⚫ সাইফুর রাব্বি
আর কত সহিব জ্বালা, সহে না লো ঝিঙা ফুল,
ঘণ্টাটা কলিজায় মারে বাড়ি।
চা বাগানে জন্ম নেওয়া সুনীল বিশ্বাস এভাবেই সুরের গাঁথুনিতে চা শ্রমিকের দুঃখ কথা তুলে ধরেন। বর্নিল সমাজের চাকচিক্যের আড়ালে একটি বেদনাহত সমাজের গভীরে থাকা দুঃখের কথা ক’জনই বা ভাবে?। ভোর সকালে বেতের টুকরি নিয়ে কাজে যাওয়া। রোদে পুড়ে কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে হাড়ভাঙা খাটুনি। এরমধ্যে শাসানি তো আছেই। অতঃপর ১৮৭ টাকা মুজুরি। তোলা পাতা বুঝিয়ে দিয়ে ক্লান্ত দেহে বিকেলে ঘরে ফেরা। এভাবেই পার হয় দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। ১৮০ বছর ধরে এ জনপদে বাস করা চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর সুখ কিংবা দুঃখ এভাবেই আবর্তিত হয় দাসত্বের এক গভীর শৃঙ্খলে।
ব্রিটিশ শাসনামলে এ দেশে চা চাষ শুরু হলে ‘পাতা হিলায়েগা, পায়সা মিলেগা’র’ লোভ দেখিয়ে একদল মানুষকে এনে চা কোম্পানি কাজে লাগায়। সহজ-সরল এই মানুষগুলো তখন বুঝতে পারেনি মেকি স্বপ্নের ফাঁদে একটি ঘোর কালো দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দী করে লুট করা হয়েছে তাদের সকল মৌলিক চাহিদা কিংবা অধিকার এবং জীবনযাপনের সকল অনুষঙ্গ। সেই থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত বাবু সাহেবদের আনুষ্ঠানিক তাবেদার করেই রাখা হয়েছে তাদের। যেখানে সাহেবদের মর্জিই সব, নিজের মতো চলার জো নেই।
সবুজ চা পাতার আড়ালে থাকা গভীর বেদনার মহাকাব্য ক’জনই বা পড়ে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে আলাপে-সংলাপে কত কি উঠে আসে। কেউ কি কখনো ভেবেছে, চা শ্রমিকদের রক্ত জল করা সেই অগ্রন্থিত জীবন সংগ্রামের কাহিনি?
বর্তমান দেশের ১৭০ টি চা বাগানে প্রায় ১৫ লক্ষ চা জনগোষ্ঠীর বসবাস। বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী নিত্যপণ্যের বাজারে তাদের দৈনিক মজুরি ১৮৭ টাকা। সাথে মেলে বাসি কিছু চাল অথবা আটা। যেটি নিয়ম রক্ষা হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত। সাপ্তাহিক তলব বারে এটি পরিশোধ করা হয়। কখনো কখনো এই মুজুরিটুকুও নিয়মিত হয়না। যৎ সামান্য টাকা পেয়ে তলব বাজার থেকেই সদাই করেন তারা। খেয়ে পরে বাঁচার মতো পর্যাপ্ত সদাই না হলেও করুণ বাস্তবতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম তো চলছেই। অপুষ্টি, ক্ষুধা নিয়ে আধপেটে খেয়ে জীবন পার। সন্তানের মুখে পোড়া রুটির বদলে নতুন কিছু তুলে দেওয়ার স্বপ্ন যেখানে অলীক কল্পনা।
সমাজের অন্যসব সাধারণ মানুষের মতো তাদেরও তো আছে অধিকার ভোগ করার শখ। সভ্যতার এগিয়ে চলার গতিতে দেশ-সমাজ যখন বিশাল বিশাল স্বপ্ন দেখছে, নগরের বুকে গড়ে উঠেছে বিশালদেহী অট্টালিকা, মোজাইক খচিত কিংবা টাইলসের দেওয়ালে তাকালে যখন দেখা যায় নিজের মুখচ্ছবি, শীততাপ কক্ষে যখন পরিকল্পিত হয় নানান চিন্তা তখন সমাজের চা জনগোষ্ঠী পড়ে রইলো ন্যুন্যতম খেয়ে পরে বাঁচার চিন্তায়- নিদারুন সমাজ বাস্তবতার এক সার্থক উদাহরণ হয়ে।
কথা বলেছিলাম চা বাগানের স্বপ্ন দেখা সংগ্রামী তরুণ মোহন রবিদাসের সাথে। মৌলভীবাজারে একটি চা বাগান থেকে উঠে এসে প্রতিকূল পরিবেশ উপেক্ষা করেই উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন তিনি। লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে এখন চা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে কাজ করছেন তিনি। মোহন বলেন, বর্তমান বাজারে একজন চা শ্রমিক ১৮৭ টাকা মুজুরিতে কাজ করেন। এটি ভাবলেই করুণ চিত্র উঠে আসে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সাধারণ মানুষ যেভাবে মৌলিক সুবিধা ভোগ করেন চা বাগানে সেই পরিবেশ অবারিত নয়। চা শ্রমিকেরা সন্তানদের অন্যসব বাচ্চাদের মতো সুবিধা দিতে পারেন না। চা শ্রমিকদের ভূমির অধিকার নেই। নিগৃহীত হয়েই জীবন কাটছে চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর।
তিনি আরও বলেন, মালিকপক্ষ বারবার চা শ্রমিকদের বঞ্চিত করেছে। এখনও করেই চলেছে। আমরা বর্তমানে ৫০০ টাকা মুজুরির দাবি করছি। পাশাপাশি চা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে ১১ দফা দাবি ঘোষণা করছি। শ্রম আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করে চা শ্রমিকদের ঠকানোর পাঁয়তারা আমরা রুখে দেব। আমরা স্বাভাবিক একজন মানুষের মতোই বাঁচতে চাই।
চা বাগানের করুণ বাস্তবতার সাহসী নেত্রী খায়রুন আক্তার। শ্রমিকদের সকল দাবি আদায়ে সোচ্চার তিনি। হবিগঞ্জের চান্দপুর চা বাগানের বাসিন্দা নিদারুণ দুঃখের পাটাতনে তৈরি এই নারী অদম্য সাহসিকতায় গত উপজেলা নির্বাচনে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ব্যাপক ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি বলেন, এই মজুরিতে চা শ্রমিকদের জীবন চলে না। সন্তানদের পড়ালেখা বা চাহিদা মেটানো দুষ্কর। পাশাপাশি চিকিৎসাসহ অন্যান্য ব্যয় মেটানো কঠিন। জীবনের বাস্তবতা কি জিনিস এটি চা শ্রমিকেরা বুঝতে পারে। চা বাগানের স্যানিটেশন থেকে শুরু করে সুবিধার দিক চিন্তা করলে এখনো সেই আদিম আমলেই পড়ে আছি আমরা।
চা বাগানে অধিকারের দাবি নিয়ে শ্রমিকদের ঘাম ঝরানো নতুন নয়। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন চা বাগানে মুজুরিসহ অন্যান্য অধিকার প্রতিষ্ঠার আওয়াজ শক্তিশালী হচ্ছে। দাবিতে কর্মবিরতি পালন অব্যাহত রেখেছেন চা শ্রমিকেরা। প্রশ্ন জাগে, অধিকার প্রত্যাশী এই বঞ্চিত জনগোষ্ঠী কি তাদের ন্যায্য দাবি আদায় করতে পারবেন? নাকি কোন এক বেড়াজালে আটকে যাবে তাদের হিস্যা !
সভ্যতার দেহে আড়ালে থেকে যাওয়া আলোহীন চা জনগোষ্ঠী নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করুক, এই প্রত্যাশায়...
লেখক: নিউজরুম এডিটর, যমুনা টেলিভিশন।