বিষণ্ন রানওয়েতে ৮ বছর

|

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে বন্ধুত্বের শুরু। সম্পর্কটা গাঢ় হয় পেশাজীবনে। চলমান চিত্রের কারিগরিতে একজন ক্যামেরার পেছনে, অন্যজন নির্দেশনায়। স্বপ্ন বুননের গল্পে দুইটা প্রাণের পথচলা এমন করেই। চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ওপর নির্মিত তথ্যচিত্র “আদম সুরত” দিয়ে যাত্রাটা শুরু। অপ্রতুলতা কিংবা প্রতিকূলতা আর স্রোতের বিপরীতে হাঁটতে গিয়ে ধকল সহ্য করতে হয়েছে বৈকি কিন্তু দমে যাননি কখনো। সম্পর্ক আর মেধা চর্চার এমন মিথস্ক্রিয়া খুব কমই আছে।

বলা হয়ে থাকে, নির্দেশকের চিন্তার ব্যবস্থাপত্রকে চিত্রে রূপান্তরই একজন চিত্রগ্রাহকের সবচেয়ে বড় মুন্সিয়ানা। সেই মুন্সিয়ানায় একে অপরকে ছাড়িয়ে যেতেন, অসাধারণ বোঝাপাড়া আর পরিশ্রমে দেশের শক্তিমান স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। চলচ্চিত্র ও গণমাধ্যমের মতো শক্তিশালী মাধ্যমে যাঁরা ছিলেন বাতিঘর; আমাদের অভিভাবক।

জাতির শ্রেষ্ঠ দুই সম্পদ সৃজনশীল চলচ্চিত্রের পরিচালক তারেক মাসুদ এবং দেশের টিভি সাংবাদিকতার পথিকৃৎ ও প্রখ্যাত চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীর। জীবনবোধে জীবন ধারণ, চলমান চিত্রের বোঝাপড়া আর নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন নতুন প্রাসঙ্গিক বার্তা প্রদানকেই লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছিলেন দুজন। নন্দনতত্ত্ব কিংবা নান্দনিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত রেখেছেন প্রতিটি কর্মে।

ক্যালেন্ডারের পাতায় তারিখটা ১৩ আগস্ট ২০১১। ভাবনায় চলচ্চিত্র “কাগজের ফুল” নির্মাণ। ভাবনাকে রূপান্তরে ছুটে চলা ছিলো সবসময়ই। সেই রূপান্তরের সারথিকে নিয়েই মানিকগঞ্জে শুটিং স্পট দেখতে যাওয়া। হয়ত নতুন কোনো ভাবনা আর চিন্তার সমন্বয় হয়েছিলো দুজনের। কিন্তু তার প্রকাশ আর হলো না। সড়ক দুর্ঘটনা তাদের যাত্রাকে নিয়েছে কাল থেকে মহাকালের পথে। সাথে অপার্থিব করেছে পৃথিবীর মায়া।

১৯৮২ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ থেকে ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স শেষ করে তারেক মাসুদ তার প্রথম প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। ১৯৮৯ সালে চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানকে নিয়ে ‘আদম সুরত’ নামে তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর ১৯৯৫ সালে একটি ভ্রাম্যমাণ গানের দলকে নিয়ে তাঁর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘মুক্তির গান’ ও ‘মুক্তির কথা’ (১৯৯৬) প্রশংসিত হয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। এরপর ২০০২ সালে তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মাটির ময়না’ দেশের চলচ্চিত্রকে নিয়ে যায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।

আশফাক মুনীর যিনি গণমাধ্যমে মিশুক মুনীর নামেই পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষক তিনি। পরিচিত ছিলেন একজন দক্ষ ক্যামেরাপার্সন হিসেবে। দেশের প্রথম বেসরকারি চ্যানেল একুশে টেলিভিশন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান এখনো স্মরণ করেন সবাই। বাংলার সাইমন ড্রিং বলা হয় তাকে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিবিসির চিত্রগ্রাহক হিসেবেও দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তিনি।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্যামেরা ‘ডিরেক্টর’ হিসেবে কাজ করে যে ক’জন বাংলাদেশি পরিচিতি পেয়েছেন,তাদের মধ্যে মিশুক মুনীর অন্যতম। শহীদ বুদ্ধিজীবী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর সন্তান মিশুক মুনীর।

নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১২ সালে তাদের দু’জনকে একুশে পদকে (মরণোত্তর) ভূষিত করেছে সরকার।

আজ যখন দেশের সম্প্রচার নীতিমালা নিয়ে এত হৈ চৈ, এত বিতর্ক, এত দিকভ্রান্ত রুপরেখা, কর্মীদের চাকরি নিয়ে এত অনিশ্চয়তা- তখন স্যার থাকলে নিশ্চিত কোনো একটা পথ দেখিয়ে দিতেন। পরম একটা আস্থার জায়গা পেতাম আমরা। কেমন যেন অভিভাবকহীনতায় ভুগছি এখন, আর এই সময় বয়ে নিয়ে যেতে হবে আরো কতদূর…

এদিকে দেশের চলচ্চিত্রও ভুগছে অভিভাবকহীনতায়। ক্রমশই অন্ধকার হয়ে যাওয়া এই শিল্পমাধ্যমে পরামর্শ নেবার-দেবার মানুষ নেই বললেই চলে। ফলে চলচ্চিত্র হারাচ্ছে তার নিজস্বতা; স্থান দখল করছে বিদেশি মাধ্যেম। এমন সংকটে শ্রদ্ধেয় তারেক মাসুদ থাকলে নিশ্চয়ই কোনো মুক্তির পথের রানওয়ে নিয়ে ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হতেন।

মিশুক স্যার ও শ্রদ্ধেয় তারেক মাসুদ- আপনারা সমকালীন বাংলাদেশের দুই আধুনিক মানুষ। ভালো থাকবেন।

চিরভাস্মর হয়ে থাকবেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

লেখক: আহমেদ রেজা, সংবাদকর্মী, যমুনা টেলিভিশন









Leave a reply