সাদুল্যাপুরে মা ও শিশু যত্ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ

|

গাইবান্ধা প্রতিনিধি:

গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলায় ইনকাম সাপোর্ট প্রোগ্রাম ফর দ্য পুওরেস্ট (আইএসপিপি) মা ও শিশুদের কল্যাণে যত্ন প্রকল্পের তালিকা প্রণয়নে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।

তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বারদের দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে দিতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন সুবিধাভোগীরা। সংশ্লিষ্ট ইউপির চেয়ারম্যান-মেম্বাররা প্রকল্পের কোন নিয়মনীতি অনুসরন না করে অর্থের বিনিময়ে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে উপকারভোগী নির্বাচন করে তালিকা প্রস্তুত করেছেন। ফলে ফরম উত্তোলন করেও বাদ পড়েছেন প্রকৃত দরিদ্র সুবিধাভোগীরা আর তদের বদলে স্বচ্ছল, বিত্তশালী এমনকি চাকুরীজীবি পরিবারের মা ও শিশুরা তালিকাভুক্ত হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এছাড়া প্রকল্পটির স্থানীয় পর্যায়ে কার্যক্রম সুষ্ঠভাবে বাস্তবায়ন, সহজতর ও অভিযোগ খতিয়ে দেখতে প্রতিটি ইউনিয়নে একজন সেফটি নেট প্রোগ্রাম এ্যাসিস্ট্যান্টসহ দায়িত্বরত মাঠকর্মী রয়েছেন। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধেও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে পরোক্ষ আতাঁতে সুবিধাভোগীদের কাছে টাকা দাবিসহ অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। সাদুল্যাপুর উপজেলার ১১ ইউনিয়নজুড়ে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও ভয়াবহ চিত্র জামালপুর, ধাপেরহাট, রসুলপুর, দামোদরপুর, ইদিলপুর ও খোর্দ্দকোমরপুর ইউনিয়নে।

এদিকে, যত্ন প্রকল্পের তালিকা প্রণয়নে স্বজনপ্রীতিসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও মাঠ পর্যায়ের দায়িত্বরত কর্মীদের বিরুদ্ধে গত ১০ জুলাই সাদুল্যাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবরে লিখিত অভিযোগ করেছেন জামালপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার প্রায় শতাধিক হতদরিদ্র পরিবারের ভুক্তভোগী মায়েরা।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জামালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান বলেন, ‘মাইকিংসহ প্রচারণা চালিয়ে সুবিধাভোগীদের যাচাই-বাছাই করা হয়। প্রকল্পের নিয়ম অনুসরণ ও সরেজমিনে পরির্দশন করেই প্রকৃত সুবিধাভোগী বাছাই করা হয়। সুবিধাভোগী নির্বাচনে কারও কাছে টাকা নেয়া হয়নি, টাকা আদায়ের অভিযোগটি সম্পন্ন মিথ্যা। মুলত একটি স্বার্থন্বেষী মহল আমার সম্মান নষ্টের উদ্দেশ্যে এমন মিথ্যা অভিযোগ করছেন’।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছ থেকে পাওয়া ফরম পূরণ করে ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) জমা দিতে গেলে চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান তাদের কাছে ৩ হাজার থেকে ৫০০০ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে কারও ফরম জমা নিবেননা বলে জানান তিনি। এসময় উপজেলা চেয়ারম্যান অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে পরিষদ থেকে তাদের তাড়িয়ে দেন তিনি। পরবর্তীতে পরিষদের সচিবের কাছে ফরমগুলি জমা দিয়ে ফটোকপিতে রিসিভ করে নেন তারা। এরপর চেয়ারম্যান প্রত্যেক ওয়ার্ডের মেম্বার ও প্রকল্পের দায়িত্বরত মাঠকর্মীদের নিয়ে গত ১ জুলাই মীরপুর নিজ বাসায় একটি গোপন বৈঠক করে নিজেদের পছন্দের সুবিধাভোগীদের ফরমগুলো যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করেন।

গত ৭ জুলাই সকালে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ফরম উত্তোলন করা সুবিধাভোগীদের পরিষদ কার্যালয়ে উপস্থিত হতে বলা হয়। এতে ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার প্রকৃত সুবিধাভোগীদের প্রায় দেড় হাজার নারী উপস্থিত হন। কিন্তু লোক দেখানো যাচাই-বাছাইয়ে প্রকৃতরা বাদ পড়েন। চুড়ান্ত নাম তালিকভুক্ত ১৩৮৬ জনের অধিকাংশই স্বচ্ছল পরিবারের নারী ও শিশুদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মুলত অর্থের বিনিময়ে স্বচ্ছলদের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তালিকার অধিকাংশ নারী ও শিশু প্রভাবশালী ও সম্পদশালী পরিবারের। তাদের অনেকের পাকা বাড়ি, ১০-১৫ বিঘা আবাদি জমি, ব্যবসা এবং সরকারী-বেসরকারী চাকুরীজীবিও রয়েছেন। প্রকল্পের তালিকাভুক্ত করতে সুবিধাভোগীদের কাছে আদায় করা লাখ লাখ টাকা চেয়ারম্যান, মেম্বারসহ দায়িত্বরত প্রকল্পের মাঠকর্মীরা ভাগবাটোয়ারা করেন বলেও অভিযোগ তাদের।

প্রকল্পের আওতায় প্রকৃত দরিদ্র অসহায় পরিবারের বঞ্চিত কয়েকজন হলেন, বড় জামালপুর গ্রামের আফরুজা বেগম, রেশমী আকতার সুমাইয়া, মনিরা, রিনা বেগম, তরফবাজিত গ্রামের রেহেনা খাতুন, বুজরুক রসুলপুর গ্রামের সম্পা খাতুন, খোর্দ্দ রসুলপুর গ্রামের লাভলী বেগম, শিমুলী বেগম, চিকনী গ্রামের শিল্পী বেগম, জমিলা আকতার, রিমা বেগম, শ্রীকলা গ্রামের ছবিনা বেগম, রুজিনা বেগম, নুরজাহান বেগম এবং পাতিল্যাকুড়া গ্রামের লাকী বেগম।

বঞ্চিত সুবিধাভোগীদের মধ্যে বড় জামালপুর গ্রামের শাহীন শেখের স্ত্রী রতনা বেগম, জামিলুরের স্ত্রী মনিরা বেগম ও হারুনের স্ত্রী রিনা বেগম বলেন, ‘দরিদ্র হওয়ায় অভাব-অনাটনে সংসার চলে তাদের। সংসারে তাদের চার বছরের নিচে একটি-দুটি শিশু সন্তান রয়েছে। পুষ্টি ভাতার কার্ডের জন্য ফরম তুলে পূরণ করে জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু চেয়ারম্যান, মেম্বারদের দাবি করা তিন হাজার টাকা দিতে পারি নাই। এ কারণে তাদের পুষ্টি ভাতার কার্ড জোটেনি। অথচ বাড়ি পাশের স্বচ্ছল অনেক পরিবার অর্থের বিনিময়ে পুষ্টি ভাতার কার্ডে নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন’।

বড় জামালপুর গ্রামের আফরুজা বেগম বলেন, ‘দিনমজুর স্বামীর সামান্য আয়ে কোন রকমে খেয়ে না খেয়ে চলে সংসার। তারপরেও অনেক কষ্টে তিনবেলা খাবার তুলে দেন একমাত্র চার বছরের কম বয়সের সন্তানকে। কার্ড করে দিতে চেয়ারম্যানের কথা বলে তাদের কাছে ৫ হাজার টাকা চেয়েছিলো স্থানীয় কয়েকজন। কিস্তু শেষ পর্যন্ত টাকা জোগার করতে না পারায় তালিকায় নাম ওঠেনি তাদের’।

একই গ্রামের দরিদ্র ভ্যান চালক রিপন মিয়ার স্ত্রী হিরা বেগম বলেন, ‘ফরম পূরণ করে ইউনিয়ন পরিষদে জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নাম তালিকা করতে ৩ হাজার টাকা চাইছিলো। সারাদিন ভ্যান চালিয়ে যা আয় হয় তা দিয়ে কোন রকমে সংসার চলে। তার একটি মাত্র সন্তান থাকলেও টাকা দেয়ার কোন উপায় না থাকায় যাচাই-বাছাইয়ে নাম বাদ দিয়েছেন চেয়ারম্যান’।

এ বিষয়ে জামালপুর ইউনিয়ন আ’লীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম ফকির বলেন, ‘যত্ন প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের তালিকাভুক্ত করতে কোন নিয়মেই অনুসরণ করা হয়নি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রকল্পের মাঠ পর্যায়ের তদারকি কর্মকর্তা লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে স্বচ্ছলদের তালিকাভুক্ত করেছেন। এতে প্রকল্পের সুবিধা থেকে একদিকে যেমন বি ত হচ্ছেন হতদরিদ্র পরিবারের মা ও শিশু অন্যদিকে অনিয়ম, দুর্নীতির কারণে সরকারের মহৎ উদ্দেশ্যে ও প্রকল্পটি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। তবে দ্রুতই এই অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি’।

যত্ন প্রকল্পের নাম তালিকাভুক্ত করতে স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম ও দুর্নীতিসহ টাকা আদায় ঠেকাতে নানাভাবে তৎপরতা চালাচ্ছেন স্থানীয় প্রশাসন। এ বিষয়ে সাদুল্যাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার নবীনেওয়াজ বলেন, ‘প্রকল্পের আওতায় ফরম উত্তোলনের সময়েই নোটিশ এবং মাইকিং করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকার আহবান জানানো হয়েছিলো। কিন্তু তারপরেও প্রকল্পে নাম তালিকাভুক্ত করতে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। ইতোমধ্যে ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত সাপেক্ষে অনিয়মের প্রমাণ মিললে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে’।

এদিকে, যত্ন প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতির বিষয়ে সাদুল্যাপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ শাহারিয়া খান বিপ্লব বলেন, ‘যত্ন প্রকল্পের তালিকা তৈরীতে কোন অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ সহ্য করা হবেনা। বিভিন্ন ইউনিয়নের অভিযোগগুলো তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে এ বিষয়ে আইএসপিপি ইউনিয়ন এ্যাসিস্ট্যান্টসহ দায়িত্বরত মাঠকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেও তারা বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি। তবে তাদের দাবি, প্রকল্পের আওতায় যাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তা সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান, মেম্বারাই করেছেন।

অপরদিকে, প্রকল্পের তালিকা প্রণয়ণে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে ধাপেরহাট, দামোদরপুর, ইদিলপুর ও রসুলপুর ইউনিয়নে। চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা তাদের লোকজন এবং এক শ্রেণির দালাল কর্তৃক গ্রামের মানুষের কাছে সুকৌশলে টাকা আদায় করে তালিকা প্রস্তুত করেছেন। প্রস্তুত করা তালিকা ধরে তদন্ত করলের অনিয়ম, দুর্নীতির প্রমাণ মিলবে বলেও মনে করেন সচেতন মহল। শুধু সাদুল্যাপুর উপজেলায় নয়, প্রকল্পের তালিকা প্রণয়নে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে সদর, পলাশবাড়ী ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলাতেও।

সম্প্রতি তালিকা প্রণয়ণে অনিয়ম, দুর্নীতি ও জনপ্রতিনিধিদের টাকা আদায়ের প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টি গাইবান্ধা জেলা শাখা। ইতোমধ্যে অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে, সুবিধাভোগীদের কাছে হাতিয়ে নেয়া টাকা ফেরত এবং প্রণীত তালিকা বাতিলসহ প্রকৃত হতদরিদ্রদের অন্তর্ভুক্তির দাবিতে কয়েক দফায় বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকর্মীরা।





সম্পর্কিত আরও পড়ুন







Leave a reply