ফাইল ছবি
ফুটবল স্রেফ ৯০ মিনিটের একটা খেলা নয়, এটি এখন চরম শারীরিক সক্ষমতা ও বিজ্ঞানের এক নিখুঁত মেলবন্ধন। ২০২৬ উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে প্রবর্তিত ফিফার ‘বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন ব্রেক’ নিয়ে যখন চারদিকে বাণিজ্য ও বিজ্ঞাপনের তুমুল বিতর্ক, তখন পর্দার আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে এর সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিকটি—যা হলো মাঠের আসল কুশীলব, অর্থাৎ ফুটবলারদের জীবন ও স্বাস্থ্যের সর্বোচ্চ সুরক্ষা।
উত্তর আমেরিকার তীব্র গরম ও আর্দ্রতার কথা বিবেচনা করে ফিফা যে ২২তম মিনিটের এই ৩ মিনিটের বিরতি বাধ্যতামূলক করেছে, তা আধুনিক স্পোর্টস সায়েন্স বা ক্রীড়া বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ক্লোজড-রুফ বা এসি স্টেডিয়াম হলেও ভেতরে হাজার হাজার দর্শকের উত্তাপে খেলোয়াড়দের শরীরে যে ‘হিট স্ট্রেস’ তৈরি হয়, তা মুহূর্তেই কমিয়ে আনতে এই ‘কুলিং ব্রেক’ এক জাদুকরী ওষুধ হিসেবে কাজ করছে।
ক্রীড়া চিকিৎসকদের মাধ্যমে জানা যায়, ফুটবলের মতো হাই-ইনটেনসিটি খেলায় অনবরত দৌড়ানোর ফলে খেলোয়াড়দের শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায়, যা পেশিতে টান, মাথা ঘোরানো বা ডিহাইড্রেশনের মতো মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। গত বছর ক্লাব বিশ্বকাপে এনজো ফার্নান্দেজদের মতো বিশ্বসেরা তারকারা মাঠে যেভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, তা ফুটবলারদের ক্যারিয়ারকে দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছিল।
২২ মিনিটের মাথায় এই ছোট্ট বিরতি খেলোয়াড়দের রিহাইড্রেট করার সুযোগ দিচ্ছে, যা তাদের ফুসফুস ও পেশিকে আবার সতেজ করে তোলে। এর ফলে ম্যাচের শেষ ৩০ মিনিটেও খেলোয়াড়রা তাদের সর্বোচ্চ গতি ও স্কিল ধরে রাখতে পারছেন, যা প্রকারান্তরে ফুটবলের মান ও প্রতিযোগিতার তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। চোটে পড়ে কোনো তারকার অকালে বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাওয়ার চেয়ে, ৩ মিনিটের একটা বিরতি দিয়ে তাদের মাঠে সুস্থ রাখাটা ফুটবলের সৌন্দর্যের জন্যই বেশি জরুরি।
ট্যাকটিক্যাল দিক থেকেও এই হাইড্রেশন ব্রেক কোচদের জন্য এক আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই মাঠের ফুটবলারদের সরাসরি ডেকে কৌশল বদলে দেওয়ার বা কোনো দুর্বলতা শুধরে নেওয়ার জন্য শিক্ষণীয় এক ‘টাইম-আউট’ হিসেবে কাজ করছে এই বিরতি। কেবল মার্কিন বাজারের বাণিজ্যিক সুবিধা নয়, বরং আধুনিক ফুটবলের গতি এবং ফুটবলারদের অতি-মানবিক পরিশ্রমের কথা মাথায় রাখলে, ফিফার এই সিদ্ধান্তকে ফুটবলারদের দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করার এক দুর্দান্ত ‘লাইফলাইন’।
তবে ফিফার এই বাধ্যতামূলক ৩ মিনিটের বিরতি ফুটবল ম্যাচের স্বাভাবিক গতি বা ‘মোমেন্টাম’ পুরোপুরি নষ্ট করে দিচ্ছে। যার প্রথম প্রমাণ মিলেছে উদ্বোধনী ম্যাচগুলোতে। দক্ষিণ কোরিয়া বনাম চেক প্রজাতন্ত্রের ম্যাচে প্রথমার্ধে যখন চেক দল কোরিয়াকে একের পর এক আক্রমণে চেপে ধরেছিল, ঠিক তখনই ২২ মিনিটের মাথায় রেফারি হাইড্রেশন ব্রেকের বাঁশি বাজান। ৩ মিনিটের এই আকস্মিক বিরতি চেকদের সেই আক্রমণের ধার এবং ম্যাচের মোমেন্টাম এক নিমেষে ধূলিসাৎ করে দেয়, যার সুবিধা পায় কোরিয়া।
/এএ