আল মাহফুজ ⚫
১৯৯৩ সাল। ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের ‘বাকের ভাই’ চরিত্রের ফাঁসির দিন। সন্ধ্যার পর থেকে গোটা দেশ সুনসান। রাজপথে মানুষ নেই। অলিখিত কারফিউ। দর্শক টিভির সামনে অপেক্ষারত কিন্তু সেখানেও শ্মশান প্রবণ গাম্ভীর্য।
বাকের ভাইয়ের ফাঁসি ঠেকাতে সেদিন দেশের রাজপথ মুখর ছিল মানুষের মিছিলে। কয়েক দিন ধরে শোনা যাচ্ছিল জনতার স্লোগান– বাকের ভাইকে ফাঁসি দেয়া যাবে না। কথিত আছে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তার প্রেস সচিবকে দিয়ে নাটকের পরিচালক বরকত উল্লাহকে অনুরোধ করেছিলেন বাকের ভাইকে ফাঁসিকাষ্ঠে না ঝোলানোর। কিন্তু নাটকটির রচয়িতা হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন তার সিদ্ধান্তে অটল।
যথারীতি বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হয়। নাটকের শেষ পর্বে লাশ জেল ফটক দিয়ে বেরিয়ে আসে। টিভি সেটের সামনে বসা দর্শকের তখন মনে হচ্ছিল আদতেই ‘কোথাও কেউ নেই’। মনে হচ্ছিল, তারা যেন হারিয়ে ফেলেছে বাস্তব জীবনের নায়ককে। হুমায়ূন আহমেদ কেবল একটি টিভি নাটকের মধ্য দিয়ে হাজির করলেন সমাজবিজ্ঞানীদের জন্য এক গবেষণার বিষয়। এটা কি ছিল আইনি ব্যবস্থার ওপর জনতার গভীর অনাস্থা, নাকি বাকের ভাই তাদের কাছে হয়ে উঠেছিল বিপ্লবী এক সত্তায়?
হুমায়ূন আহমেদ এমন অসংখ্য নাটক লিখেছেন, জাবর কাটার মতো যা ফিরে আসে বারবার। হুমায়ূন আহমেদ এমন অজস্র গল্প লিখেছেন, যা ডিল করে দোলাচলের পথ ধরে। নিছক 'নাট্যকার' বা 'ঔপন্যাসিক'– এই অভিধায় তাকে বেঁধে রাখা মুশকিল। বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক বললে হুমায়ূনের নামটিই সর্বাগ্রে আসে। উপরন্তু নাটক-সিনেমা নির্মাণেও তিনি ছিলেন বেশ সমাদৃত।
তার লেখা সংখ্যাতীত বইয়ের বসবাস কোটি পাঠকের মনের মন্দিরে (সংগত কারণে নির্দিষ্ট একটা-দুইটা বইয়ের নাম নেওয়া গেল না)। তারা এখনও হুমায়ূন পড়ে চলে উৎসবের মতো করে। বাংলা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীরও নতুন এক সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছিলেন 'ফিহা সমীকরণ' স্রষ্টা। হুমায়ূন আহমেদ নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র 'আগুনের পরশমণি'। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধভিত্তিক এই ছবির ভাগ্যে জোটে আটটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। আর হুমায়ূনের মুকুটে জোটে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদকসহ বহু সম্মাননা পালক।

এক কথায় বলা যায়– হুমায়ূন যখন যেখানে যা ছুঁয়েছেন, তা সোনায় রুপ নিয়েছে। 'গীতিকার' সত্তাটাকেও আড়াল করি কীভাবে! তার লেখা বহু গানের বরাতে জুটেছে আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা। 'একটা ছিল সোনার কন্যা', 'ও আমার উড়াল পঙ্খীরে', 'আমার আছে জল', 'নদীর নামটি ময়ূরাক্ষী'র মতো সিনেমার গান লিখেছেন। হুমায়ূনের হিরণ্ময় হাত থেকে ফলেছে 'আমার ভাঙা ঘরে ভাঙা চালা', 'যদি মন কাঁদে', 'চাঁদনী পসরে'র মতো বুক খাঁ খাঁ করা কষ্টের গানও।
হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে লিখতে গেলে আদতে ফুরায় না দিন, রসদ অন্তহীন। তার রচিত ক্যারেক্টারগুলোর মধ্যে এক অদ্ভুত প্যারাডক্স থাকে। তবু মধ্যবিত্ত বাঙ্গালি সেখানেই খুঁজে পায় মেদহীন হাস্যরস কিংবা নির্জলা উৎসব। আজ অবশ্য উৎসবের দিন নয়, আজ এই কথার জাদকরের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। হুমায়ূন আহমেদ তার সৃষ্টিশীল কর্মের মাধ্যমে ভক্ত ও অনুরাগীদের মনে-মননে চিরকাল বেঁচে থাকবেন, মহাকালও বুঝি এমনটাই চেয়েছিল।
/এএম