২০২৬ ওয়ার্ল্ড কাপ শুরু হতে আর মাত্র ৩দিন দশ ঘণ্টার মতো সময় বাকি। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডার যৌথ আয়োজনে পর্দা উঠছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফুটবল বিশ্বকাপের। বিশ্বসেরা সব ফুটবলাররা ইতিমধ্যেই আমেরিকায় পা রাখতে শুরু করেছেন। যেখানে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ফ্রান্স বা স্পেনের মতো পরাশক্তিদের লক্ষ্য কেবলই সোনালী ট্রফি উঁচিয়ে ধরা, সেখানে কিছু দল টুর্নামেন্টে নামছে কোনো চাপ ছাড়াই। ফুটবল বিশ্বের পরিভাষায় এদের বলা হয় ‘ডার্ক হর্স’ , যারা নিজেদের দিনে যেকোনো বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে বিদায় করে টুর্নামেন্টের সব হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দিতে ওস্তাদ।
নরওয়ে: হাল্যান্ড-ওডিগার্ডের 'চিট কোড'
১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরছে নরওয়ে। আর ফিরেই তারা বড় দলগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম। দলটির ডাগআউটে আছেন আর্লিং হালান্ডের মতো এক বিধ্বংসী 'চিট কোড', যিনি একাই যেকোনো রক্ষণভাগকে গুঁড়িয়ে দিতে পারেন। শুধু হালান্ড নন, মাঝমাঠে আর্সেনাল অধিনায়ক মার্টিন ওডিগার্ডের নিখুঁত পাসিং আর তরুণ অস্কার বব, আন্তোনিও নুসা ও জুলিয়ান রাইয়ারসনদের নিয়ে গড়া এই নরওয়ে দল এবার রীতিমতো উড়ছে। বাছাইপর্বে ইতালিকে দুবার হারিয়ে আসা স্টেল সোলবাকেনের এই দলটিকে নকআউট পর্বে কোনো পরাশক্তিই প্রতিপক্ষ হিসেবে পেতে চাইবে না।
কলম্বিয়া: লাতিন আমেরিকার অপ্রতিরোধ্য শক্তি
২০২৪ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে অতিরিক্ত সময়ের গোলে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল কলম্বিয়ার। কিন্তু সেই ধাক্কা কাটিয়ে লুইস দিয়াজের মতো বিশ্বমানের উইঙ্গার আর অভিজ্ঞ হামেস রদ্রিগেজের জাদুকরী বাঁ পায়ের ওপর ভর করে এবার বিশ্বজয়ের মঞ্চে দারুণ শক্তিশালী দল তারা। কলম্বিয়ার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো উত্তর আমেরিকার পরিচিত আবহাওয়া এবং মাঠে গ্যালারি কাঁপানো লাখো কলম্বিয়ান ভক্তদের বিশাল সমর্থন। পর্তুগালের গ্রুপে থাকা এই দলটি যদি গ্রুপ সেরা হতে পারে, তবে সেমিফাইনাল পর্যন্ত তাদের পথ আটকানো কঠিন হবে।
জাপান: সামুরাই-ব্লু
গত বিশ্বকাপে জার্মানি ও স্পেনকে হারিয়ে চমকে দেওয়া জাপান এবার আরও বেশি পরিপক্ব। বাছাইপর্বের ১৬ ম্যাচের মধ্যে ১৩টিতেই জিতে তারা মূল পর্বে এসেছে, যেখানে গোল খেয়েছে মাত্র ৩টি। সম্প্রতি ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচেও তারা নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে। রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক বিস্ময় বালক তাকেফুসো কুবোর সৃজনশীলতা আর ফেইনুর্ডের হয়ে লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া স্ট্রাইকার আয়াসে উয়েদার ক্ষুরধার ফর্ম জাপানের আক্রমণভাগকে এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। জাপানের হাই-প্রেসিং ফুটবলের সামনে যেকোনো বড় দল খেই হারিয়ে ফেলতে পারে।
মরক্কো: গতবারের রূপকথা কি এবারও
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে উঠে ফুটবল বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল মরক্কো। বিশ্লেষকদের মতে, এবারও তারা নতুন কোনো রূপকথা লিখতে পুরোপুরি প্রস্তুত। আশরাফ হাকিমি, ব্রাহিম দিয়াজ এবং বিলাল এল খানৌসের মতো বিশ্বমানের তারকাদের নিয়ে গড়া মরক্কো দলের প্রতিটি পজিশনেই রয়েছে দারুণ ভারসাম্য। কাতার বিশ্বকাপের সেই অদম্য মানসিকতা ধরে রাখতে পারলে এবারও বড় দলগুলোর স্বপ্নভঙ্গের কারণ হতে পারে আশরাফ হাকিমিরা।
সুইজারল্যান্ড ও সেনেগাল: এক্সপেরিইয়েন্স ভার্সেস স্পিড
ইউরোর কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডকে কাঁপিয়ে দেওয়া সুইজারল্যান্ড এবার বিশ্বকাপের নকআউট পর্বেও বড় চমক হতে পারে। কোট মুরাত ইয়াকিনের অধীনে এই সুইস স্কোয়াডে রয়েছে অভিজ্ঞতা ও ট্যাকটিক্যাল পরিপক্বতার দারুণ মিশ্রণ।
অন্যদিকে, আফ্রিকার শক্তি সেনেগালকে অনেকেই এবার হিসেবের বাইরে রাখছেন, কিন্তু সাদিও মানে, ইসমাইলা সার ও নিকোলাস জ্যাকসনদের নিয়ে গড়া তাদের আক্রমণভাগ যেকোনো দলের ডিফেন্সের জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্ক।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ‘ডার্ক হর্স’ বা আন্ডারডগ দলগুলোর পরাশক্তি বধের গল্প নতুন কিছু নয়। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে মরক্কোর অবিস্মরণীয় সেই জয় ; কেউ হিসেবের মধ্যে না রাখলেও নকআউট পর্বে একের পর এক লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালকে বিদায় করে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে পা রাখে তারা। একইভাবে ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়া ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়ে আর্জেন্টিনা সমৃদ্ধ গ্রুপ থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়ে একে একে ডেনমার্ক, স্বাগতিক রাশিয়া এবং সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে নকআউট করে ফাইনালে খেলেছিল।
এছাড়া ২০০২ বিশ্বকাপে সহ-স্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়ার কথা তো ফুটবল ভক্তরা কখনোই ভুলবেনা, যারা নকআউট পর্বের চরম নাটকীয়তায় ইতালি ও স্পেনের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দিয়ে সেমিফাইনালের টিকিট কেটেছিল। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, বিশ্বমঞ্চে ফেবারিটদের তকমা যতই ভারী হোক না কেন, আন্ডারডগদের নিখুঁত কৌশল আর অদম্য মানসিকতার সামনে যেকোনো পরাশক্তিই যেকোনো মুহূর্তে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে।
/এএ