সরকার বাহাদুর,
শৈশবে যখন থেকে আমি বুঝতে শুরু করেছি, তখন থেকেই রাজধানীর মিরপুরে আমার বসবাস। ১৯৮৮ সালের বন্যার সময় থেকে এ জনপদের বহু পরিবর্তন-বিবর্তনের কথা স্পষ্ট মনে আছে আমার। কেবল একটা বিষয় পরিবর্তন হতে দেখি নাই; ছোটবেলায় আমাকেও রাড্ডায় নিয়ে যাওয়া হতো আর ২০১১ সালে প্রথম সন্তানের বাবা হওয়ার পর থেকে আমারও গন্তব্য রাড্ডা, ১০ নম্বর আর ১ নম্বর দুই শাখাই।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে অবিশ্বাস্য ভাঙচুরের খবর দেখার পর থেকেই তাই মনটা বিষণ্ণ। মনে হচ্ছিল, নানা উপায়ে উপকার গ্রহণের পর এই হামলার প্রতিবাদ না জানানো অকৃতজ্ঞতা। কিন্তু পিএইচডি পড়ালেখার এমন চাপ, ছুটির দিন ছাড়া দম ফেলার সময়ও বের করা কঠিন। রোববার সকালে যখন লেখার ফুরসত হলো, ততোক্ষণে মিরপুরে আরও ভাঙচুর হয়ে গেছে। আদাবরে বাড়ি দখলচেষ্টার ভিডিও এলো ফেসবুক ফিডে। রাড্ডার সংবাদ পড়েছিলাম বলেই হয়তো অ্যালগরিদমের কল্যাণে আরও অনেক হামলা-হুমকির খবর দেখতে হচ্ছে। দেশে নাই বলে, অনলাইন জগত যা দেখাচ্ছে-জানাচ্ছে, তাতে ভরসা করা ছাড়াও উপায় নাই।
শ্রদ্ধেয় রাজনীতিবিদগণ,
নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তের এলাকায় থাকতাম বলে এখন যাদের 'ছাপড়ি' বলা হয়, তেমন রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দেখার অভিজ্ঞতাই বেশি হয়েছে। চাঁদাবাজি, দখলবাজি, চাঁদার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে মারামারি আর সমাবেশ-মহাসমাবেশে লোক সাপ্লাই; মোটাদাগে মিরপুরের রাজনীতি এগুলোই। বড় হয়ে বুঝেছি, কেবল মিরপুর না, সারাদেশেই রাজনীতি এর বাইরে কিছু না। একে খুব অন্যায় বলারও সুযোগ নাই। আমাদের মতো অর্থনীতির দেশে লোকে রাজনীতিতে এসে পয়সা বানায়, আর উন্নত অর্থনীতির দেশে পয়সা বানানোর পর রাজনীতিতে আসে– রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা অনেক আগেই এই প্রবণতা শনাক্ত করেছেন। এ নিয়তি আমরা মেনেও নিয়েছি। দুর্নীতি সরাসরি জনগণের পেটে লাথি মারা অবধি আমরা আপত্তি জানাই না।
প্রিয় বিএনপি,
রাজনীতি আর রাজনীতিবিদ সম্পর্কে আমার বিশ্বাসে কিছুটা পরিবর্তন আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর। তখন বিএনপি ক্ষমতায়। ২০০৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিকতা শুরু করলাম; সাংবাদিকতার সূত্রে এমাজউদ্দিন স্যার, ইয়াজউদ্দিন স্যার, ইউজিসি চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান স্যার, ভিসি ফায়েজ স্যার, প্রো-ভিসি ইউসুফ হায়দার স্যার, তাজমেরি ম্যাডাম, প্রক্টর ফিরোজ স্যারসহ বিএনপি-নেতা প্রফেসরদের সাথে ঘনিষ্ঠতা হলে টের পেলাম, ক্ষমতার রাজনীতি কেবল 'খাই খাই' চরিত্রের না। লাল্টু ভাই, হেলাল ভাই, বাবু ভাই, নয়ন ভাই, সেলিম ভাই, সফরী ভাই, হাসান মামুন ভাই, ফিরোজ ভাই, দুলাল ভাই, আকরাম ভাইদের মতো তখনকার ছাত্রদল শীর্ষ নেতাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা হলে বুঝলাম, কেবল 'ছ্যাপড়া'রা না, ভদ্রলোকেরাও রাজনীতি করে এবং সে সংখ্যা খুব কম নয়।
আমি বরাবরই মনে করি, বিএনপিতে ভদ্রলোকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। যাদের আমি বলি 'দলের মাথা'। ছাত্র থাকা অবস্থায়ই মাথা আর লেজের বিভাজন স্পষ্ট বুঝে গিয়েছিলাম। একদিকে যেমন ভদ্রলোক 'মাথা' পেয়েছি, তেমনি হলের দখলবাজ, গেস্টরুম-লিডার 'লেজ'ও পেয়েছি। অবাক হতাম, একই দল করে এমন আলাদা চরিত্র কীভাবে হয়! মিরপুরে যেসব নেতাকর্মীদের দেখেছি, সেখানেও মাথা আর লেজের বিভাজন প্রকট। জাতির দুর্ভাগ্য, বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার পর দেখা যাচ্ছে, মাথার তুলনায় লেজই বেশি দৃশ্যমান আর প্রভাবশালী। এলাকায় এলাকায় বিএনপিকর্মীরা বহু বছর ক্ষুধার্ত, এখন যেকোনো মূল্যে তাদের খাবার চাই। তার সাথে জুটেছে, রং বদলানো সুবিধাবাজ বদমায়েশ গোষ্ঠী। নিত্যনতুন 'লেজ' গজাচ্ছে দলের। আমার অনেক বন্ধুবান্ধব, পরিচিতজন মিরপুরে বিএনপির রাজনীতি করে। ক্ষমতার গরমে কেউ কেউ কতোটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, প্রতিদিন টের পাই।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ থাকে না। একের পর এক অভিযোগ অস্বীকার করে, বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দিয়ে, ভিক্টিম-ব্লেমিং করে, শুভাকাঙ্ক্ষীদের (!) দিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করিয়ে আদতে কোনো লাভ হয় না। কেউ দাবি করছে না যে, দলের নেতাকর্মীদের অপকর্মের নির্দেশদাতা আপনি। তবে বিএনপির কারও প্রশ্রয় ছাড়া এই আমলে দখলবাজি-চাঁদাবাজি হচ্ছে, এ কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। অপকর্ম বন্ধ না হলে, দোষী বিএনপি নেতাদের (তা সে যতোই প্রভাবশালী হোক) বিচার না হলে দুটি পারসেপশন তৈরি হবে— হয় আপনি অপকর্মে প্রশ্রয় দিচ্ছেন, নয়তো আপনি অপকর্ম বন্ধে ব্যর্থ। দুটোর কোনোটিই আপনার জন্য উপকারী না।
বিএনপি বড় দল হিসেবে লম্বা লেজ থাকবে, হয়তো দরকারও আছে। কিন্তু সমস্যা হলো, লেজ মাথা নাড়ানোর মতো শক্তিশালী হয়ে উঠলো কিনা। দলের 'মাথা'রা যদি দুষ্ট 'লেজ' নেতাদের বাঁচাতে আদাজল খেয়ে নামেন, বাস্তবতা না দেখে 'লেজ'-এর বয়ান ধারণ করেন, তখন 'মাথা'র অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। যতো দ্রুত লেজকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেন, ততোই ভালো।
লেখক: সাংবাদিক, শিক্ষক ও পিএইচডি গবেষক
/এএম