×
Logo

শিল্প ও সাহিত্য

দূরত্ব বাড়লেই কি বন্ধু হারিয়ে যায়?

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৪৬ পিএম

দূরত্ব বাড়লেই কি বন্ধু হারিয়ে যায়?

আল মাহফুজ ⚫ মুনিম রাব্বী

আপনি অনেক দিন ধরে আড্ডার আসরে অনুপস্থিত। ক্লাবঘরে আয়েশ করে টেক্কা পেটান না। হরতনের হার্ট আর রুইতনের ডায়মন্ড আপনাকে আর রক্তিম গোলাপের কথা মনে করায় না। সমস্বরে গান গাইতে খুব ইচ্ছে হয় আপনার। গণরুমে রাত জেগে গাওয়া যে গান আপনাকে স্বর্গের সিঁড়িতে নিয়ে যেতো, আপনার এখন সেই সোপানে পা নেই। তাস পেটানো, ক্যারামের মতো খেলা আপনার দৈনন্দিন অভ্যাস থেকে হারিয়ে গেছে।

শহর ভাসিয়ে যখন বৃষ্টি নামে, ফুটবল নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়তে ইচ্ছে হয়? এই শহরে খোঁড়াখুঁড়ির রাস্তা আছে, 'শ্রাবণের মেঘ' আছে অথচ ভোদৌড় দেয়ার ইচ্ছেটা মরে গেছে। বৃষ্টিতে কিংবা উইকেন্ডে দলবল নিয়ে সিনেমা দেখার মতো ঘটনা এখন আর আপনার জীবনে ঘটে না। কেন ঘটে না? আপনার বন্ধু নেই বলে? মন খারাপ হলে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকেন, একা বসে থাকেন। মন হালকা হতো যাদের সাথে, তারা কেউ নেই। কেন নেই? সেই বন্ধুরা এখন কোথায়?

আমাদের সবার জীবন কেমন বদলে যায়। একসময় যাদের ছাড়া কিছুই ভাবা যেতো না, যাদের সঙ্গে কথা না বললে দিন গড়াতো না; সময়ের স্রোতে তারা কীভাবে গায়েব হয়ে যায়! বন্ধু সেই, যার সাথে কাঁধে কাঁধ রেখে চলা যায়। চোখে চোখ রেখে কথা বলা যায়। হাতে হাত মিলিয়ে পাড়ি দেয়া যায় অনন্তকাল। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোতে যে দাঁড়ায় চীনের প্রাচীর হয়ে। বন্ধু যদি পাশে থাকে, তবে আর কীসের দুঃখ! বন্ধু দিবসে আমাদের নিবেদন আপনার সেই বন্ধুর প্রতি, যার কাছে নিজেকে লুকোনোর প্রয়োজন হয় না। যার কাছে নিজেকে প্রকাশ করা যায় নির্দ্বিধায়।

বন্ধুরা হারিয়ে যায় কেন?

জীবনে কিছু ক্রান্তিলগ্ন আসে, যখন বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো সহজ বা কঠিন হয়। কিন্তু মানুষের জন্য যা জানা প্রয়োজন, তা হল– বন্ধুত্বের ধারা বহতা নদীর মতো। এটি এমন একটি বিষয়, যা জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে সমান গুরুত্বপূর্ণ।

জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিখ নিৎশে বন্ধুত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপকে 'স্টার ফ্রেন্ডশিপ' বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি সেখানে জীবনকে মহাসাগরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। যেখানে প্রতিটি মানুষ একেকটি জাহাজের মতো। কিছু সময়ের জন্য এই জাহাজগুলো পাশাপাশি থাকে, একসঙ্গে এগিয়ে চলে কিন্তু সময়ের ভেলায় তারা ভিন্ন দিকে ভেসে যায়।

সত্যিই তাই। পরিবারের বাইরে আমাদের সম্পর্ক তৈরি হয় শৈশবেই। বন্ধু বলতে পারার আগেই প্রতিবেশীদের ঘরে মিলে যায় দু-চারজন বন্ধু। তারপর স্কুলে গিয়ে ক্রমশ বাড়তে থাকে সখাদের সংখ্যা। কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে বন্ধুময় এক জগতের সন্ধান পাই আমরা। কত রকমের বন্ধু! এক একটা নাম, এক একটা বন্ধু কীভাবে কখন যেন জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যায় নীরবে-নিভৃতে। জীবন যতো এগোয়, এ পর্যায়ে এসে বন্ধুত্বের পালে কেমন দমকা হাওয়া লাগে। জীবনসাগরে ভাসতে থাকে এক একটা মানুষ। কেউ দ্রুত সরে যায়, কেউ এগিয়ে যায়, কেউবা পিছিয়ে যায়। এরপর চাহিদার দরজা খুলে যায়। বন্ধুরা চাকরি পেতে শুরু করে, শুরু করে ঘর বুনতে; তখন তাদের সঙ্গে সময় কাটানো বিরল হয়ে পড়ে। বন্ধু বিচ্ছেদের এই পর্বটা দীর্ঘ। জীবনের তৃতীয় অঙ্কে এসে যখন সন্তানাদি বড় হয়ে যায়, বয়সে বার্ধক্যের ছাপ পড়ে, মেলে অফুরন্ত অবসর; তখন আমরা আবার খুঁজে বেড়াই সেই বন্ধুদের।

আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস আজ, শান্তি ও সম্প্রীতির বিশ্ব গড়ার প্রত্যয়
বন্ধুতার হাতে বন্ধনের বার্তা

দূরত্ব বাড়লেই কি বন্ধুতার অবসান

অনেক সময় আমরা ভাবি, জীবন থেকে কারও দূরে চলে যাওয়া মানেই সেই সম্পর্কটি ব্যর্থ। কিন্তু বন্ধুতা অমূল্য এক স্বর্ণ, যার গুরুত্ব চিরকাল থাকে। দূরত্ব কোনোভাবে তার মূল্যকে নষ্ট করতে পারে না। এ নিয়ে একটা গল্প মনে পড়ছে। গল্পটা ছিল এমন—

গোলাপ শাহ মাজারের পাশ দিয়ে যাচ্ছি। ক্যাম্পাসের উদ্দেশে হাঁটছি ঢিমেতালে। হঠাৎ ভ্যানগাড়ির পাশে এক তরমুজ বিক্রেতাকে দেখি। দেখে থমকে দাঁড়াই। বিকেল চুরি যাওয়া আলোতে আমি চিনতে পারি আমার ল্যাংটা কালের বন্ধুকে।

হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেই। ভ্যানগাড়িটার দিকে যতো আগাই, আমার বন্ধু গামছা দিয়ে ওর মুখটা ততো আড়াল করে। আমার বন্ধু শরম পাচ্ছে। নিজের ভেতর ওর এই সেধিয়ে যাওয়া দেখে আমার মনে পড়ছে হুমায়ূন আজাদের কবিতা– 'আমরা যতো বড় হচ্ছিলাম, আমাদের মা ততো ছোট হচ্ছিলো।' আমার বন্ধু শরম পাচ্ছে। আর আমার মনে পড়ছে, 'রিডার' সিনেমার হান্নার কথা। যার অক্ষরজ্ঞান নেই কিন্তু ভেতরটা আত্মমর্যাদায় বলিয়ান। যে ভরা মজলিসে নিজের নিরক্ষরতা স্বীকার করতে অপারগ। আমার বন্ধু সেই মেয়েটার মতো নিজেরে হারাতে নারাজ। আমার বন্ধু শালুক পাতার মতো, গামছার পাপড়িতে যার মুখ আরও লাল।

তরমুজ খাব না, দেরি হয়ে যাচ্ছে। ক্যাম্পাসে যেতে হবে। পেছনে ঘুরি। নগর ভবনের দিকে টার্ন করি। মনে হচ্ছে, হাঁটছি না; নিজের মুখ লুকাচ্ছি। মনে হচ্ছে, সেখানে থাকা সূর্যসমান ঘড়িটা আমার দিকে চেয়ে হাসছে। আমি হাঁটছি, পেছনে পড়ে আছে বাল্যবন্ধুর ভ্যানগাড়ি। পেছনে পড়ে আছে দুবিঘা জমিন। ঘাড়ের ওপর থেকে যেন পিছলে পড়ছে আম আঁটির ভেঁপু। অথচ আমাদের কথা ছিল মিছিলের মাঝখানে থাকার। কথা ছিল একসাথে গান গাওয়ার। ভোরের শিশিরে পা ফেলে পাখির চোখে পৃথিবী দেখার। তার কিছুই হলো কি?

আমাদের যা করবার কথা, তা কেন করা হয়ে ওঠে না? ছেলেবেলার বন্ধুরা থাকে না বলে? কেন বাড়লে বয়স ছোট্টবেলার বন্ধুদের সংখ্যা কমতে থাকে? নিৎশে লিখেছিলেন, যারা আমাদের সঙ্গে পথ চলা শুরু করে, তাদের সবার সঙ্গে আমরা শেষ পর্যন্ত চলতে পারি না। তিনি দেখিয়েছেন, আত্মোন্নয়নের পথে মানুষ ভিন্ন ভিন্ন দিক গ্রহণ করে। যা হয়তো সম্পর্কে বিভাজন ঘটাতে পারে। কেউ হয়তো জীবনের গভীরতর প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ব্যস্ত, কেউ হয়তো সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ। ফলে সময়ের সাথে সাথে কিছু সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবেই শিথিল হয়ে যায়।

বন্ধুত্বের বাকসো কখনও শূন্য হয়?

সাধারণত বন্ধুত্বের বিচ্ছেদ মানুষকে কষ্ট দেয়। কিন্তু আসলেই কি তাই? কালের বিবর্তনে আমাদের মূল্যবোধ, চিন্তা ও দেখার চোখের পরিবর্তিত হয়। এবং এ কারনেই কিছু বন্ধুত্ব আমাদের জীবন থেকে দূরে সরে যায়। তার মানে এই নয় যে, সেই বন্ধুত্বের কোনো মূল্য ছিলো না। বরং বন্ধুতা তার সময়ে সবসময়ই মূল্যবান এবং সেই অভিজ্ঞতাগুলো পরবর্তীতে আমাদের মানস গঠনে সাহায্য করে। তবে বন্ধু নির্বাচনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সিদ্ধান্ত আমাদের জীবনকে আরও রঙিন করে তুলতে পারে অথবা হতে পারে ভীষণ হতাশাজনক।

তবু নতুন নতুন বন্ধু জীবনে আলো ফেলুক। সেই আলোর ঝলক লাগুক আটপৌরে লেন্সগুলোয়। তবু বন্ধুদের সাথে দেখা হোক কারণে কিংবা অকারণে। বন্ধুদের সাথে কথা হোক চায়ের কাপে ছাই জমিয়ে। বন্ধুরা আসুক ধূসর সন্ধ্যার ধুলো উড়িয়ে, পোড়া মিছিলে সঙ্গী হতে। বন্ধুরা আসুক প্রথাবদ্ধ বিনিময়ের ঊর্ধে উঠে। কুড়ি বছর পর সজীব পাল উড়িয়ে ফিরে আসুক প্রিয়সখা। অভিমানের পর্দা সরিয়ে কাঁধে হাত রেখে বলুক– কেমন আছিস?

সময় চলে যায়, যাক। পাল্টে যাওয়া স্লোগান নিয়েই নাহয় আসুক নানান বন্ধু। কালের খেয়ায় যেসব দোস্তির ভাসান ছিল ফারাক মোহনায়, তারা আজ তীরে ভিড়ুক মারবেল খেলার উসিলায়। রাংতায় মোড়ানো সেসব বন্ধুতার দিন জীবনের মধ্যাহ্নে এসে অন্তত জিজ্ঞেস করুক– ‘তোর কপালে এতো বলিরেখা ক্যান?’ 

Logo