হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কবিতা

|

আজও গাইবো জীবনের জয়গান

আবার এলো ঈদ- আবার আসবে ঈদ-
যতদিন চন্দ্র-সূর্য থাকবে মাথার উপরে
ততদিন আসবে ঈদ- মানব সভ্যতা
দেখবে অনাদিকাল ধরে চিরকালের নতুন ঈদ।

আমরা কেবল দেখতে চাই না অষ্টআশি
কিংবা দুই হাজার সতেরো, দেখতে চাই না
প্লাবন-খরা-বন্যা-জলোচ্ছ্বাস-সুনামি-আইলা।
এই ঈদে আল্লাহ পাকের দরবারে
এই আমার আকুল ফরিয়াদ।
এবারের ঈদের আনন্দ আমার ভেসে গেছে
বন্যার ভয়াবহতায়- বিপন্ন মানুষের কান্নায়।
অষ্টআশিতে গেয়েছিলাম গান-
“তোমাদের পাশে এসে বিপদের সাথী হ’তে
আজকের চেষ্টা অপার”
সে গান আর শোনাতে চাইনি কখনো।
সে দিন আশ্রয়ের নতুন সংগ্রামে
শামিল হয়ে বলেছিলাম,
“আমি তাদের কাছে যেতে চাই প্রতিদিন
দুঃখ যাদের প্রতিদিনের সঙ্গী
দুঃখকে খুঁজি তাদের অসহায় পর্ণকুটিরে
সময় কখনো নিয়ে যায় আমাকে
ওদের কাছে।
ওদের দুঃখ জর্জরিত অস্তিত্বের কাছে
কখনো সময় আমাকে দেয় না যেতে কোথাও।
ওদের ঘুম ভাঙে সেতু ভাঙার
বিপুল স্রোতের শব্দে
বন্যা আর প্লাবনের বিশাল পানির গন্ধে
রাতারাতি ভেসে যায় সব পানিতে
উঠোন আঙিনা
ঘর আর ঘরের মাচা
চালা
আসবাবপত্র বাসনকোসন
গাছপালা জায়গা জমিন পায়ে চলার পথ
রেললাইন শাপলা শালুক
এবং চরের ধু ধু বালি
রাতারাতি ভেসে যায় সব বন্যার বিপুল পানিতে।

আমি এই প্লাবনের ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে চাই
আমি এই দুঃখের তিমিরে
যেতে চাই ওদের কাছে
বিধ্বস্ত আকাশের নিচে দাঁড়াতে চাই ওদের পাশে
যেখানে ভেসে যায় সব কিছু রাতারাতি
বন্যার বিপুল জলে।
কলাগাছের ভেলায় যেখানে দুস্থ মানুষ
শিশু কোলে বানু বিবিরা
নিত্য খোঁজে
আশ্রয়ের একান্ত পারাপার
বাঁধের উপরে দেখি গবাদি পশুর ভিড়
ভেসে যায় শাক-সব্জি লাউ-কুমড়ো
বিছানার নকশি কাঁথা
ভেসে যায় জীবনের মানুষের সকল আশ্রয়।
আমি তাদের কাছে যেতে চাই প্রতিদিন
আমি এই প্লাবনের ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে চাই
আমি এই দুঃখের তিমিরে
যেতে চাই ওদের কাছে
আমি যেতে চাই ওদের কাফেলায়
আশ্রয়ের নতুন সংগ্রামে
যেতে চাই জীবনের নতুন আকাঙ্ক্ষায়
ঈদের কিছু অংশ নিয়ে
দু’হাত উষ্ণতায় বাড়িয়ে।”
আমি বন্যার পানিতে হাবুডুবু খেয়েও
পায়ের তলায় খুঁজে ফিরি জেগে থাকা মাটি।
তাকেই আশ্রয় করে দেখি নতুন করে
বেঁচে থাকার স্বপ্ন-। সব হতাশাকে
ঝেড়ে মুছে দিয়ে অষ্টআশিতে একটি পতাকা
হাতে নিয়ে বলেছি যে কথা- আজো বলি তাই,
“কেবলি প্লাবন আসে আমাদের জীবনে
কেবলি ঘূর্ণিঝড় আসে আমাদের আশ্রয়ে
কেবলি শুকনোর মাটি মুখ
হা’করে থাকে
বিপন্ন খরায়
কখনো নদী মরে যায় কখনো প্লাবন গর্জে ওঠে
তবু বেঁচে আছি বেঁচে থাকবো আমরা
শুধু চাই একটি সাহসের পতাকা
সকলের হাতে হাতে
শুধু চাই একটি নির্মাণের অস্ত্র
সকলের হাতে হাতে
শুধু চাই একটি বিশাল শপথ
সকলের হৃদয় থেকে হৃদয়ে ”
আজ আমি জীবনের শেষ দ্বারপ্রান্তে
এসেও গাইবো জীবনেরই জয়গান ॥

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ-এর কবিতা

জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে
মৃত্যুকে আর আমার কোনো ভয় নেই-
যাকে আমি দেখেছি- একবার নয়,
একাধিকবার খুব কাছে থেকে
একেবারে একান্তভাবে- আলিঙ্গনরত
প্রিয়তমার মতো। সৈনিক ছিলাম
মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়তে শিখেছি তখন।
বন্দিজীবনে পাণ্ড্র– রোগকে আজরাইল
রূপে দেখেছি- আল্লাহতা’লার
ভর্ৎসনায় ফিরে গেছে আমাকে না নিয়েই-

তারপর ভেবেছিলাম- স্রষ্টার কিছু কাজ
হয়তো এখনো বাকি রয়ে গেছে- সেটুকু
করার দায়িত্ব নিতে হবে আমাকেই- আমার
দেশের জন্য- আমার অসহায় মানুষের জন্য।

শুরু করলাম নতুন যাত্রা- দুর্গম পথে
যে পথে চলতে গিয়ে কখনো বা হয়ে যাই
ক্লান্ত-শ্রান্ত-অবসন্ন। তখন ভাবনাগুলো
চারপাশে ভিড় জমায়। জীবন সায়াহ্নে
আর কত কি কাজ আছে বাকি?

সেই চিন্তার মাঝে মৃত্যু নামের
অবধারিত সত্যের নোটিশ আসে-
যেতে হয় অপারেশন থিয়েটারে।
সেখানে ভুলতে হয়- পৃথিবীর সব
মায়া-মমতা-প্রেম-ভালোবাসা,
আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, প্রিয়জন,
জীবন প্রবাহ, ইতিহাস, অতীত-বর্তমান,
কর্মের তাগিদ সব হিসাব-নিকাশ-
জীবন আর মৃত্যুর এই সংযোগ স্থলে।
চিন্তার কোনো অবকাশ নেই সেখানে-
ঠিক যেনো মৃত্যুর মতো- এখানে এসে
আমিও ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

সেখানেও বিধাতা আমাকে জাগিয়ে দিলেন-
আবার জেগে দেখি সেই আলো-
সেই বাতাস- সেই প্রিয় আপনজনেরা-
যারা আমার জন্য প্রার্থনায় বসে ছিলো-
মসজিদে-দেবালয়ে দু’হাত বাড়িয়ে।
তাদের প্রার্থনার হাত খালি হয়ে
ফিরে আসেনি করুণাময়ের দরবার থেকে।
মৃত্যু আমাকে আবার জানিয়ে দিয়ে গেলো-
‘আমি নিতে চাইলে কি হবে- তোমার
ভালোবাসার মানুষেরা তো যেতে দেয় না তোমাকে-
তাদের দোয়া যে কবুল হয়ে গেছে।’

আজ আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা- দেশের সকল
মানুষের কাছে- চিরদিনের ঋণ তাদের কাছে-
যারা আমার জন্যে হাত পেতে নিয়ে এসেছে
আরো কিছু আয়ু, আরো এক নতুন জীবন।
(সিঙ্গাপুর-২৯ অক্টোবর, ২০১৭। হাসপাতাল থেকে ফিরে)





সম্পর্কিত আরও পড়ুন







Leave a reply