গাইবন্ধায় অভাবের তাড়নায় তিন মেয়েকে অন্যত্র দান

|

জিল্লুর রহমান পলাশ, গাইবান্ধা :

অভাবের তাড়নায় তিন শিশু সন্তানকে অন্যকে দিয়ে দেয়ার ঘটনায় এখন চাঞ্চল্য গাইবান্ধাজুড়েই। ঘটনাটি সুন্দরগঞ্জের রাজবাড়ি ও উত্তর ধর্মপুর এই দুই গ্রামের। রাজিবাড়ি গ্রামের দরিদ্র-অসহায় ভূমিহীন হাবিল মিয়া এক কন্যা সন্তান ও ধর্মপুর গ্রামের অসহায় ভাঙারি ব্যবসায়ী আশরাফুল ইসলাম দুটি কন্যা সন্তান তুলে দেন তিনটি নিঃসন্তান পরিবারের কাছে।

হাবিল ও আশরাফুলের দাবি, অভাব-অনটনের কারণে সন্তান লালন-পালনে সাধ্য নেই তাদের। বাধ্য হয়ে সন্তানদের অন্যর কাছে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে তাদের বিক্রি করেননি দাবি করে জানান, সন্তান গ্রহীতা নিঃসন্তান দম্পত্তিরা খুশি হয়ে তাদের মাথা গোজার ঠাঁইসহ সামান্য কিছু টাকা পয়সা দিয়েছেন।

দুই কন্যা সন্তানকে অন্যর হাতে তুলে দেয়ার ঘটনাটি তিন বছর আগের এবং এক কন্যা সন্তানকে তুলে দেয়ার ঘটনাটি ঘটেছে বছর দেড়েক আগের। তবে এই ঘটনা প্রতিবেশি ও স্থানীয়দের মধ্যে জানাজানি ছিল প্রথম থেকেই। কিন্তু বর্তমানে ঘটনার গুঞ্জণ এখন সকলের কানে কানে।

এ নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে খবর আসে সম্প্রতি। খবর পেয়ে শনিবার (৮ জুন) দুপুরে ঘটনাস্থল পরির্দশন করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দায় পাটোয়ারী। এরআগে শুক্রবার দুপুরে পরিবার দুটির খোঁজখবর নেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. ছোলাইমান আলী। এসময় পরিবার দুটির পাশে থেকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন তারা।

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, রাজবাড়ি গ্রামের হাবিল মিয়া। পেশায় একজন শ্রমিক। স্ত্রী ও সাত মেয়ে সন্তান নিয়ে সংসার হাবিলের। দীর্ঘদিন ধরে হাবিল টিবি রোগসহ শারীরিক বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হাবিল। শারীরিক অসুস্থ্যতায় কাজকর্ম করতে না পারায় দু’বেলা দুমুঠো খাবার যোগানে তার কষ্ট হয়ে দাঁড়ায়। এক মেয়ে প্রতিবন্ধি, দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন কয়েক বছর আগে। এক মেয়ে কাজ করেন গৃহকর্মীর। সবার ছোট ৫ মাস বয়সের মেয়েকে তুলে দিয়েছেন যশোরের এক নিঃসন্তান দম্পত্তি পরিবারের কাছে।

এছাড়া আশরাফুল পেশায় একজন ভাঙারি ব্যবসায়ী। জমজ চার মেয়ে ও স্ত্রী নিয়ে সংসার হাবিলের। ভ্যান চালিয়ে গ্রাম ঘুরে ভাঙারি ব্যবসা করে যা পান তা দিয়ে কোন রকমে চলে আশরাফুলের সংসার। জমজ চার মেয়েকে মানুষ করা তার পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। বাধ্য হয়ে তিন বছর আগে এক মেয়ে ও দুই বছর আগে আরেক মেয়েকে স্থানীয় ব্যক্তির মাধ্যমে তুলে দেন দুই নিঃসন্তান দম্পত্তির হাতে।

হাবিল মিয়া বলেন, ‘নিজের শরীরে নানা রোগ বাসা বেঁধেছে। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ্য থাকলেও ঠিকমতো চিকিৎসা করতে পারেন না। সংসারে স্ত্রী ও সাত মেয়ে সন্তানকে মানুষ করার সামর্থ্য নেই তার। নিজের বলতে কিছুই নেই তার। নেই কোন জায়গা-জমি। অনেক কষ্টে নিজের ছোট মেয়েকে মানুষ করতে ভাতিজার মাধ্যমে ইঞ্জিনিয়ার নিঃসন্তান দম্পতির কাছে তুলে দিয়েছি। সন্তানকে নিয়ে ওই পরিবার তাকে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন। ওই টাকা দিয়ে দুই শতক জমি কিনে একটি ছোট টিনের ঘর তুলেছেন। বর্তমানে স্ত্রী ও তিন মেয়েকে নিয়ে কোন রকম দিন কাটাচ্ছেন।

এ বিষয়ে আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘ভাঙারি ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করি। সংসারে আমার দু’বার করে যমজ সন্তান হয়েছে। অভাবের কারণে তাদের আমি পালতে পারিনি। বাধ্য হয়ে দুটি মেয়ে সন্তানকে দুটি পরিবারকে দিয়েছি। তবে মেয়ে সন্তান দুটি পেয়ে খুশি হয়ে ওই নিঃসন্তান দম্পতি তাকে সামান্য কিছু টাকা দিয়েছেন। ওই টাকা পেয়ে অনেক উপকার হয়েছে তার। তবে ভাঙারি ব্যবসা করতে না পরায় বর্তমানে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটছে তার’।

এদিকে, হাবিল এবং আশরাফুলের পরিবারের এই কাহিনী জানেন প্রতিবেশীসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। হাবিলের প্রতিবেশি আনোয়ার মিয়া বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অনটনে ভুগছিলেন হাবিল। শারিরীক বিভিন্ন রোগে ভুগছেন তিনি। কাজকর্ম করতে না পারায় স্ত্রী সন্তানদের ঠিকভাবে খাবার দিতে পারেন না তিনি। একারণে হাবিল তার মেয়েকে অন্য পরিবারের কাছে দিয়েছেন। আমরা চাই ওই পরিবারের কাছে মানুষ হোক মেয়ে সন্তানটি।

সর্বানন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহাবুর রহমান জানান, অভাবের কারণে যশোর এবং ঢাকার তিনটি নিঃসন্তান পরিবারের কাছে সন্তান তুলে দিয়েছে পরিবার দুটি। সেখানে তারা ভালো আছে। সন্তানদের ছাড়াও নিঃসন্তান দম্পতি পরিবারের সঙ্গে হাবিল ও আশরাফুলের যোগাযোগ আছে।

এ বিষয়ে গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দায় পাটোয়ারী বলেন, ‘অত্যন্ত গরীব পরিবার হাবিল ও আশরাফুলের। অভাবের কারণে নিজের সন্তানদের দিয়েছেন অন্যর হাতে। বর্তমানে তাদের সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়েছি। পরিবার দুটিকে ঘরের ব্যবস্থা করে দেয়া হবে। এছাড়া পরিবার দুটিকে সরকারি সহায়তা দেয়ার চেষ্টা করা হবে’।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ছোলাইমান আলী বলেন, অসহায় পরিবার দুটির পাশে থাকবে প্রশাসন। তাদের পুনঃবাসনসহ বিভিন্ন সহায়তায় উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া হাবিলের প্রতিবন্ধি মেয়ের কার্ড ও আশরাফুলের ভ্যান মেরামত করে দেয়া হবে’।









Leave a reply