ফ্যান্টাস্টিক ফোর!

|

রিফাত এমিল:

কালে কালে কতো রথী-মহারথী ব্যাটসম্যান এসেছেন ক্রিকেট জগতে; রান আর শতকের বন্যায় ভাসিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন ক্রিকেট ইতিহাস। সেই ক্রিকেটের শুরু থেকে ডব্লিউ জি গ্রেস, স্যার জ্যাক হবস, স্যার ডন ব্র্যাডম্যান হয়ে স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডস কথা ধরুন। অনেকের কাছে ‘ক্রিকেটের ফাদার’ বলে গ্রেস পরিচিত আর ‘দ্য মাস্টার’ নামে হবস। আরেক ‘স্যারে’র কথাই বা ভুলে যাই কীভাবে? স্যার গ্যারফিল্ড সোবার্স! তারপর ১৯ শতকের শেষ আর ২০ শতকের শুরুর দিকে লারা না শচীন-কে সেরার তর্ক? মাঝেমধ্যে এ আলোচনায় রিকি পন্টিংয়ের উঁকি দেওয়ার চেষ্টা।

ক্রিকেটের আদি ডন ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান, তবে বোলারদের মনে ভীতি জাগানিয়া ব্যাটিং করা ‘কিং’ একজনই-ভিভ রিচার্ডস। ভারতীয়দের কাছে শচীন যখন ‘ক্রিকেট ঈশ্বর’ তখন রেকর্ডের ‘বরপুত্র’ লারাই।
আগের সব নাম ছাপিয়ে বর্তমান সময়ের ক্রিকেটমোদীরা বুঁদ হয়ে আছে চার ব্যাটসম্যানে! তাদের নিজেদের মধ্যেও চলে ‘সময়ের সেরা’ ব্যাটসম্যান হওয়ার এক অদৃশ্য লড়াই! একজন কোনো সিরিজে দুর্দান্ত করলে আরেকজন অন্য সিরিজে করে বসে অতিমানবীয় পারফরমেন্স। একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার নেশায় যেন মত্ত।

সময়ের সেরা চার ব্যাটসম্যানের একজন উপমহাদেশের, আরেকজন ইংলিশ, বাকি দুজন তাসমান সাগর পাড়ের দুই দেশ অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডের। সামান্য ক্রিকেট অনুসরণ করলেও চারটা নাম ইতিমধ্যে আপনার মাথায় এসে গিয়েছে। চারজন হলেন: ভিরাট কোহলি, স্টিভেন স্মিথ, কেন উইলিয়ামসন ও জো রুট।

শুরুটা কোহলিকে নিয়ে করা যাক। মাত্র ১৭ বৎসর বয়স তার; হঠাৎ বাবা মারা যান। রঞ্জি ট্রফির ম্যাচ খেলায় ৪০ রানে অপরাজিত ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পরের দিন মাঠে গিয়ে খেলে দলকে পরাজয়ের হাত থেকে বাঁচান। দলকে পরাজয়ের হাত থেকে রক্ষা করে নিজ পিতার শেষকৃত্য করেন কোহলি। তার মতো ক্রিকেটকে ভালোবেসেছে খুব কম লোকই। নিজের শতভাগ উৎসর্গ করেছেন ক্রিকেটের জন্যই।

কোহলি বিশ্বাস করেন পরিশ্রমই সবকিছু। শুধুমাত্র পরিশ্রমের মাধ্যমেই একটা ভালো প্রচেষ্টা একটা দুর্দান্ত ক্যাচে পরিণত হবে। আপনি কতটুকু অনুশীলন করলেন? কী পরিমাণ ঘুমালেন? তার উপর নির্ভর করে। পয়েন্ট ‘এ’ থেকে ‘বি’ এর নির্দিষ্ট দূরত্ব আপনি দুই সেকেন্ডে দৌড়ে কভার করলেন নাকি তিন সেকেন্ডে! দুই সেকেন্ডে কভার করলে সহজ ক্যাচ, তিন সেকেন্ডে করলে ভালো চেষ্টা। পুরোটাই নির্ভর করে আপনি ক্রিকেটের প্রতি কতোটা আত্মোৎসর্গ করেছেন তার ওপর। এভাবেই ভাবেন ভিরাট।

অনেকেই তার সাথে শচীনের তুলনা আনেন, অথচ তিনি নিজেই তুলনায় বিশ্বাস করেন না। তুলনা কার সাথে করবেন? তার আইডলের সাথে? যাকে দেখে ক্রিকেটে এসেছেন তার সাথে? তুলনায় বিশ্বাসী না ভিরাট, উপভোগ করেন বলেই ক্রিকেটটা খেলেন।

ফ্যান্টাসটিক ফোরের বাকি তিনজনের চেয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটে ঢের এগিয়ে ভারতীয় দলপতি বিরাট কোহলি। ছোট্ট একটি পরিসংখ্যান দেই; যেখানে বাকি তিনজনের সম্মিলিত ওয়ানডে শতক ৩৭টি, সেখানে কোহলির একার ওয়ানডে শতক ৪১টি। এরমধ্যে রান তাড়ায় আর চাপের মধ্যেও দলকে জেতানোর বেশকিছু অবিশ্বাস্য কীর্তি দেখিয়েছেন তিনি। রান তাড়ায় তার শতক সর্বোচ্চ ২৫টি, ব্যাটিং গড় ৬৭!

শুরুতে টেস্টে তার ব্যাটে রান ছিল না রানের ফোয়ারা। কোহলি তার প্রথম পাঁচ টেস্টে করেছিলেন মোটে ২০২ রান; শুরুর পাঁচ টেস্টে ছিল দুটো ডাকও। এরপরে অবশ্য আর পেছনে তাকাতে হয়নি। যেখানে, যে ফরম্যাট খেলেছেন রান পেয়েছেন। খেলেছেন দুর্দান্ত সব ইনিংস, গড়েছেন রান আর রেকর্ডস বন্যা।

কিছুদিন আগেও কোহলি ছিলেন ক্রিকেট ইতিহাসের একমাত্র ক্রিকেটার যার ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটে ছিল ৫০ এর অধিক ব্যাটিং গড়। সদ্য শেষ হওয়া উইন্ডিজের বিপক্ষে তিন ম্যাচের টি-২০ সিরিজে ৩৫ গড়ে ১০৬ রান করায় গড় এখন ৪৯। কোহলির টি-২০ ক্রিকেটে আবারও ৫০ হবে, তা বলাই যায়।

ফ্যান্টাসটিক ফোরের আরেক সদস্য অস্ট্রেলিয়ান স্টিভেন স্মিথ। নিজেকে বদলে ফেলে পুরাদস্তুর একজন ব্যাটসম্যান হয়ে ওঠেছেন তিনি। অথচ ক্যারিয়ারের শুরুতে ছিলেন একজন লেগ স্পিনার যে ব্যাটিংও পারে! সিডনিতে জন্ম নেওয়া স্মিথের টেস্ট অভিষেক হয় ২০১০ সালে। টেস্ট ক্যারিয়ারের শুরুর প্রথম বছর চার টেস্টে রান করেছিলেন ১৮৭, পরের বছর এক টেস্ট সুযোগ পেয়ে করেছিলেন ৭২ রান। ২০১৩ সালে ১১ টেস্টে ৩৭ গড়ে ৭১১ রান করার পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। আস্তে আস্তে হয়ে উঠেছেন অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটিং অর্ডারের মূল ভরসা।

স্মিথের ওয়ানডে ক্যারিয়ারের গল্পটাও প্রায় একই। ২০১০ সালে অভিষেকের পর থেকে ২০১৩ অবধি ব্যাট হাতে রান না পেলেও ২০১৪ থেকে ওয়ানডে ক্রিকেটেও রান ফোয়ারা ছোটাচ্ছেন ব্যাট হাতে। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রথম চার বছর কোনো অর্ধশতক, শতক করতে না পারা স্মিথ তার ক্যারিয়ারের পরের সময়টায় করেছেন ৮ শতক ও ২৩ অর্ধশতক।

স্টিভেন স্মিথের ক্যারিয়ারে কলঙ্ক হয়ে আসে কেপটাউনে বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগের কারণে অস্ট্রেলিয়া দল থেকে নিষিদ্ধ হওয়া। কেপটাউনের সেই দুঃস্বপ্ন অবশ্য কাটিয়ে এখন আবার অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের ত্রাতার ভূমিকায় স্মিথ। সর্বশেষ এজবাস্টন টেস্টের উভয় ইনিংস তার প্রমাণ। দোর্দণ্ড প্রতাপে ফিরে আসা স্মিথের ব্যাটে চড়ে অ্যাশজ শুরু অজিদের জয়ে, এজবাস্টন জয়ের গেরো তারা খুলল ১৮ বছর পরে। টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ে ব্যাটসম্যানদের সেরা হওয়ার লড়াইটা আবার উপভোগ্য হবে তা অনুমেয়।

স্মিথের তাসমান সাগর পাড়ের প্রতিবেশী কেন উইলিয়ামসন। নিপাট এই ভদ্রলোকও সময়ের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন। অথচ ক্যারিয়ারের শুরুতেই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন ক্রিকেটের নিষ্ঠুরতা। শুরুর দুই ওয়ানডে ম্যাচে ফিরেছিলেন তিনি শূন্য হাতে। সময় যতো গড়িয়েছে উইলিয়ামসনের ব্যাট হয়েছে ততো ধারালো! সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল নেতৃত্ব। ব্যাটিং আর নেতৃত্বগুণ দুটো একইসঙ্গে মিলেই যেন পূর্ণতা পেয়েছে উইলিয়ামসনে। যার সর্বশেষ প্রমাণ রেখেছেন শেষ হওয়া বিশ্বকাপ মহাযজ্ঞে। ২০১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপে ৯ ইনিংসে ৮২ গড়ে করেছিলেন ৫৭৮ রান। দলের বাকিদের ব্যর্থতায় তার ওপর বেশিরভাগ ম্যাচে ছিল গুরুদায়িত্ব। সেই দায়িত্ব সামলেছেন দারুণভাবে, সাথে ছিল বুদ্ধিদীপ্ত নেতৃত্ব। দল ফাইনালে বাউন্ডারি নিয়মের মারপ্যাঁচে ইংলিশদের কাছে হেরে গেলেও কেন পেয়েছিলেন বিশ্বকাপের সেরা ক্রিকেটারের স্বীকৃতি-‘ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট’। টেস্টে ৫৩ গড়ে ৬১৩৯ রান আর ওয়ানডে ক্রিকেটে ৪৭ গড়ে ৬১৩৩ রান করা কেন উইলিয়ামসনও খুব বেশি পিছিয়ে নেই ফ্যান্টাসটিক ফোরের বাকি তিনজনের চেয়ে!

স্মিথ আর কোহলির বয়স ৩০, উইলিয়ামসনের বয়স ২৯। ফ্যান্টাসটিক ফোরের ছোট সদস্য ২৮ বছর বয়সী জো রুট। ইয়র্কশায়ারে জন্ম নেওয়া এই ডানহাতি ব্যাটসম্যানও নিজের সামর্থ্যের জানান দিয়ে রেখেছেন ক্রিকেট বিশ্বে। টেস্টে ৪৮ আর ওয়ানডে ক্রিকেটে ৫১ গড়! শুরু থেকেই একই ধারায় রান করে চলেছেন এই ইংলিশ ব্যাটসম্যান।

ঘরের মাঠে বিশ্বকাপে জেতাতে রেখেছিলেন ভূমিকা। তার কাঁধেও রাজসিক টেস্ট ক্রিকেটের নেতৃত্বের ভার। ভারটা অবশ্য ভালোভাবেই বইছেন!

দারুণ ব্যাপার হচ্ছে, বেশকিছু মিল রয়েছে ফ্যান্টাসটিক ফোরের। সবাই প্রায় একই বয়সী। চারজনই ডানহাতি ব্যাটসম্যান। সময়ের সেরা চার ব্যাটসম্যান হলেও প্রত্যেকের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে উইকেট রয়েছে। এক্ষেত্রে কোহলি ৮ আন্তর্জাতিক উইকেট নিয়ে পিছিয়ে থাকলেও উইলিয়ামসন ৭২, স্মিথ ৬২ ও রুটের রয়েছে ৪৮ আন্তর্জাতিক উইকেট। প্রতিপক্ষের জুটি ভাঙ্গতে মাঝেমাঝেই তাদের বল হাতে নিতে দেখা যায়।

যেহেতু সবাই প্রায় একই বয়সী, তাই ফিটনেস নিয়ে যে বেশি কাজ করবে, যে নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার জন্য নিজের সঙ্গে লড়বে সে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে থাকবে। টেস্টের সেরা ব্যাটসম্যানের অদৃশ্য মুকুট কিংবা সময়ের সেরা ব্যাটসম্যান তকমা গায়ে আঁটার জন্য এদের লড়াইটা হবে উপভোগ্য। যে ক্রিকেটীয় সুধা পান করে আমরা ক্রিকেটমোদীরা সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হব।

কে সেরা? তা নিয়ে সবসময় আলোচনা চলতেই থাকবেই। এইসব আলোচনাতেই ক্রিকেটীয় আনন্দ। তবে যদি ভোট এই চারজনের একজনকে দিতে হয়। আমার ভোটটা পড়বে ভিরাট কোহলির বাক্সে। পাঠক আপনার?









Leave a reply