১৪ বছর চাকরি শেষে অবসরে গেছেন, আজো বেতন হয়নি!

|

আহমেদ নাসিম আনসারী, ঝিনাইদহ:

ঝিনাইদহ পি.ডি.আর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন সুকুমার সাহা। দীর্ঘদিন এই বিদ্যালয়ে ছাত্র পড়িয়েছেন, কিন্তু কোনো বেতন পাননি। বেতন ছাড়াই তাকে চাকরি থেকে অবসরে যেতে হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় বছরের পর বছর বিনা বেতনে পাঠদান করতে হয়েছে এই গনিত শিক্ষককে। বুড়ো বয়সে খালি হাতে পরিবারে ফিরে লজ্জায় মুখ লুকাতে হয় তাকে। পাড়াপ্রতিবেশিদের সাথে পারতপক্ষে মিশেন না সুকুমার।

সুকুমার সাহা’র জন্ম ১৯৫৮ সালে মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার সারঙ্গদিয়া গ্রামে। বাবা মৃত ফনিন্দ্রনাথ সাহা ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। ব্যবসার প্রয়োজনে ১৯৬৭ সালে চলে আসেন ঝিনাইদহে। এই শহরের মদনমোহন পাড়ায় বসবাস শুরু করেন। আজো বাবার রেখে যাওয়া সেই বাড়িতেই সুকুমার সাহা বসবাস করছেন।

সুকুমার সাহা জানান, বিএসসি কোর্স শেষে বাবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেখাশুনা করতেন তিনি। বাবার তখন মুদি দোকান ছিল। ১৯৮৯ সালে তিনি পৃথক দোকান নেন। কালীগঞ্জ শহরের বিমল কুমার সাহার মেয়ে উৎপলা সাহাকে বিয়ে করেন। তাদের সংসার মোটামুটি ভালোই চলছিল। অল্প দিনেই তাদের ঘরে আসে সজিব কুমার সাহা ও দীপ্ত সাহা নামের দুই সন্তান। বর্তমানে তারা দু’জনই পড়ালেখা করছে।

সুকুমার সাহা জানান, ১৯৭৫ সালে ঝিনাইদহ নিউ একাডেমি থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাশ করেন তিনি। এরপর ১৯৭৮ সালে ঝিনাইদহ সরকারি কেসি কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে এইচএসসি ও ১৯৮১ সালে বিএসসি কোর্স সম্পন্ন করেন। ৮২ সালে এমএসসি করতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ৮৫ সাল পর্যন্ত সেখানে পড়ালেখা করে পারিবারিক সমস্যার কারণে বাড়ি ফিরে আসেন।

বাড়িতে এসে বাবার ও নিজের ব্যবসা দেখাশুনা করতেন। এরই মধ্যে ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার দিঘলগ্রাম গ্রামে প্রতিষ্ঠা করা হয় পিডিআর (পিড়াগাতি-দিঘলগ্রাম-রুপদাহ) মাধ্যমিক বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার পর বিদ্যালয়টির কর্তৃপক্ষ সেখানে পাঠদানের জন্য কোনো গনিতের শিক্ষক পাচ্ছিলেন না। তখন সুকুমার সাহাকে যোগদানের জন্য অনুরোধ করেন।

সুকুমার সাহা আরো জানান, ব্যবসায়ী থেকে শিক্ষক হওয়া- এটা তার কাছে খুব ভালো লেগেছিল। তিনি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের অনুরোধে ২০০৪ সালে চাকরিতে যোগ দেন। এরপর থেকে তিনি ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন, তবে বিনা বেতনে! সব সময় আশায় ছিলেন, এমপিওভক্ত হলেই বেতন পাবেন।

২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর তিনি অবসরে যান। কিন্তু এই ১৪ বছর চাকরিতে তিনি কোনো দিন বেতন পাননি। বিদ্যালয়টি হতদরিদ্র এলাকায় হওয়ায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও তেমন কোনো আয় ছিল না প্রতিষ্ঠানের। কর্তৃপক্ষ সব শিক্ষককে আর্থিক কোনো সমর্থন দিতে পারতো না। অন্য শিক্ষকরা প্রাইভেট পড়িয়ে কিছু আয় করলেও সুকুমার সাহা প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত সময় দেয়ায় প্রাইভেটও পড়াতেন না।

এরই মধ্যে আরো ভালো পাঠদানের স্বার্থে ২০০৯ সালে তিনি বিএড কোর্স সম্পন্ন করেন।

এই শিক্ষক দুঃখ করে বলেন, কর্মজীবন শেষ করলাম বেতন ছাড়া। যাবার সময়ও কিছুই পাইনি। এই অবস্থায় পরিবারের সদস্যদের সামনে মুখ দেখাতে খুব কষ্ট হয়।

সুকুমার সাহা জানান, কষ্ট নিয়েই এখনও মাঝে মধ্যে বিদ্যালয়ে যান, সেখানে গিয়ে অন্যদের সঙ্গে সময় কাটান। তিনি জানান, স্ত্রী উৎপলা সাহা একটি প্রি-ক্যাডেট স্কুলে শিক্ষাকতা করেন। বাড়িতে কিছু শিক্ষার্থীও পড়ান তিনি। তার টাকায় চলে সংসার। তার এই কঠিন জীবন নিয়ে কারো কি কিছুই করার নেই এই প্রশ্ন সুকুমার সাহার?

পিডিআর মাধ্যামিক বিদ্যালয় এর বর্তমান প্রধান শিক্ষক আকরামুল কবির জানান, এলাকার কিছু শিক্ষানুরাগী ২০০০ সালে এই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। ১ শতক জমির উপর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে ২৪৫ জন ছেলে-মেয়ে পড়ালেখা করছে। ৮ জন শিক্ষক আর ৩ জন কর্মচারি রয়েছে বর্তমানে।

এ পর্যন্ত তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে ১০টি ব্যাচ এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। শতকারা ৮৫ থেকে ৯০ এর উপরে পাশের হার থেকেছে। তারপরও প্রতিষ্ঠানটি এমপিও ভুক্ত হয়নি। যে কারণে সুকুমার সাহাকে বেতন ছাড়াই চলে যেতে হয়েছে। আরো কয়েকজন শিক্ষক আছে তাদের অবস্থাও একই। প্রতিষ্ঠান দ্রুত এমপিওভুক্ত না হলে ওই শিক্ষকদের অবস্থাও সুকুমার সাহার মতোই হবে বলে শঙ্কা আকরামুল কবিরের।

এ বিষয়ে ঝিনাইদহ সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শামীম আহম্মেদ খাঁন জানান, বিষয়টি উচ্চ পর্যায়ের। এইসব শিক্ষকদের নিয়ে তাদের কিছুই করার ও বলার নেই। তবে শিক্ষকরা উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করে দেখতে পারেন কিছু হয় কিনা।









Leave a reply