ফিরে দেখা ৩৫ জুলাই
আহনাফের মৃত্যু আমাদের অপরাধী করে দেয়..
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৫:০২ পিএম
আল মাহফুজ ⚫
'মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব থেকে যায়
অতীতের থেকে উঠে আজকের মানুষের কাছে
প্রথমত চেতনার পরিমাপ নিতে আসে।'
কবি জীবনানন্দ দাশের লেখা পংক্তিগুলো যেন সেই ধ্রুব সত্যের জয়গান গায়– 'ব্যক্তি মানুষের মৃত্যু হতে পারে কিন্তু আদর্শ বা চেতনার মৃত্যু নেই'। কবিতাটা জগতের সকল বিপ্লবীদের সম্পর্কে বয়ান না দিলেও আমরা ধরে নিতে পারি– অতীত হয়ে যাওয়া যোদ্ধারাই প্রথমত চেতনার পরিমাপ গুনতে আসে। তারা আসে স্বাধীন সত্তার কাছে। তারা আসে এই আলো বাতাসে বেঁচে থাকা অনিন্দ্য ফুলের সন্ধানে। তাদের কি মনে রাখা হয়েছে?
ইতিহাস বিপ্লবের নতুন পথ রচনা করে, হয় প্রতিবিপ্লব। ইতিহাস অভ্যুত্থানের গল্প বলে, বলে স্বাধীনতার জন্য রক্ত ঝরানোর কথাও। নদীর স্রোতের মতো গণমানুষের আন্দোলনও তাতে উঠে আসে। কখনও কখনও সেটা অনন্য হয়ে ওঠে নেতৃত্বগুণে। বিপ্লবের মহান ব্রত ঢেকে দেয় মৃত্যুর শঙ্কা। তেমনই এক বিপ্লবী চে গুয়েভারা। যাকে হারানোর বেদনা জর্জরিত করে পৃথিবীব্যাপী অজস্র মানুষকে। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যাকে নিয়ে লিখেছিলেন– ‘চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়।’
বাক্যটার অম্লান অনুরণন তোলা যায়। সেই অনুরণনে ভেসে আসে অজস্র যোদ্ধার স্মৃতি। সেখান থেকে আমরা স্মরণ করতে পারি আহনাফের কথা। শহীদ শাফিক উদ্দিন আহমেদ আহনাফ। রাজধানীর বিএএফ শাহীন কলেজের ছাত্র। যার বয়স থেমে গিয়েছিল ১৭ বছরে। তারুণ্যে পদার্পণ করার স্বর্ণালি সময়টাও যার আস্বাদন করা হয়নি। রাষ্ট্রযন্ত্রের বুলেট ঝাঁঝরা করে দেয় কিশোরের স্বপ্নভরা বুক। বুক তার যেন বাংলাদেশের হৃদয়। যে হৃদয় খুব করে চেয়েছিল বৈষম্যবিহীন এক সমাজের।

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বরে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে গুলিতে নিহত হয় আহনাফ। আহনাফের যেদিন মৃত্যু হয়, তার পরদিন বাংলাদেশে এক অভিনব গণঅভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটে। দেশজুড়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ ও দেশত্যাগ করেন। কিন্তু অভ্যুত্থানের সফল সমাপ্তি দেখা হয়ে ওঠেনি বুলেটবিদ্ধ আহনাফের। বিজয়ে উদিত সূর্যের কয়েক ঘণ্টা আগে জীবন বাতি নিভে যায় তার।
জুলাইয়ে জোয়ার ওঠা শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন একপর্যায়ে পরিণত হয় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে। শত শত প্রাণের বিনিময়ে আন্দোলন বিজয়ের বরমাল্য নিয়ে আসে। এরপর আসে দেশ গড়ার পালা। ক্লাসে ফেরার পালা। বন্ধ থাকা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হয়। ক্লাসরুমে ফেরে সবাই, বসে পরীক্ষার টেবিলে। শাহীন কলেজের শিক্ষার্থীরাও ফেরে কিন্তু ফেরে না আহনাফ। যে টেবিলটাতে সে বসতো, প্রথম পরীক্ষার দিন সেখানে কেউ বসেনি। সিট ছিল ফাঁকা। শিক্ষার্থীদের মাঝে কোথায় যেন এক বিরান শূন্যতা! আহনাফের স্মরণে তার সিটটাতে ফুল রেখে দেয় বন্ধুরা। 'তারে স্মরণ করে সবাই সাজায় ফুলের ডালা'।

আহনাফের ছিল আকাশ ছোঁয়ার সপ্ন। তার পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জানা যায়– আহনাফ বলতো; বড় হয়ে সে এমন কিছু করবে, যার জন্য সবার গর্ব হবে। তবে অকালে মৃত্যুর আলিঙ্গন কি সবসময় গৌরবের? তাই আহনাফের মৃত্যু আমাদের অপরাধী করে দেয়। যেভাবে অপরাধী করে দেয় আবু সাঈদ, মুগ্ধ বা আত্মত্যাগী আরও অনেকের মৃত্যু। দুনিয়ার তাবৎ শোষকদের বলতে ইচ্ছে হয়– 'পানি লাগবে পানি?' আপনারা কি তুমুল তৃষ্ণার্ত? তাহলে রক্ত না, পানি পান করুন।
শুরু থেকেই কোটা সংস্কার আন্দোলনের সোচ্চার ছিল আহনাফ। আন্দোলনে যেতে নিষেধ করলে সে তার মাকে বলতো– '১৯৭১ সালে তোমাদের মতো মা-খালারা থাকলে দেশ আর স্বাধীন হতো না।’
সত্যিই তো তাই। আহনাফরা না থাকলে ফুলগুলো সব লাল হতো না। আহনাফরা থাকে বলেই কৃষ্ণচূড়ার মোড়কে শহর সাজে। দেয়ালে দেয়ালে শোভা পায় নিশান। আহনাফরা থাকে বলেই রঙমশাল থেকে ঠিকরে বেরোয় তুলির আঁচ। আর স্লোগানে গুঞ্জরিত হয় অধিকার আদায়ের কথা।