নর নয়, নারী নয়- এ এক বিস্ময়কর সত্তা! (প্রথম পর্ব)

|

জয়ন্ত কুমার সরকার:

‘ডেনিশ গার্ল’ নামক ডেনমার্কের একটি সিনেমায় নায়িকা লিলি তার প্রিয়তমকে বলেছিলেন, “God made me a woman. But the doctor…He…The doctor is curing me of the sickness that was my disguise.’ (অর্থা‍ৎ লিলি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন ঈশ্বর তাঁকে মনোজগতে একজন নারী হিসেবেই তৈরি করেছেন; নয়তো নিজেকে নারী হিসেবে ভাবতে পছন্দ করবেন কেন! কোনো এক অজানা কারণে তিনি নারীত্ব লাভে ব্যর্থ হয়েছেন, কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সহায়তায় সেই ভুল থেকে পরিত্রাণ চান)। বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে ‘ডেনিশ গার্ল’ সিনেমার মূল প্রেক্ষাপট।

বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে এইনার ওয়েগনার নামে ডেনমার্কের একটি ‘ছেলে’ লিঙ্গ পরিবর্তনের সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে ‘জেন্ডার রি-অ্যাসাইনমেন্ট তথা লিঙ্গ পরিবর্তন’-এর জন্য অস্ত্রোপচারের সাহায্যে ‘মেয়ে’ হয়ে লিলি এলবে নাম নিয়েছিলেন। মানব সভ্যতার ইতিহাসে যা অনন্যসাধারণ মাইলফলক। যদিও বিভিন্ন জাতিসত্তার নিবিড় মেলবন্ধনে তৈরি আমাদের সংস্কৃতি-কৃষ্টি। ধর্মীয় মূল্যবোধ, চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সর্বোপরি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি কারণে এটা বাংলাদেশে শুধু অকল্পনীয়ই নয়, অসম্ভবও। তবে প্রযুক্তি নির্ভর তরুণ প্রজন্মের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিপ্লবের লক্ষণ স্পষ্ট। তাই স্বেচ্ছায় লিঙ্গ পরিবর্তন করে আকাঙ্ক্ষিত লিঙ্গ ধারণের বৈপ্লবিক কোনো পরিবর্তন ভবিষ্যতে আসবে কিনা সেটা তর্কসাপেক্ষ। সুতরাং বিষয়টি অনাগত ভবিষ্যতের হাতে রেখে বর্তমান নিয়ে আলোচনা করাই যুক্তিসঙ্গত।

‘হিজড়া বা বৃহন্নলা’। ছোট থেকে বুড়ো, পথে-ঘাটে-পাড়া-মহল্লায় তাঁদেরকে উৎসাহভরে (হোক সে শ্রদ্ধা, করুণা, উপহাস বা ঘৃণাভরে) দেখে না এমন মানুষ পাওয়া ভার! কোনো বাড়িতে নতুন শিশু জন্মগ্রহণ করলে তাঁরা সেই নবজাতককে নিয়ে নাচ-গান-বাজনার মাধ্যমে সবাইকে আনন্দ দেন। কংক্রিটের শহরে এগুলো খুব একটা আলোড়ন তৈরি না করলেও পাড়া-গাঁয়ে সংশ্লিষ্ট বাড়িকে ঘিরে থাকে আনন্দমুখর পরিবেশ, দেখতে ভিড় জমায় সব ধরনের মানুষ; হয় বিচিত্র অভিজ্ঞতা। সেসব অভিজ্ঞতার সবই যে হিজড়াদের জন্য খুব সুখকর সেটা ভাবার সুযোগ নেই। তবে তারা চলে যাওয়ার পর তাদের অঙ্গভঙ্গি নকল করে অন্যান্যদের আনন্দদায়ক কাজকর্ম আর মুখরোচক আলোচনা সারাটা দিন মাতিয়ে রাখে।

হাস্যকর মনে হলেও প্রসঙ্গক্রমে ব্যক্তিগত জীবনের একটি ঘটনা বলছি। ছোটবেলা থেকেই মায়ের অত্যন্ত কাছাকাছি থাকার সুযোগে গভীরভাবে দেখেছি তাঁর জীবনপ্রণালী। পেয়েছি সকলস্তরের মানুষকে সম্মান করার মতো চমৎকার সব শিক্ষা। হাতেখড়ি থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যালয়ের বাইরে শুধু মা’ই ছিলেন আমার শিক্ষাগুরু। ফলে ব্যক্তিগত শিক্ষকের কাছেও যেতে হয়নি কখনও। কিন্তু সপ্তম শ্রেণিতে ওঠার পরই মা স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ায় ‘গণিত’- এ সহযোগিতা করতে আমার ও মেজদি’র জন্য একজন শিক্ষক ঠিক করলেন। গ্রামের সম্পর্কের সুবাদে তাকে ফুফি বলতাম (ফুফির সামাজিক মর্যাদার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে নাম উল্লেখ করলাম না)। তিনি তখন স্নাতক শ্রেণিতে পড়তেন। লোকমুখে প্রচলিত উনি হিজড়া সম্প্রদায়ভুক্ত (গ্রামে হিজড়া আসার খবরে ফুফিকে ঘরে লুকিয়ে রাখলে সেটি আরো মুখরোচক হতো)। বিষয়টি মায়েরও জানা ছিল। আশেপাশে কয়েকজন শিক্ষক থাকতেও আমাদেরকে তাঁর কাছে পড়তে পাঠাতেন এবং প্রতিবেশীরা হাসি-ঠাট্টা করলে দুই ভাই-বোনকে চমৎকারভাবে বোঝাতেন, ‘লোকজনের কথা সত্য হলেও লজ্জার কিছু নেই, বরঞ্চ গৌরবের। পৃথিবীর সব মানুষই সমান মর্যাদার। অসৎ ও চরিত্রহীন ব্যক্তি ছাড়া সবার কাছ থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করা যায়। যিনি সুশিক্ষা দিতে পারেন তিনিই প্রকৃত শিক্ষক’। তাই শৈশবের সেই শিক্ষক থেকে শুরু করে হিজড়া জনগোষ্ঠী সম্পর্কে আমার মনে কখনও খারাপ ধারণা আসেনি। এখন গর্ব হয়; শৈশবেই ভিন্ন শারীরিক গঠনের একজনের কাছে অল্প সময়ের জন্য হলেও আমার শিক্ষা গ্রহণের সৌভাগ্য হয়েছে (বিষয়টি জানার পর পরিচিত অনেকে উপহাস করলেও আমি বিচলিত নই)। আর স্বর্গীয় মায়ের প্রতি অতল শ্রদ্ধা গভীরতর হয়, কী অনন্যসাধারণ উদারতার অধিকারী ছিলেন তিনি!

সময়ের বিবর্তনে এখন সব ক্ষেত্রেই ঘটেছে ব্যাপক পরিবর্তন। সমাজ ব্যবস্থাপনা, আচার-আচরণ, মানসিকতা সবকিছুতেই পেশাদার মনোভাব। আগেকার দিনে হিজড়াদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল প্রায় সকল মানুষই। বর্তমানে তাদের কারণে সাধারণ জনগণ অনাকাঙ্ক্ষিত বিড়ম্বনার শিকার হওয়ায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিরূপ। কিন্তু জনসাধারণের জন্য বিড়ম্বনার তৈরির পথ হিজড়াদের কেনইবা বেছে নিতে হয়? বর্তমানে যান্ত্রিকপ্রায় সমাজের সেটা ভাবার সময়ইবা কোথায়? তৃণমূল থেকে রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই তারা অবহেলা, অপমান, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, উপহাস এমনকি নির্মম প্রহারেরও শিকার। এখনও সমাজ-রাষ্ট্রের কোথাও তাদের জন্য সম্মানজনক জীবন-যাপনের নিশ্চয়তা নেই। শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানসমূহে নিজস্ব লৈঙ্গিক পরিচয়ে আত্মসম্মান বজায় রেখে শিক্ষা গ্রহণের নিশ্চয়তা নেই। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে ভুক্তভোগী পিতা-মাতা হিজড়া সন্তানকে সমাজে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উদারতা দেখাতে সঙ্কোচবোধ করেন। পাশাপাশি সমাজ কারো ‘হিজড়া’ পরিচয় জানার পর ঐ পরিবার বা ব্যক্তিকে আপন করে নেওয়ার ‌উদারতা দেখাতে দারুণভাবে ব্যর্থ। ফলে মানসিক হীনমন্যতা, আড়ষ্টতা, লোকলজ্জা, দুঃখ, সর্বোপরি সামাজিক নিগ্রহের শিকার হয়ে ঐ সন্তানকে যেতে হয় কথিত ‘গুরু মা’-এর আশ্রয়ে। আয়ত্ত করতে হয় নাচ-গান-বাজনা-হাততালি এবং কড়া প্রসাধনী মেখে অস্বাভাবিক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে সাধারণের মনোরঞ্জনের কলাকৌশল; বেছে নিতে হয় সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী একটি জীবনধারা। যার অনিবার্য পরিণতি ভয়ঙ্কর রকমের সামাজিক বিড়ম্বনা, শিকার আমরাই।

হিজড়াদের সামাজিক বিড়ম্বনা কোনো কোনো সময় পৌঁছে যায় চরম নিষ্ঠুরতার পর্যায়ে। আগে মানুষজন খুশি মনে হিজড়াদের যা দিতেন তাই তারা আনন্দের সাথে নিতেন, দাবি থাকলে জানাতেন; থাকতো সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ। কিন্তু সেই বাস্তবতা এখন ধূসর অতীত। সহনশীলতা এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বর্তমান সমাজ থেকে বিলুপ্তির মাধ্যমে জাদুঘরে আশ্রয়ের অপেক্ষায়! অবশ্য এর পেছনে শুধু একপক্ষকে দোষারোপ করার সুযোগ নেই। সার্বিক ব্যবস্থাপনাতেই আছে বড় ধরনের গলদ। বর্তমান নাগরিক জীবনে ‘হিজড়া’ রীতিমত ভয়ঙ্কর এক আতঙ্কের নাম। পথে-ঘাটে-পার্কে-যানবাহনে-বাসা-বাড়িতে তাদের হঠাৎ উপস্থিতি জনজীবনকে বিভীষিকাময় করে তুলেছে। তাদের চাঁদাবাজি, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি, আক্রমণাত্মক আচরণ, অশ্রাব্য ভাষা, কাঙ্ক্ষিত টাকা না পেলে শারীরিকভাবে লাঞ্ছনা, নবজাতককে ছুঁড়ে ফেলা, অন্যদেরকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে নিজেকে আঘাত করা, কৃত্রিম হিজড়া তৈরি, যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়ায় এইচআইভি ঝুঁকি, গ্রুপিং, লবিং এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডে প্রভাব বিস্তার কেন্দ্র করে খুনোখুনিসহ ভয়ঙ্কর সব লোমহর্ষক কাহিনী গণমাধ্যমে উঠে আসে প্রায়ই। ফলে হিজড়াদের প্রতি জনসাধারণের মানবিক অনুভূতি দারুণভাবে হ্রাস পাচ্ছে।

উদাহরণস্বরূপ একটি তরতাজা ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। আমার অত্যন্ত কাছের সন্তান সম্ভবা একজন ভদ্র মহিলার প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ জানতে পেরে হিজড়ারা ইতোমধ্যে তিন-চারবার তার বাসায় এসে রশিদ দেওয়া হবে জানিয়ে চাঁদা দাবি করেছেন এবং সন্তান জন্মগ্রহণের পর সর্বনিম্ন পাঁচ হাজার টাকা (তাদের প্রতিনিধি সংখ্যার ওপর নির্ভর করে টাকার পরিমাণ বাড়তে পারে উল্লেখসহ) দিতে হবে বলে হুমকি দিয়েছেন। সন্তান জন্মের আগেই হিজড়াদেরকে টাকা দেওয়ার কথা আগে কখনও শোনা যায়নি। ভদ্র মহিলা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বামীর চাকুরীর সামান্য বেতনে ছোট্ট একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে ঢাকা শহরে থাকেন। নতুন সন্তান জন্মগ্রহণের জন্য যদি শুধু হিজড়াদেরকে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হয় তাহলে তার সংসার চলবে কিভাবে? চড়া দ্রব্যমূল্যের এই শহরে অসংখ্য নিম্ন আয়ের মানুষ কোনোরকমে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তার ওপর হিজড়াদের এরকম অত্যাচার-জুলুম চলতে থাকলে যেকোনো মুহূর্তে মানবিক বিপর্যয় ঘটতে বাধ্য। নষ্ট হতে পারে সামাজিক সম্প্রীতি, হারিয়ে যেতে পারে মানুষের সহানুভূতি-শ্রদ্ধাবোধ। প্রচলিত রীতি (কোনোভাবেই নিয়ম বা আইন নয়) অনুসারে সন্তান জন্মগ্রহণের পর হিজড়ারা আসলে সেই পরিবার খুশি মনে তাদের সন্তুষ্ট করতে চেষ্টা করে; কোনোভাবেই ঐ পরিবারকে বাধ্য করা যায় না। অথচ বর্তমানে এমনটাই ঘটে চলেছে অহরহ। লোকলজ্জা বা সামাজিকতার ভয়ে হয়তো সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে বলতে পারছেন না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ দানা বাঁধা অস্বাভাবিক নয়। আর পুঞ্জিভূত সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটলে আমাদের শক্তিশালী সামাজিক বন্ধনের বিপরীতে তৈরি হবে অত্যন্ত লজ্জাস্কর একটি উদাহরণ।

অজস্র ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত এই দেশে প্রতিটি মানুষ তার নাগরিক অধিকার নিয়ে মর্যাদাপূর্ণ জীবন-যাপনের অধিকার রাখেন। এর ব্যতিক্রম হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি রাষ্ট্রের প্রচলিত সংবিধান অনুসারে যথাযথ প্রতিকার চাইতে পারেন। যদিও ‘হিজড়া’দের ব্যাপারে আইনি প্রক্রিয়াসমূহ বা আদৌ কোনো আইনি প্রতিকার আছে কিনা সেটা জনসাধারণের কাছে স্পষ্ট নয়। তবে উভয় পক্ষের মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য এ সংক্রান্ত সুস্পষ্ট রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা এবং নির্দেশনা খুবই অপরিহার্য।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।
ছবি: ওয়াশিংটন পোস্টের সৌজন্যে।









Leave a reply