আবুল কালাম আজাদকে ঘিরে তার ছেলেমেয়েরা বিকট শব্দে কাঁদছে। হাউমাউ করে কান্না। তিন দিক থেকে তাকে জড়িয়ে কাঁদছে ছেলেমেয়েরা। চারিদিকে কৌতুহলী মানুষের চোখ। স্থান শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। বিমানবন্দরের ফটক দিয়ে বের হওয়ার পর থেকেই এই দৃশ্যের অবতারণা। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা তার স্ত্রীও নীরবে কাঁদছেন। কাঁদছেন ছেলেমেয়েদের কান্না দেখে। তার স্ত্রী বেশ শক্ত কিসিমের মানুষ কিন্তু তিনিও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি।
আবুল কালাম আজাদ দীর্ঘ বারো বছর পর দেশে ফিরলেন। এক নাগাড়ে এক যুগ কাটিয়ে দিলেন ফরাসি দেশে। দুঃসহ এক পরবাস জীবন। কাগজপত্রের জটিলতা জনিত কারণেই এতোদিন তার দেশে যাওয়া হয়নি।
আজাদ মিয়া দেশ ছাড়েন ২০১২ সালে। তখন তার ছোট মেয়েটির বয়স সবেমাত্র চার মাস; দ্বিতীয় মেয়েটির বয়েস চার বছর আর ছেলেটির দশ। এক যুগ পর তার ছেলেমেয়েরা বাবাকে কাছে পেয়ে কাঁদছে। এই কান্না বিপুল কষ্ট আর আনন্দ মিশ্রিত। আজাদ মিয়ার নিজেকে মনে হলো যেন এক জীবন্ত লাশ! এই কান্না তাকে স্তব্ধ করে দেয়। তিনি তার আবেগকে সামলে রাখেন। সবাইকে সান্ত্বনা দেন কিন্তু তিনি কাঁদেন না। এক যুগ প্রবাসের কান্না কেউ দেখেনি তার। নীরব এক কান্না বয়ে চলে তার জীবনজুড়ে।
আজাদ মিয়ার সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের পরিচয়। এক সময় ফ্রান্সে আমরা অনেক আড্ডা দিয়েছিলাম। দলবদ্ধ হয়ে ঘুরতে গিয়েছি বেশ কিছু দর্শনীয় স্থানে। জীবন-জীবিকার কারণে অনেক দিন দেখা হয় না তার সঙ্গে। দরকারি কাগজ হাতে পেয়ে দেশ থেকে সদ্য ঘুরে এলেন তিনি। তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করলেন আমার সঙ্গে। বললেন, 'ভাই, কি আর বলব! এক মহত্তম অভিজ্ঞতা! এই অভিজ্ঞতা প্রকাশ করার বিচার-বুদ্ধি আমার নেই। ছেলেমেয়ের আমার প্রতি যে আকুলতা দেখলাম, সেটা কখনোই ভুলতে পারবো না। দেশে দুই মাস কাটিয়ে আমি ফ্রান্সে এলাম। কিন্তু এসে আমার আর ভালো লাগে না। আমার মনটা ছেলেমেয়ের কাছে পড়ে আছে। দেশে থাকাকালীন দুই মাস ছেলেমেয়েরা আমাকে চোখে চোখে রেখেছে। আমি যেন তাদের কাছে এক আদুরে অতিথি। আমার প্রতি সে কি যত্ন আত্তি! আমার ঘরটা জুড়ে ছিল আনন্দের বন্যা।'

আজাদ মিয়া বলে চলেন, যখন দেশ থেকে বিদায় নেই, তখনও আমার সন্তানেরা ভীষণ মন খারাপ করে। তাদের সান্ত্বনা দিয়ে বলি, 'এবার থেকে প্রতি বছর দেশে আসব। মন খারাপ করো না।' আমার কথায় যেন তারা ভরসা পায় না। এটা যেন মিছামিছি এক প্রতিশ্রুতি!
ছেলেটা তাকে বিমানবন্দরে বিদায় দিতে এসেও অশ্রুসজল হয়। সেই কান্না তাকেও ছুঁয়ে যায়। কিন্তু আজাদ মিয়া তার ছেলেকে বলে, 'তুইতো দেখছি একটা পাগল! এতো বড়ো তাগড়া জওয়ান ছেলে কাঁদে নাকি? আমি তো আবার আসছি! শীঘ্রই আসছি!'
ছেলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ইমিগ্রেশনের সব প্রক্রিয়া শেষে আজাদ মিয়া ফ্রান্সের উদ্দেশে প্লেনে উঠে পড়েন। প্লেন ক্রমশ মাটি থেকে আকাশে উঠতে থাকে, আর আবুল কালাম আজাদ ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকেন। অনেক কান্নার সমুদ্র যেন তার বুকের মধ্যে জমে ছিল।
লেখক: ফ্রান্স প্রবাসী পুঁথিশিল্পী
/এএম