×
Logo

খেলাধুলা

সোশ্যাল মিডিয়ায় চাকরির খোঁজে পোস্ট, ক্লাবে সপ্তাহে আয় ১৮ পাউন্ড, আজ স্কটিশদের নেতৃত্বে রবার্টসন

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০২:১৯ পিএম

সোশ্যাল মিডিয়ায় চাকরির খোঁজে পোস্ট, ক্লাবে সপ্তাহে আয় ১৮ পাউন্ড, আজ স্কটিশদের নেতৃত্বে রবার্টসন

অনেকেই বলে থাকেন রিয়েল লাইফে 'ফেয়ারি টেইল' হয় না। কিন্তু আসলেই কি তাই? যদি এক্স লিভারপুল লেফট ব্যাক এবং স্কটল্যান্ডের ক্যাপ্টেন অ্যান্ডি রবার্টসনের কাহিনী দেখা যায়, তাহলে ভক্তদের কাছে আসলেই মনে হবে রূপকথার গল্প বাস্তব জীবনেও হয়।


গল্প শুরুর আগে বলে নেওয়া ভালো যে, বিশ্বকাপের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। আর এবারের আসরে, ২৮ বছর পর আবারও ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে খেলতে যাচ্ছে স্কটল্যান্ড। আর সেই স্বপ্নযাত্রার কেন্দ্রবিন্দুতে একজন মানুষ—অ্যান্ডি রবার্টসন। অথচ একসময় এই মানুষটিই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাকরি খুঁজে বেড়াতেন।

গত বছরের নভেম্বরে, গ্রিস ও ডেনমার্কের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচের আগে তুরস্কে, স্কটল্যান্ডের ট্রেনিং ক্যাম্পে অ্যান্ডি রবার্টসন যেন ইংলিশ ব্রডকাস্টার ক্লাউডিয়া উইঙ্কলম্যানে পরিণত হলেন।

অধিনায়ক রবার্টসন দলের সব সদস্যদের জন্য খেলার উদ্দেশ্যে 'বিশ্বাসঘাতক' নামে একটি খেলার আয়োজন করেছিলেন, যেখানে ব্ল্যাকবোর্ড এবং ছোট ছোট চিপের ব্যবস্থা ছিল। নির্বাচিতদের প্রতি রাতে, তার ঘরে এসে ঠিক করতে হতো যে তারা কাকে 'হত্যা' করবে।

এরপর শুরু হলো বিশ্বাসঘাতকদের খুঁজে বের করার এক সপ্তাহব্যাপী অভিযান, যেখানে খেলোয়াড়রা তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় দুটি ম্যাচের প্রস্তুতিপর্বে নানা চ্যালেঞ্জ ও মজার কাণ্ডকারখানায় জড়িয়ে পড়ল। সপ্তাহজুড়ে চলা এই খেলায় মেতে ওঠেন স্কটল্যান্ডের ফুটবলাররা।

এটা ছিল শুধু একটি খেলা নয়। দলের মধ্যে বন্ধন গড়ে তোলা, চাপ কমানো এবং সবাইকে এক সুতোয় গাঁথার আরেকটি প্রচেষ্টা। আর সেখানেই ফুটে ওঠে অ্যান্ডি রবার্টসনের প্রকৃত পরিচয়: তিনি শুধু একজন ফুটবলার নন, একজন যোগ্য দলনেতা।

আজ ৩২ বছর বয়সী রবার্টসন, স্কটল্যান্ডকে ২৮ বছর পর, বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরিয়ে আনার নায়ক। কিন্তু তার গল্প শুরু হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা থেকে।

একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট করেছিলেন তিনি। সেখানে লিখেছিলেন, তার একটি চাকরি প্রয়োজন। বয়স তখন মাত্র ১৮। পকেটে টাকা নেই, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

এর কয়েক বছর আগেই তাকে ছেড়ে দিয়েছিল সেল্টিক এফসি। অনেকের কাছেই সেটি ছিল স্বপ্নভঙ্গের মুহূর্ত। কিন্তু রবার্টসন হাল ছাড়েননি। যোগ দেন অপেশাদার ক্লাব কুইন্স পার্ক এফসিতে। সপ্তাহে আয় করতেন মাত্র ১৮ পাউন্ড।

সেই টাকায় জীবন চলত না। তাই স্কটল্যান্ডের জাতীয় স্টেডিয়াম হ্যাম্পডেনে টিকিট অফিসে কাজ করেছেন। কখনও বুটরুমে দায়িত্ব পালন করেছেন। দিনে চাকরি, আর সুযোগ পেলেই ফুটবল—এভাবেই চলছিল তার জীবন।

কিন্তু ভাগ্য বদলাতে শুরু করে খুব দ্রুত। প্রথমে ডান্ডি ইউনাইটেড এফসি তারপর হাল সিটি এএফসি। এক বছরের ব্যবধানে স্কটিশ লিগ থেকে উঠে যান ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে। জাতীয় দলেও ডাক পান।

সেই সময়ই তার মধ্যে এমন কিছু দেখেছিলেন কোচরা, যা অন্যদের চোখে ধরা পড়েনি। সাবেক কোচদের মতে, রবার্টসনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল শেখার ক্ষমতা। নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে এলেই নিজেকে আরও উন্নত করতেন তিনি।

২০১৭ সালে লিভারপুলে যোগ দেন রবার্টসন। শুরুতে তাকে নিয়ে সংশয় ছিল। তৎকালীন কোচ ক্লপ মজা করে বলেছিলেন, আক্রমণে ভালো হলেও রক্ষণে তার অনেক উন্নতি প্রয়োজন।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি বদলে দেন সেই ধারণা। ডান প্রান্তে ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ড আর বাম প্রান্তে রবার্টসন—এই জুটি নতুন ইতিহাস গড়ে। একের পর এক অ্যাসিস্ট, শিরোপা আর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে বিশ্বের অন্যতম সেরা লেফট-ব্যাকে পরিণত হন তিনি।

লিভারপুলের হয়ে জেতেন দুটি প্রিমিয়ার লিগ ও একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। অনেক সমর্থক তাকে ক্লাবটির ইতিহাসের সেরা লেফট-ব্যাক বলেও মনে করেন।

তবে স্কটল্যান্ডের জার্সিতে তার গল্পটা অন্যরকম। জাতীয় দলের হয়ে তিনি কখনো সবচেয়ে বেশি গোল করা তারকা ছিলেন না। গ্যালারিতে বেশি উচ্চারিত হয়েছে স্কট ম্যাকটোমিনে কিংবা জন ম্যাকগিন-এর নাম। কিন্তু রবার্টসন ছিলেন দলের অন্যতম জেম। 

২০১৪ সালে অভিষেকের পর প্রায় এক যুগ ধরে জাতীয় দলের অপরিহার্য সদস্য তিনি। ৯৩ ম্যাচে গড়ে খেলেছেন ৮৪ মিনিটেরও বেশি। ইনজুরি বা বিশ্রাম; কোনো কিছুই যেন তাকে মাঠের বাইরে রাখতে পারেনি।

২০১৮ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে স্কটল্যান্ডের অধিনায়ক হন তিনি। এরপর দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচে নেতৃত্ব দেওয়া অধিনায়কে পরিণত হয়েছেন।

সতীর্থরা বলেন, রবার্টসনের সবচেয়ে বড় গুণ হলো মানুষকে আপন করে নেওয়া। তিনি যেমন খারাপ খেললে সতীর্থকে ধমক দিতে পারেন, তেমনি নতুন খেলোয়াড়দের পাশে দাঁড়াতেও এক মুহূর্ত দেরি করেন না।

স্কটল্যান্ড দলে এখন একটি বিশেষ রীতি চালু হয়েছে। কেউ প্রথম ম্যাচ খেললে বা কোনো মাইলফলক স্পর্শ করলে তাকে স্মারক জার্সি দেওয়া হয়। দলের সাফল্যকে একসঙ্গে উদযাপন করার এই সংস্কৃতির পেছনেও রয়েছে রবার্টসনসহ সিনিয়রদের ভূমিকা।

তার সতীর্থরা বলেন, ড্রেসিংরুমে তিনি শুধু অধিনায়ক নন, দলের প্রাণভোমরা। হাসি-ঠাট্টা, গল্প আর ইতিবাচক শক্তিতে সবাইকে 'এক' রাখেন তিনি।

হয়তো সে কারণেই বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত হওয়ার পর রবার্টসনের কণ্ঠে আবেগ ঝরে পড়েছিল।

তিনি বলেছিলেন, ‘এই ছেলেদের সঙ্গে আমি ১০-১১ বছর বয়স থেকে বড় হয়েছি। জন ম্যাকগিন, কেনি ম্যাকলিন, রায়ান ক্রিস্টি—এরা শুধু সতীর্থ নয়, আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। তাদের সঙ্গে বিশ্বকাপে যাওয়া অবিশ্বাস্য এক অনুভূতি।’

একসময় যে তরুণ সামাজিক মাধ্যমে চাকরির খোঁজ করেছিলেন, তিনিই এখন স্কটিশদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। যে তরুণ হ্যাম্পডেন স্টেডিয়ামের টিকিট অফিসে ফোন ধরতেন, সেই মানুষটিই ১৪ বছর পর একই স্টেডিয়ামকে সাক্ষী রেখে স্কটল্যান্ডের বিশ্বকাপের স্বপ্ন পূরণ করেছেন।

ফুটবলে অনেক সাফল্যের গল্প আছে। কিন্তু দারিদ্র্য, প্রত্যাখ্যান, সংগ্রাম আর অদম্য বিশ্বাসকে সঙ্গে নিয়ে অ্যান্ডি রবার্টসনের যে পথচলা, সেটি সত্যিই রূপকথার মতো।

/এআই 


Logo