কেন আমরা চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাই?
মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩২ পিএম
ছবি: এআই জেনারেটেড
একজন রোগী যখন চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি শুধু একটি বিমানের টিকিট কাটেন না। তিনি সাধারণত সঙ্গে করে নিয়ে যান দুটি প্রশ্ন। একটি, দেশে তার ঠিকঠাক চিকিৎসা কেন হলো না? আর দ্বিতীয়টি বাইরে গেলেই বা সব ঠিকঠাক হবে কিনা?
আমার দৃষ্টিতে, বাংলাদেশের মানুষের বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতাকে শুধু 'দেশের চিকিৎসা ভালো নয়' বলে ব্যাখ্যা করলে বিষয়টির বড় একটি অংশ বাদ পড়ে যায়। কারণ মানুষ বিদেশে যান নানা কারণে। কেউ জটিল রোগের চিকিৎসা খুঁজতে যান, কেউ নির্ভুল রোগ নির্ণয়ের নিশ্চয়তা চান, কেউ উন্নত প্রযুক্তির ওপর আস্থা রাখেন, কেউ পরিচিতজনের অভিজ্ঞতা অনুসরণ করেন, আবার কেউ দেশে চিকিৎসা করানোর পরও কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে অন্য দেশের দিকে তাকান। অর্থাৎ বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে শুধু চিকিৎসা নয়, আস্থাও একটি বড় বিষয়।
ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৪ লাখ ৮২ হাজারের বেশি বাংলাদেশি মেডিকেল ভিসায় ভারতে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলেন। এই সংখ্যা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—মানুষ দেশের বাইরে গিয়ে আসলে কী খুঁজছেন?
আমার কাছে প্রথম উত্তরটি হলো—নিশ্চয়তা। একজন রোগী যখন জটিল কোনো রোগের কথা শুনছেন, তখন তার সবচেয়ে বড় ভয় অনেক সময় চিকিৎসা নয়; ভুল সিদ্ধান্তের ভয়। রোগ নির্ণয় সঠিক তো? চিকিৎসা সঠিক তো? আর কোনো বিকল্প আছে কি? অন্য কোনো বিশেষজ্ঞের মতামত প্রয়োজন কি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি তিনি দেশে পরিষ্কারভাবে পান, তাহলে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্তও হয়তো অন্যভাবে বিবেচনা করতে পারেন।
এখানে আমাদের একটি বিষয় বুঝতে হবে। রোগীর আস্থা শুধু চিকিৎসকের ডিগ্রি বা হাসপাতালের প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি হয় না। রোগী কীভাবে তার সমস্যা ব্যাখ্যা করতে পারছেন, চিকিৎসক তাকে কতটা সময় দিয়ে শুনছেন, চিকিৎসার বিকল্প কতটা পরিষ্কারভাবে বোঝানো হচ্ছে, রিপোর্ট সম্পর্কে তার প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাচ্ছে কি না—এসব ছোট ছোট অভিজ্ঞতাও আস্থার অংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবাকে শুধু অবকাঠামো বা প্রযুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; কার্যকর, নিরাপদ, মানুষকেন্দ্রিক, সময়মতো এবং সমন্বিত সেবাকে এর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করেছে।
একটি হাসপাতালে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি থাকতে পারে। কিন্তু রোগী যদি না জানেন সেই প্রযুক্তি তার চিকিৎসায় কীভাবে কাজে লাগছে, তাহলে সেটি তার কাছে খুব বেশি অর্থ বহন নাও করতে পারে। আবার একটি হাসপাতালের চিকিৎসা সক্ষমতা ভালো হলেও যদি অ্যাপয়েন্টমেন্ট, তথ্য, যোগাযোগ কিংবা চিকিৎসার বিভিন্ন ধাপের মধ্যে সমন্বয় জটিল হয়, রোগীর আস্থায় তার প্রভাব পড়তে পারে। তাই বিদেশমুখিতা কমানোর আলোচনা করতে গেলে শুধু 'দেশে আরও যন্ত্রপাতি আনতে হবে'—এখানেই থেমে গেলে হবে না। আমাদের দেখতে হবে পুরো রোগীর যাত্রা। রোগী প্রথম কোথায় তথ্য পেলেন? কীভাবে চিকিৎসক নির্বাচন করলেন? রোগ নির্ণয় কতটা পরিষ্কার হলো? দ্বিতীয় মতামতের সুযোগ পেলেন কি? চিকিৎসার বিকল্পগুলো বুঝতে পারলেন কি? চিকিৎসার খরচ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ধারণা পেলেন কি? চিকিৎসার পর ফলোআপ কীভাবে হবে, সেটি জানলেন কি? এই প্রতিটি প্রশ্নই রোগীর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক সময়ে সঠিক বিশেষজ্ঞের কাছে পৌঁছানো। একজন রোগী যদি তার স্থানীয় চিকিৎসকের কাছ থেকে সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞের কাছে পৌঁছাতে পারেন, তাহলে চিকিৎসার পথ অনেক সহজ হতে পারে। কিন্তু একজন রোগী যদি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরতে থাকেন, বারবার পরীক্ষা করান এবং তবুও পরিষ্কার রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসা পরিকল্পনা না পান, তখন বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। অর্থাৎ শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু ভালো হাসপাতাল তৈরি করে না; এটি রোগীকে সঠিক জায়গায় পৌঁছানোর পথও সহজ করে।
বিদেশে চিকিৎসার আরেকটি বড় কারণ হলো মানুষের ধারণা—'ওখানে সবকিছু আরও আধুনিক।' এই ধারণার কিছু বাস্তব ভিত্তি থাকতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন কিছু অত্যন্ত বিশেষায়িত চিকিৎসা ও প্রযুক্তি রয়েছে, যা সব দেশে সমানভাবে পাওয়া যায় না। কিছু জটিল রোগের ক্ষেত্রে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া সত্যিই প্রয়োজন হতে পারে। তাই দেশের চিকিৎসার সক্ষমতা নিয়ে বাস্তবতার বাইরে গিয়ে দাবি করা ঠিক হবে না।
কিন্তু একই সঙ্গে এটিও ঠিক নয় যে বিদেশে গেলেই চিকিৎসা ভালো হবে। চিকিৎসার মান নির্ভর করে রোগের ধরন, চিকিৎসার প্রয়োজন, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের দক্ষতা, প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি এবং চিকিৎসা-পরবর্তী ধারাবাহিকতার ওপর।
সুতরাং 'দেশ না বিদেশ'—এই দ্বৈত প্রশ্নের চেয়ে ভালো প্রশ্ন হলো—'আমার প্রয়োজন অনুযায়ী কোথায় সবচেয়ে উপযুক্ত চিকিৎসা পাওয়া যাবে?' এই দৃষ্টিভঙ্গি রোগীর সিদ্ধান্তকে আরও বাস্তবসম্মত করতে পারে। কোনো চিকিৎসা দেশে ভালোভাবে পাওয়া গেলে শুধু বিদেশে করালেই সেটি ভালো হবে—এমন ধারণার প্রয়োজন নেই। আবার কোনো নির্দিষ্ট জটিলতার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন হলে সেটিও চিকিৎসকের পরামর্শ ও যথাযথ তথ্যের ভিত্তিতে বিবেচনা করা উচিত।
আমার কাছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের সবচেয়ে বড় সুযোগ এখানেই। আমাদের শুধু চিকিৎসার সক্ষমতা তৈরি করলে হবে না; সেই সক্ষমতা সম্পর্কে মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য তথ্যও পৌঁছে দিতে হবে। কোন চিকিৎসা দেশে পাওয়া যায়? কোন ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন? কখন দ্বিতীয় মতামত নেওয়া যেতে পারে? কোন ক্ষেত্রে বিদেশে চিকিৎসা বিবেচনা করা যুক্তিযুক্ত? আর কোন ক্ষেত্রে দেশে চিকিৎসাই বাস্তবসম্মত বিকল্প? এসব প্রশ্নের উত্তর যদি রোগী নির্ভরযোগ্যভাবে পান, তাহলে তার সিদ্ধান্তও আরও তথ্যভিত্তিক হবে।
এখানে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগেরও একটি বড় দায়িত্ব আছে। শুধু 'আমাদের কাছে কী আছে' বললেই হবে না। মানুষকে বুঝতে সাহায্য করতে হবে—কোন পরিস্থিতিতে কোন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন, চিকিৎসার সম্ভাব্য পথ কী এবং কখন অন্য কোথাও চিকিৎসা নেওয়ার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। কারণ স্বাস্থ্যসেবায় তথ্যের মূল্য শুধু তার পরিমাণে নয়; তথ্য কতটা সঠিক, সহজবোধ্য এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য কার্যকর—সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। WHO-ও রোগীর অভিজ্ঞতা ও মতামতকে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে বিবেচনা করে।
চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার আরেকটি বাস্তব দিকও আছে। বিদেশে গেলে ভ্রমণ, থাকা, পরিবারের সদস্যের সঙ্গে যাওয়া, ভিসা, অর্থের ব্যবস্থা, ভাষা এবং চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে ফলোআপ—সবকিছুই চিকিৎসাযাত্রার অংশ হয়ে যায়। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ক্ষেত্রে দেশে ফিরে আসার পর চিকিৎসার ধারাবাহিকতা কীভাবে বজায় থাকবে, সেটিও আগে ভাবা প্রয়োজন। কারণ চিকিৎসা শুরু করার পর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও পরবর্তী চিকিৎসার সমন্বয় অনেক সময় চিকিৎসারই গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
আমার দৃষ্টিতে, বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্তকে তাই দেশ বনাম বিদেশের বিতর্কে আটকে রাখা উচিত নয়। একজন রোগীর সামনে থাকা বাস্তব বিকল্পগুলো বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। যদি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেশে পাওয়া যায়, তাহলে বিদেশে যাওয়াই ভালো—এমন কোনো স্বাভাবিক নিয়ম নেই। আবার কোনো নির্দিষ্ট জটিলতার জন্য বিদেশে যাওয়া প্রয়োজন হলে সেটিও স্বাভাবিকভাবেই বিবেচনা করা যেতে পারে।
আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ শুধু নতুন হাসপাতাল বা নতুন প্রযুক্তি তৈরির মধ্যে নয়। আমাদের এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে মানুষ বিশ্বাস করার মতো কারণ পাবেন। যেখানে রোগী জানবেন তার রোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য কোথায় পাওয়া যাবে, কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে, কখন দ্বিতীয় মতামত প্রয়োজন হতে পারে এবং তার চিকিৎসার জন্য সামনে কী কী বাস্তব পথ খোলা আছে।
কারণ একজন রোগী যখন দেশের বাইরে যাওয়ার কথা ভাবেন, তখন তিনি শুধু অন্য একটি দেশের চিকিৎসা খুঁজছেন না। অনেক সময় তিনি খুঁজছেন নিশ্চয়তা, আস্থা, স্পষ্টতা এবং নিজের চিকিৎসার জন্য একটি নিরাপদ পথ। আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা যদি এই বিষয়গুলো দেশের মাটিতেই আরও শক্তভাবে দিতে পারে, তাহলে রোগীর সিদ্ধান্তও আরও তথ্যভিত্তিক হতে পারে।
বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া কারও জন্য প্রয়োজনীয় হতে পারে, আবার কারও জন্য তা প্রয়োজন নাও হতে পারে। তাই সঠিক সিদ্ধান্তের শুরু বিদেশ যাওয়ার টিকিট দিয়ে নয়; শুরু হওয়া উচিত একটি সহজ প্রশ্ন দিয়ে—'আমার চিকিৎসার জন্য সত্যিই কোথায় যাওয়া প্রয়োজন?'
এই প্রশ্নের উত্তর যত তথ্যভিত্তিক হবে, রোগীর সিদ্ধান্তও তত বেশি সচেতন হবে।
(লেখক: হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর, এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম)
/এমএমএইচ