীর আলো প্রথম দেখেছিলেন তানজানিয়ার এক শরণার্থী শিবিরে। আজ সেই শরণার্থী শিবিরের ছাইভস্ম থেকে উঠে এসে বিশ্বকাপের সবুজ গালিচায় অভিষেক ম্যাচেই ইতিহাস লিখলেন তিনি। ম্যাচের শুরু থেকেই তুরস্ক আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে অস্ট্রেলিয়াকে চেপে ধরার চেষ্টা করছিল। কিন্তু ম্যাচের ২৭ মিনিটে তুরস্কের আক্রমণ রুখে দিয়ে এক অবিশ্বাস্য পাল্টা আক্রমণে মেতে ওঠে অস্ট্রেলিয়া।
মাঝমাঠ থেকে ক্ষিপ্র গতিতে বল নিয়ে একাই ছিটকে যান নেস্তরি ইরানকুন্ডা। তুরস্কের রক্ষণভাগকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিখুঁত এক শটে বল জালে জড়িয়ে অস্ট্রেলিয়াকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন তিনি। এই এক গোলেই সার্থক হয় তার জীবনের দীর্ঘ লড়াই। গোল হজম করার পর সমতায় ফিরতে মরিয়া হয়ে ওঠে তুরস্ক।
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্থেও যখন তুরস্ক গোলের জন্য হন্যে হয়ে লড়ছিল, ঠিক তখনই আবারও পাল্টা আক্রমণের পুরোনো ও চেনা কৌশলে আঘাত হানে অস্ট্রেলিয়া। ম্যাচের ৭৫ মিনিটে গোলপোস্ট থেকে প্রায় ২০ গজ দূরে বল পান মিডফিল্ডার কনর মেটকাফ। দূরপাল্লার এক দর্শনীয় ও জাদুকরী শটে তুরস্কের গোলরক্ষককে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান তিনি। মেটকাফের এই দ্বিতীয় গোলে ২-০ ব্যবধানে লিড নিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় অস্ট্রেলিয়া। শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত তুরস্ক আপ্রাণ চেষ্টা করেও একবারের জন্যও অস্ট্রেলিয়ার জাল খুঁজে পায়নি। ফলে ইরানকুন্ডার স্বপ্নের অভিষেক আর মেটকাফের গোল উদযাপনে ৩ পয়েন্ট পকেটে পুরে মাঠ ছাড়ে অস্ট্রেলিয়া।
অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসীদের আবাসন সংকট ও সামাজিক সমস্যা নিয়ে যখন বিতর্ক তুঙ্গে, ঠিক তখনই এই তিন আফ্রিকান তরুণ ফুটবলারই হয়ে উঠেছেন অস্ট্রেলিয়ার নকআউট পর্বে যাওয়ার মূল ভরসা। লাইবেরিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে বেঁচে গিনির শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া ২২ বছর বয়সী স্ট্রাইকার মোহাম্মদ তুরে যেন পুরো আফ্রিকান অভিবাসী সম্প্রদায়ের মনের কথাই বললেন, অস্ট্রেলিয়া আমাদের বেঁচে থাকার সুযোগ করে দিয়েছে। দেশের হয়ে অবদান রাখাই হলো সেই ঋণ শোধ করার সেরা উপায়। আজ তুরস্ক বধের মাধ্যমে ইরানকুন্ডা-তুরেরা কেবল অস্ট্রেলিয়াকে ৩ পয়েন্টই এনে দেননি, বরং প্রমাণ করেছেন আশ্রয় দিলে শরণার্থীরাও বিশ্বমঞ্চে দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারে।
/এএ