নর নয়, নারী নয়- এ এক বিস্ময়কর সত্তা! (দ্বিতীয় পর্ব)

|

জয়ন্ত কুমার সরকার:

অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে প্রতি দশ বছর অন্তর আদমশুমারি এবং প্রতি বছর অর্থনৈতিক সমীক্ষাসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্নরকম জরিপ অনুষ্ঠিত হলেও আজও ‘হিজড়া’দের প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয় সম্ভব হয়নি। ‘আদম’ অর্থ ‘মানুষ’ হলেও এক্ষেত্রে তাদের হয়তো মানুষ হিসেবে বিবেচনা করার যৌক্তিকতা অনুভব করেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কারণ আদমশুমারিতে নির্দিষ্টভাবে ‘নারী/পুরুষ’-এর সংখ্যা উল্লেখ থাকে। এসময় যদি প্রতিটি মানুষকে সুনির্দিষ্টভাবে গণনার আওতায় আনা হয় তাহলে ‘হিজড়া জনগোষ্ঠীর’ প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয় মোটেই অসম্ভব নয়।

যদিও সমাজসেবা অধিদফতরের পুরানো একটি জরিপ অনুসারে দেশে ‘হিজড়া জনগোষ্ঠী’র সংখ্যা প্রায় দশ হাজার। ২০১২ সালে আইসিডিডিআরবি পরিচালিত জরিপ অনুসারে তাদের সংখ্যা নয় হাজারের কিছু বেশি। অভিযোগ আছে সেই জরিপে মাথা গণনা নয়, হিজড়া নেতাদের কাছ থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে সংখ্যা নির্ণয় করা হয়েছে। যদিও হিজড়া নেতা আবুল হোসেন ডয়চে ভেল (Deutsche Welle)-র এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, সারাদেশে তাদের সংখ্যা চল্লিশ হাজারের কম হবে না।

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থাসহ হিজড়াদের নিয়ে কাজ করে এমন বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যানুসারে তাদের সংখ্যা পঞ্চাশ হাজারের মতো হতে পারে। অর্থাৎ সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে বলা যায় পরিসংখ্যানের খেরোখাতা এখানে বড়ই অসহায়। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘হিজড়া’দের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক বন্ধে দায়িত্বশীল মহলের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।

২০১৩ সালের ১১ নভেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে ‘লিঙ্গ’ যথা ‘হিজড়া লিঙ্গ’ হিসেবে চিহ্নিত করে এ সংক্রান্ত নীতিমালা অনুমোদন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে মন্ত্রিসভা সরকারি ইশতেহারে ঘোষণা দেয় যে, বাংলাদেশ সরকার ‘হিজড়া সম্প্রদায়’কে ‘হিজড়া লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই ঘোষণা হিজড়াদের মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাৎপর্যপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। ফলে তারা ছোট থেকেই নিজস্ব লৈঙ্গিক পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করতে উৎসাহিত হবে।

বর্তমানে দেশজুড়ে বছরব্যাপী অনেক দিবস পালিত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় কোনো একটি দিনকে ‘হিজড়া লিঙ্গ দিবস’ হিসেবে তাদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হলে সেটা হিজড়াদের জন্য বিরাট সম্মান বলে বিবেচিত হবে, পাশাপাশি জাতি হিসেবে গৌরবান্বিত হবো আমরাও।

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ২০১৮ সালের ১০ জুলাই ‘হিজড়া জনগোষ্ঠী’কে ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে ভোটার তালিকায় নাম নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত নেয়। ভোটার তালিকা হালনাগাদ প্রক্রিয়ায় শতভাগ প্রাপ্তবয়স্ক হিজড়াদের নাম অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হলে সেটা হবে দেশের ইতিহাসে দৃষ্টান্তমূলক একটি অগ্রগতি। আর হিজড়ারাও প্রকৃত নাগরিক মর্যাদা উপভোগের মাধ্যমে মূল স্রোতধারায় ফিরতে পারবেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর মনোনয়ন ফরম কিনেছিলেন পাঁচজন হিজড়া। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগের জন্য নির্ধারিত কোটা থেকে প্রতীকী হিসেবেও অন্তত একজনকেও মনোনয়ন দিলে; আরো অনেক কাজের মতো বিশ্ব অঙ্গণে আবারো মাহিমান্বিত হতেন তিনি; মহিমান্বিত হতো তার দল ‘আওয়ামী লীগ’ এবং অবশ্যই ‘বাংলাদেশ’। স্থাপন হতো বিরল একটি দৃষ্টান্ত। আগামীতে ‘হিজড়া জনগোষ্ঠী’র যোগ্য কোনো সদস্য জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে সেটা নারীদের জন্য সংরক্ষিত কোটায় নয়; আপন লৈঙ্গিক পরিচয়ে, সগর্বে।

মহান সংসদে অনগ্রসর জনগোষ্ঠী হিসেবে হিজড়াদের জন্য ছোট্ট করে হলেও সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আর আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোও আগামীতে যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদের দলীয়ভাবে মনোনীত করতে কুণ্ঠাবোধ করবেন না বলে প্রত্যাশা রইলো। তবে আশার কথা হচ্ছে পরিবর্তনের একটি হাওয়া কিন্তু লাগতে শুরু করেছে; জনপ্রতিনিধি হিসেবে দেশ সেবার অধিকার যে হিজড়াদেরও আছে সেই দাবি তারা ইতোমধ্যে রাখতে পেরেছেন। আমাদের নেতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি চর্চার বিপরীতে বলিষ্ঠ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিনির্মাণে যা ইতিবাচক একটি অর্জন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হিজড়া প্রতিনিধিদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ আছে। সাবেক মার্কিন প্রসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসনে হোয়াইট হাউসের নিয়োগ বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তৃতীয় লিঙ্গের অধিকারী এবং তাদের অধিকার আদায়ের কর্মী রাফি ফ্রিডম্যান গুর্সপান। হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রথম সদস্য হিসেবে ভারতে বিচারকের আসন অলঙ্কৃত করেছেন জয়িতা মন্ডল। ২০১৫ সালের ৪ জানুয়ারি ভারতের ছত্তিশগড়ের রায়গড় মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনে হিজড়া সম্প্রদায়ের সদস্য মধু কিন্নর মেয়র নির্বাচিত হন। পাকিস্তানের মতো দেশেও মারভিয়া মালিক নামে হিজড়া সম্প্রদায়ের সদস্য সংবাদ উপস্থাপক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মডেল হিসেবে কাজের সুযোগ পেয়েছেন। দৃষ্টান্ত আছে বাংলাদেশেও। সাতক্ষীরার কলারোয়াতে পৌরসভা নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন দিথি বেগম এবং সুমি খাতুন নামে দুইজন হিজড়া। বিউটি পার্লার ব্যবসার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়ে মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করছেন শাম্মী নামের একজন হিজড়া।

হিজড়াদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারও গ্রহণ করেছে তাৎপর্যপূর্ণ কিছু কর্মসূচি। যেমন,
১. স্কুলগামী হিজড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করে তোলার লক্ষ্যে চারস্তরে জনপ্রতি মাসিক (প্রাথমিক-এ সাতশত, মাধ্যমিক-এ আটশত, উচ্চ মাধ্যমিক-এ এক হাজার এবং উচ্চতর পর্যায়ে বারোশত টাকা হারে) উপবৃত্তি প্রদান।
২. পঞ্চাশ বছর বা তার থেকে বেশি বয়সী অক্ষম ও অসচ্ছল হিজড়াদের মাসে ছয়শত টাকা করে ভাতা প্রদান।
৩. বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মক্ষম হিজড়া জনগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়ন ও আয় বৃদ্ধিমূলক কাজকর্মে যুক্ত করে সমাজের মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসা।
৪. প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের দশ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান।

এখন এসকল কর্মসূচির সুফল প্রকৃত হিজড়ারা পাচ্ছেন কিনা সে বিষয়ে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের যেমন কঠোর নজরদারি প্রয়োজন, তেমনি তাদের জীবন-মান স্থায়ীভাবে উন্নত করতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ আবশ্যক।

২০১৪ সালের ডিসেম্বরে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আহবানে কয়েকজন হিজড়া সদস্য সরকারি চাকুরির জন্য সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহণ করেন; ২০১৫-এর জানুয়ারি মাসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকৃত হিজড়া সনাক্তকরণের যথাযথ পদক্ষেপ হিসেবে সবার শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন করা হবে এমন নির্দেশের প্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের জুন মাসে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত ১২ জনকে একটি সরকারি হাসপাতালে শারীরিক পরীক্ষা করতে বলা হয়। সেই কথিত পরীক্ষায় ঐ ১২ জন হিজড়া যৌন হয়রানিসহ নানারকম হেনস্থার শিকার হন বলে অভিযোগ আছে। এ ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট উদার এবং সচেতন হলেই সরকারের পদক্ষেপসমূহ সফল হবে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ক্ষেত্রে যোগ্যতার ভিত্তিতে হিজড়াদের কার্যকর অংশগ্রহণের মাধ্যমে মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারলে তারা জনবোঝা থেকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে জাতীয় প্রবৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবেন।

পরিশেষে হিজড়া সম্প্রদায়ের প্রতি উদাত্ত আহবান- কারো করুণা, মুখাপেক্ষী বা বিড়ম্বনার কারণ হয়ে অভিশপ্ত জীবন নয়, এগিয়ে আসুন আলোর পথে। সংবিধানে দেওয়া নাগরিক অধিকার নিয়ে মর্যাদাপূর্ণ জীবন-যাপন করুন। আর তাদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণে সমাজ-রাষ্ট্র’কে এগিয়ে আসতে হবে প্রকৃত অভিভাবকের ভূমিকায়। এভাবেই জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলের সম্মিলিত প্রয়াসে প্রতিষ্ঠিত হবে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। নতুন ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় শিহরিত হবে সবুজ-শ্যামল বাংলার মা ও মাটি, বিস্তৃত হবে অনাবিল শান্তির মেলবন্ধন। আর হ্যাঁ, অনন্ত শুভেচ্ছা সন্তান সম্ভবা সেই ভদ্র মহিলা এবং তার অপেক্ষমান সন্তানের জন্য (প্রথম পর্বে উল্লেখ্য)। জয়তু বাংলাদেশ।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।
ছবি: ওয়াশিংটন পোস্টের সৌজন্যে।









Leave a reply