ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আজই আমার শেষ দিন: নাছির
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪২ পিএম
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আজই দায়িত্ব পালনের শেষ দিন বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির। বিদায় লগ্নে শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে নিজের ফেসবুক আইডিতে দীর্ঘ স্ট্যাটাসে তিনি এ কথা জানান।
নাছির লিখেছেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের আজ শেষ দিন। একটি দীর্ঘ, কঠিন, ঘটনাবহুল এবং একই সঙ্গে গৌরবের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে। বিদায়ের এই মুহূর্তে স্বাভাবিকভাবেই চোখের সামনে ভেসে উঠছে অসংখ্য স্মৃতি-সংগ্রাম, সাফল্য, ব্যর্থতা, আনন্দ, বেদনা এবং সবচেয়ে বেশি করে আমার সহযোদ্ধাদের ভালোবাসা।
'নোয়াখালীর সুবর্ণচরের সন্তান হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে এসে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম। তখন হয়তো ভাবিনি, একদিন এই সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করার দুর্লভ সুযোগ আমার জীবনে আসবে। কিন্তু রাজনীতি কখনো শুধু পদ-পদবির বিষয় নয়; এটি মানুষের জন্য কাজ করার, সংকটে পাশে দাঁড়ানোর এবং নিজের বিশ্বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকার এক দীর্ঘ যাত্রা। সেই যাত্রায় ছাত্রদল আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে'— যোগ করেন তিনি।
এক-এগারো থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমল পেরিয়ে বর্তমানে দাঁড়িয়ে নাছির স্মরণ করেছেন অতীতকে— তার ছাত্ররাজনীতির দীর্ঘ যাত্রা সহজ ছিল না উল্লেখ করে বলেন, এই সময়ে যারা গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, সেই সকল নেতাকর্মীকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। তাদের ত্যাগই আমাদের আজকের শক্ত অবস্থানের ভিত গড়ে দিয়েছে।
ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক জানান, তার রাজনৈতিক জীবনের সার্বক্ষণিক অনুপ্রেরণা ছিল প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।
ফেসবুক স্ট্যাটাসে নাছির আরও লিখেছেন, '২০২৪ সালের পহেলা মার্চ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আমরা একটি কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে পথ চলেছি। কিন্তু আমাদের সময়ের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় ছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট। সেই উত্তাল সময়ে নেতাকর্মীদের রাজপথে সক্রিয় রাখা, তাদের সাহস জোগানো, সংগঠনের প্রতিটি স্তরকে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা— এটাই ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
জুলাই-আগস্টের সেই আন্দোলনে ছাত্রদলের অসংখ্য নেতাকর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে থেকেছেন। ঢাকার পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়, পাঁচ কলেজ এবং চার মহানগরের তৎকালীন নেতৃত্ব অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের প্রত্যেকের প্রতি আমার ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা। তাদের অনেকের নাম হয়তো ইতিহাসের পাতায় লেখা হবে না, কিন্তু একটি গণআন্দোলনের ইতিহাস কখনো শুধু কয়েকজন মানুষের নাম লিখে শেষ হয়ে যায় না। এর পেছনে থাকে হাজারো পরিচয়হীন, নির্ভীক ও দুঃসাহসিক তরুণের ত্যাগ।
এই আন্দোলনের সময়ে নাহিদ, আসিফ, হাসনাত, সারজিস, কাদের, মাহিন, রিফাত রশিদ ও হান্নান মাসুদের সঙ্গে অসাধারণভাবে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। আন্দোলনের সময়ে তারা ছাত্রদলকে অসম্ভব গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছে। পরবর্তীতে রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে হয়তো ছাত্রদলের অবদান তারা সবসময় সমানভাবে স্বীকার করতে পারেনি; কিন্তু আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। কারণ, সংকটের সময়ে যারা একসঙ্গে কাজ করেছে, ইতিহাসের বিচারে সেই সহযোগিতার মূল্য অপরিসীম।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের পরপরই নোয়াখালী-ফেনী অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আমি যেহেতু ওই এলাকার সন্তান, সেই সময় খালেদা জিয়া আমাকে বলেছিলেন, “তুমি ওই এলাকার সন্তান হিসেবে দ্রুত বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াও। আমি তারেককে বলবো তোমাকে যেন তাড়াতাড়ি ফেনীতে পাঠায়।”
সেদিন রাতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (তৎকালীন) তারেক রহমান আমাকে ফোন করে বলেছিলেন, “আম্মা তোমাকে দ্রুত ফেনী গিয়ে বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বলেছেন।”
নির্দেশনা পাওয়ার পরপরই সেদিন রাতেই ফেনীর উদ্দেশে রওনা হয়ে যাই। দুই দিন পর আমাদের রাকিব ভাইসহ সুপার ফাইভের বাকি নেতৃবৃন্দও ফেনীসহ বৃহত্তর নোয়াখালীতে ছুটে আসেন। আমরা তখন বুঝেছি, রাজনীতি শুধু মিছিল-মিটিংয়ের বিষয় নয়; মানুষের দুর্দিনে তাদের পাশে দাঁড়ানোই রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরিচয়।
খালেদা জিয়ার সেই নির্দেশ আমার কাছে শুধু একজন নেত্রীর নির্দেশ ছিল না; এটি ছিল আপন সন্তানের প্রতি অসহায় বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান। শারীরিকভাবে তিনি আমাদের সঙ্গে ছিলেন না, কিন্তু তার সেই নির্দেশ, তার মমতা এবং মানুষের প্রতি তার দায়বদ্ধতা আমাদের পথ দেখিয়েছে। দেশনেত্রীর প্রতি আমার অন্তরের গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
এই দীর্ঘ দায়িত্বকালে আমাদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের আরেকটি কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সেটা হলো মব সংস্কৃতি। চারদিকে নানা ধরনের প্রচারণা, অপপ্রচার, বিভ্রান্তি এবং রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও ছাত্রদলকে রাজপথে সক্রিয় রাখা সহজ ছিলো না। সব প্রোপাগান্ডা কাটিয়ে সংগঠনের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ নিশ্চিত করা ছিল প্রতিনিয়ত বড় একটি চ্যালেঞ্জ। আমাদের দায়িত্ব পালনের সময়ে প্রায় দুই হাজারেরও বেশি সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়েছে। এটি কোনো একজনের কৃতিত্ব নয়; এটি ছাত্রদলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সম্মিলিত পরিশ্রমের ফল।
তবে আমাদের কিছু অপূর্ণতাও আছে। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অল্প কয়েকটি কমিটি আমরা সম্পন্ন করতে পারিনি। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত অংশ সম্পন্ন করতে না পারার আক্ষেপ আমার থাকবে। এই অপূর্ণতার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।
যারা কমিটি গঠনের মাধ্যমে দায়িত্ব পেয়েছেন, তাদের অনেকেই অবশ্যই যোগ্য ছিলেন এবং তাদের যোগ্যতার স্বীকৃতিই তারা পেয়েছেন। কিন্তু একই সঙ্গে এমন অনেক সহযোদ্ধাও আছেন, যারা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদক হতে পারেননি। তাদের প্রতি আমার আন্তরিক সমবেদনা ও শ্রদ্ধা। একটি পদ কারও যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি নয়। যারা এক কমিটিতে দায়িত্ব পাননি, তাদের অনেকেই আগামী দিনের নেতৃত্বে আরও বড় ভূমিকা রাখবেন, এই বিশ্বাস আমার আছে। তাদের জন্য রইল উজ্জ্বল আগামীর শুভকামনা।
আর একটি বিষয় আমাকে আজও পীড়া দেয়— ছাত্রসংসদ নির্বাচনে আমাদের প্রত্যাশিত ফলাফল না পাওয়া। একজন সংগঠক হিসেবে এই ফলাফল আমাকে প্রায়ই ভাবিয়েছে। কোথায় আমাদের ঘাটতি ছিল, কোথায় আরও ভালো করা যেত— এসব প্রশ্ন নিজের কাছে করেছি। রাজনীতিতে পরাজয়ও শিক্ষা দেয়। আমি বিশ্বাস করি, ছাত্রদল এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী, আরও গ্রহণযোগ্য এবং আরও সংগঠিত ছাত্রসংগঠন হয়ে উঠবে।
আমার এই দায়িত্ব পালনের পথে যারা পাশে ছিলেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা আমার জানা নেই।'
সহযোদ্ধাদের উদ্দেশে ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক বলেন, আমরা হয়তো সবকিছু নিখুঁতভাবে করতে পারিনি। ভুল হয়েছে, সীমাবদ্ধতা ছিল, কখনো সিদ্ধান্তে ঘাটতি ছিল। কিন্তু একটি বিষয়ে আমি অন্তত নিজের কাছে পরিষ্কার— ছাত্রদলের স্বার্থের বাইরে গিয়ে কাজ করার ইচ্ছা আমার কখনো ছিল না। আজ দায়িত্ব থেকে বিদায় নিচ্ছি, কিন্তু ছাত্রদল থেকে নয়। পদ থেকে বিদায় নেওয়া যায়; আদর্শ থেকে নয়, ভালোবাসা থেকে নয়, সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে নয়।
ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্বের প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা এবং তাদের প্রয়োজন হলে পাশে থাকার কথা জানান তিনি। রাজনৈতিক জীবনে ছাত্রদল যে পরিচয় তা কোনো পদ দিয়ে মাপা যায় না বলেও স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন নাছির।
/এমএন