ডেঙ্গু জ্বরে নিহত ঢাবি শিক্ষার্থী স্বাধীনের দাফন সম্পন্ন , এলাকায় শোকের ছায়া

|

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি :

ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবি ছাত্র, আর অল্প কিছুদিন পরেই শেষ হবার কথা ছিলো তার লেখাপড়া। ম্যাজিষ্ট্রেট হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলো ছেলে ফিরোজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ফিন্যান্স বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের আবাসিক ছাত্র ছেলে ফিরোজ কবীর স্বাধীনের অকাল মৃত্যুতে এমনি স্বপ্নগাঁথা নানান আহাজারি করছেন পিতা দেলোয়ার হোসেন।

শনিবার দুপুরে ঢাকা থেকে লাশবাহী এম্বুলেন্সে করে তার মৃতদেহ ঠাকুরগাঁওয়ের আখানগর মহেশপুর তার গ্রামের বাড়িতে আনা হয়েছে। বাদ-আছর বিকাল সাড়ে পাঁচটায় তার দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ তার জানাজায় অংশ নেন।

ফিরোজ কবীর স্বাধীন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা আখানগর ইউনিয়নের কালিতলা মহেশপুর গ্রামের দবিরুল ইসলামের ছেলে। পরিবারের দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট ফিরোজ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৩-২০১৪ সেশনের ব্যবসায় অনুষদের ফিন্যান্স বিভাগের ছাত্র ছিলেন । তার অকাল মৃত্যুতে শুধু পরিবারেই নয়, গোটা এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বলেন, কিছুদিন পূর্বে ফিরোজ বলেছিলো, বাবা তোমাকে কষ্ট করে আর বেশি দিন টাকা পাঠাতে হবেনা। তোমার কষ্টের দিন শেষ হতে চলেছে। পাঁচ ছয় মাস পর আমার চাকরি হবে। তখন আমি তোমাকে প্রতি মাসে টাকা পাঠাবো। সামনের বছর আমার টাকা দিয়ে তোমাকে হজ্বে পাঠাবো আমি।

কিন্তু সে যেন স্বপ্নই থেকে গেল, তা আর কখনোই পূরণ হবেনা! ডেঙ্গু জ্বর কেড়ে নিলো ফিরোজের প্রাণ। চলতি মাসের ১৮ জুলাই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন ফিরোজ। পরবর্তীতে চিকিৎসা নেন স্কয়ার হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার রাত ৯টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

ফিরোজের বড় ভাই আব্দুল করিম বলেন, পরিবারের চার ভাইবোনের মধ্যে ফিরোজ সবার ছোট। সে স্থানীয় আখানগর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর ঢাকায় চলে যায় লেখাপড়ার জন্য। বাড়ি থেকে তাকে লেখাপড়ার জন্য প্রতি মাসে খরচ পাঠানো হতো, যাতে তার কোন সমস্যা না হয়। ফিরোজ ঢাকায় থাকলেও নিয়মিত পরিবারের সকলের খোঁজখবর নিতো। লেখাপড়া শেষ করে সরকারি অফিসার হওয়ার কথা ছিলো তার। গত রমজানের শেষ দিকে সে বাড়িতে ঈদ করার জন্য এসেছিলো। গত সপ্তাহে ফোনে তার জ্বরের খবর জানায় সে। এরপর থেকে তার সাথে পরিবারের আর কারো কোন কথা হয়নি।

একই গ্রামের ফিরোজের বন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বেলাল হোসেন ও প্রতিবেশী হারুনুর রশিদ জানান, গত ১৮ জুলাই তার জ্বর আসে তারপর ২২ জুলাই তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির পর ফিরোজের শারিরিক অবস্থার অবনতি হলে তারা ২৫ জুলাই চিকিৎসকের পরামর্শে ফিরোজকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে চিকিৎসক তাকে খাবারের জন্য রাইস টিউব দেন। কিন্তু সেখানেও তার শারীরিক অবস্থা আরো অবনতি হয়। তার নাক ও মুখ দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে। এরপর তার শরীরের বিভিন্ন বিষয়ে টেষ্ট সম্পন্ন করনো হয়। পরবর্তীতে ২৬ জুলাই রতে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষনা করেন এবং ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে মর্মে ডেথ সার্টিফিকেটে উল্লেখ করেন।

আখানগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নুরল ইসলাম জানান, ফিরোজ অনেক শান্ত প্রকৃতির ছেলে ছিলো। সে ঢাকায় থাকলেও গ্রামের মানুষের প্রতি তার ছিলো আলাদা টান। গ্রামের ছেলে মেয়েরা যেন শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারে সেজন্য সে প্রায়ই অনেকের খোজ নিতো। ভবিষ্যতে গ্রামে একটি উন্নত ও ভালো মানের বিদ্যালয় করার স্বপ্ন ছিলো তার। তিনি আরো জানান, সরকারি ভাবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে আরো বেশি জোড়ালো ভুমিকা নেয়া উচিত। তা না হলে এমন ফিরোজের মতো আরো হাজারো ফিরোজের স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই রয়ে যাবে।









Leave a reply