মমতার বিপক্ষে শুভেন্দুর 'অ্যাওয়ে ম্যাচ', পদ্মফুল কি ফুটবে পশ্চিমবঙ্গে?
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৩০ পিএম
মেহেদী হাসান রোমান⚫
২০২১ সালে সবশেষ অনুষ্ঠিত হয় পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন। সেবারের ভোটে একই আসনে লড়েছিলেন রাজ্যের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) সভানেত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। ভোটের ঠিক আগ মুহূর্তে দুই দশক তৃণমূলের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা ও মমতার আস্থাভাজন শুভেন্দুর দলত্যাগ ও বিজেপিতে যোগদান রাজ্যজুড়ে জন্ম দেয় ব্যাপক আলোচনার। ভোটে সেবার শুভেন্দুর কাছে হেরে যান মমতা। উপ-নির্বাচনে জিতে এসে তৃতীয়বারের মতো রাজ্যের সরকারপ্রধান হন তিনি। এই দ্বৈরথ এবারও চলমান।
সেবার ভোটের লড়াই হয়েছিল পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে, এবার সেটি দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরে। ভেন্যু পরিবর্তন হলেও রাজনীতির এই 'হাইভোল্টেজ ম্যাচ' যেন ফের মাঠে গড়াচ্ছে নতুন সিজনেও। উপলক্ষ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন-২০২৬।
একটা সময় টিএমসির ক্ষমতায় আসার পটভূমি রচিত হয়েছিল নন্দীগ্রামেই। ২০০৭ সালে বামফ্রন্ট নেতৃত্বাধীন সরকারের একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করলে বড় ধরণের সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে জরুরি অবস্থা জারি করা হয় এবং পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৪ জন। এরপর শুরু হয় কৃষক বিক্ষোভ। মমতা বাম সরকারের বিপক্ষে আন্দোলনের ডাক দেন। তার সেনাপতি ছিলেন এই শুভেন্দু।
শুভেন্দুর জন্ম পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথিতে, একই জেলার নন্দীগ্রাম থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে। তাকে 'ভূমিপুত্র' বলা যায়। অপরদিকে, মমতার রাজ্য রাজনীতির আঁতুড়ঘর হলো ভবানীপুর। গত তিন দফায় তিনি ভবানীপুরকেই বিধানসভায় প্রতিনিধিত্ব করেছেন। কাজেই আগেরবার নন্দীগ্রামে শুভেন্দুর 'হোম ম্যাচ' ছিল, এবার ভবানীপুরে শুভেন্দু মমতার ঘরের মাঠে গিয়ে খেলবেন 'অ্যাওয়ে ম্যাচ'।
এই রাজ্যে বিগত কয়েক বছরের একটি চিত্র মোটামুটি সেখানকার মানুষের মুখস্ত। লোকসভা ও বিধানসভা ভোটের আগে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা সফর করেন পশ্চিমবঙ্গ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে দেখা যায় আটঘাট বেঁধে প্রচারণায়। একটাই লক্ষ্য— তৃণমূলকে হারিয়ে বঙ্গে পদ্মফুল ফোটানো। যেখানে বারবার ব্যর্থ দিল্লির মসনদে টানা তিনবার বসা বিজেপি।
প্রত্যেক ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের একটা 'প্রাইম টাইম' থাকে, যা একবার পেরিয়ে গেলে সেটি টপকানো আর সম্ভব হয় না। মেসি-রোনালদো'র কথাই ভাবুন। ২০১২ সালে মেসির নিজের করা এক বছরে ৯১ গোল কিংবা ২০১৩ সালে রোনালদোর ৬৯ গোলকে তারা নিজেরাও উতরে যেতে পারেননি। এর মানে, ২০১১ সালের আগের মেসি কিংবা ২০১৩ সালের পরের মেসিও ২০১২ সালের 'সেরা মেসি'-কে টপকাতে ব্যর্থ। প্রশ্ন উঠছে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সেই প্রাইম টাইম তথা সেরা বসন্ত কি পার হয়ে গেছে?
তথ্য-পরিসংখ্যান বলছে ২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রথমবার অংশ নেয় টিএমসি। বেশ ভালোও করে তারা। ৬০টি আসনে জিতে এসে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল হয় মমতার দল। তৎকালীন বামেদের দূর্গ পশ্চিমবঙ্গে নতুন দল হিসেবে দুর্দান্ত অভিষেক হয় টিএমসির। ২০০৬ সালে তাদের সিট সংখ্যা নেমে যায় অর্ধেকে। ৩০টি সিট পায় দলটি। তবে সব হিসেব-নিকেশকে অতিক্রম করে অতীতের সেরা ২০০১ সালের ৬০টি আসনের তিনগুণ সিট পেয়ে ৩৪ বছরের বাম শাসনের ইতি ঘটায় দলটি।
এরপর তো মমতার দল যখনই ব্যাটিংয়ে নেমেছে, তখনই নিজেদের বেস্ট ইনিংসকে ছাপিয়ে গেছে। মানে ৫ বছর পর একটা করে বিধানসভা ভোট হয়, আগেরবারের চেয়ে আসন বাড়ে টিএমসির। ২০১৬ ও ২০২১ সালে দলটি জেতে যথাক্রমে ২১১ ও ২১৫ আসনে।
বিজেপি এই রাজ্যে এখনও 'ক্রাইসিস পিরিয়ড' অতিক্রম করতে পারেনি। মমতা যেভাবে ২০০১ এর নির্বাচনে সেই সময়ের ক্লাসের ফার্স্ট ও সেকেন্ড বয় যথাক্রমে বাম ও কংগ্রেসের মাঝে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঢুকে গেছিল, বিজেপির গল্প আলাদা। টিএমসি তো পরে ক্লাসের ফার্স্ট বয় হয়েছে। তবে বিজেপি যখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় পরিসরে আলোচনায় আসে তখন এমন এক সময় এসে যায়, যেন যে দল একটু ভালো করবে তারাই বিরোধী দল তথা স্টেটটির দ্বিতীয় ভালো অবস্থানে থাকা দলের মর্যাদা পাবে। কারণ, ততদিনে মমতার টিএমসি এত পরিমাণ এগিয়ে গেছে যে বাম-কংগ্রেস যারা আগে প্রথম-দ্বিতীয় ছিল তারা হিসাবের বাইরে। টিএমসি তৃতীয় ও দ্বিতীয় হয়ে আস্তে আস্তে ক্ষমতায় এসেছে। তবে মমতা ঝড়ে বাকি দলগুলো এমনভাবে উড়ে গেছে যেন বিজেপির দ্বিতীয় হওয়া খোদ মমতারই আশীর্বাদ। ২০২১ নির্বাচনে তো প্রায় সাড়ে তিন দশক ক্ষমতায় থাকা বামেদের আসন দাড়ায় শূন্যতে। কংগ্রেসও পায়নি কোনো আসন।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি মোটামুটি আলোচনায় আসে ২০১৫-১৬ সালের দিকে। সেই সময়ের রাজ্য বিজেপির দুই সভাপতি রাহুল সিনহা ও দিলীপ ঘোষ সংঠনকে ঢেলে সাজান। যার প্রভাব দৃশ্যমান হয় ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে।
আগেরবার রাজ্যের ৪২ আসনের ৩৪টিতে জয় পাওয়া টিএমসির আসন হয় ২২টি। বিজেপি রীতিমতো ১৮ আসন জিতে চোখ রাঙানি দেয় মমতার দলকে। বিজেপির রাজনীতিতে বাতাস তখন অনুকূলে। সেই বাতাসই যেন শুভেন্দু অধিকারীকে টেনে নেয় বিজেপিতে। ২০ বছর মমতার সঙ্গে রাজনীতি করা শুভেন্দু বিধানসভা নির্বাচনের আগে দল বদলে বিজেপির অন্যতম 'পোস্টার বয়' বনে যান। নন্দীগ্রামে হারিয়ে দেন মমতাকেও।
তবে ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের ফলাফলের সেই অতি আত্মবিশ্বাস যেন 'গর্জালেও বর্ষেনি'। দুই বছর বাদে বিধানসভা ভোটে ক্ষমতায় আসার স্বপ্ন দেখা বিজেপি আটকে যায় ৭৭ আসনে। পরের লোকসভা ভোটে (২০২৪) রাজ্যে নিজেদের আগেরবারের ১৮ আসন নেমে আসে ১২টিতে। তাই বিজেপি হয়ত তার 'প্রাইম টাইম অব বেঙ্গল' পেরিয়ে গেছে কী না— এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে।
সেই সাথে মমতা বনাম শুভেন্দুর 'বেঙ্গল ক্লাসিকো' তো এবারের ভোটের অন্যতম আকর্ষণ।
/এমএইচআর